বইকথা
নতুনপাতা
দেশাচারের দুর্গ আক্রমণের সাহস জুগিয়েছিলেন
রামকুমার মুখোপাধ্যায়
২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বর্ষ ৩
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষ উপলক্ষে তাঁকে নিয়ে নানা নতুন আলোচনা ও প্রকাশনার সূত্রপাত ঘটে। একদিকে তাঁর জীবন আর অন্যদিকে তাঁর বহুমুখী কাজকর্মের পুনর্বিচার শুরু হয়। সে ধারারই একটি প্রচেষ্টা বর্তমান প্রবন্ধের সংকলনটি। এখানে মোট দশটি প্রবন্ধ আছে এবং সে সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্রের গ্রন্থপঞ্জি এবং সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি। দশটি প্রবন্ধের সবগুলিই পুনর্মুদ্রণ এবং লেখকদের মধ্যে আটজনের জন্ম উনিশ শতকে। এঁরা হলেন শিবাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য, শিবনাথ শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রমেশচন্দ্র মজুমদার, প্রবোধচন্দ্র সেন ও রাধারমণ মিত্র। আর বিশ শতকের যে দুজন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিকের লেখা এই সংকলনে আছে তাঁরা হলেন গোপাল হালদার ও হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রথম লেখাটি শিবাপ্রসন্ন ভট্টাচার্যের যিনি বিদ্যাসাগরকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। ১৩০৪ সালে বিদ্যাসাগরের স্মরণে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে কলকাতায় একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় যেখানে শিবাপ্রসন্ন একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। পরের বছর সেটি বই হিসাবে প্রকাশিত হয়। এটিই বিদ্যাসাগরের উপর লেখা প্রথম বই আর এখানে উল্লিখিত নানা ঘটনা লোকমুখে এবং লেখাপত্রে পরবর্তীকালে ফিরে ফিরে এসেছে। শিবাপ্রসন্ন যে বিষয়টি বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন তা হলো রাজদ্বারের দেওয়া সম্মান, উচ্চপদের অভিমান, অর্থাগমের অমোঘ উপায় সন্ধান, ভোগবিলাস এবং বৈভবে জীবন কাটানো বিষয়ে তীব্র অনীহা।
দ্বিতীয় লেখাটি শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ বই থেকে ‘বিদ্যাসাগর যুগ’ নামে অংশবিশেষ পুনর্মুদ্রণ। শিবনাথ শাস্ত্রী সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন বিদ্যাসাগর কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে ঠিক কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি করেছিলেন। প্রাচীন নানা সংস্কৃত বইয়ের রক্ষণ ও মুদ্রণ, ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য ছাড়াও কলেজের দরজা অন্য বর্ণের ছাত্রদের জন্যে খুলে দেওয়া, ছাত্রদের কলেজে আসা সুনিশ্চিত করতে বেতন নেওয়ার রীতি প্রবর্তন, সংস্কৃত পাঠের উপযোগী উপক্রমণিকা ইত্যাদি নতুন বই রচনা করা, দু’মাসের গ্রীষ্মের ছুটির ব্যওবস্থা করা এবং সংস্কৃতের পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন। এছাড়াও নারীশিক্ষার বিস্তার, বিধবাবিবাহের সূচনা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বিদ্যাসাগরের কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের কথা লিখেছেন। বলেছেন বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রামতনু লাহিড়ীর অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কথাও।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর 'কর্মাটাঁড়ে বিদ্যাসাগর ' একটি সুপরিচিত এবং আলোচিত লেখা। লেখাটির শুরুতে হরপ্রসাদ লিখেছিলেন যে, করমা নামের একজন সাঁওতাল মাঝির টাঁড় বা উঁচু জমি থেকে জায়গাটি কর্মাটাঁড় নাম পায়। ওই অঞ্চলের সাঁওতাল মানুষজনের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের নিবিড় সম্পর্কের কথা আছে লেখাটিতে। যে যা দাম চাইছে সে দামে বিদ্যাসাগর ভুট্টা কিনছেন আর বিকেলের দিকে অকাতরে সাঁওতালদের বিতরণ করছেন। বিদ্যাসাগরের বাড়ির উঠোনে উঠোনে আগুন জ্বেলে তারা ভুট্টা পুড়িয়ে খাচ্ছে। এর সঙ্গে আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিষয়ে কৌতুককর কিন্তু করুণ এক অবস্থার কথা। আছে লক্ষ্ণৌর জনৈক পুনো (পূর্ণচন্দ্র) জ্যাঠার শিক্ষা-সংক্রান্ত জ্যাঠামির উত্তরে উদাহরণ সহ বিদ্যাসাগরের দেওয়া উত্তরও। শিক্ষার অব্যবস্থা নিয়ে এমন তির্যক লেখা বাংলা ভাষায় খুব কমই মেলে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধিক লেখায় বিদ্যাসাগরের মহত্বের মূল জায়গাটি চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন। সেটি হলো দেশাচারের দুর্গকে নির্ভয়ে আক্রমণ করা। দয়ার মতো গুণ অনেকের থাকে কিন্তু অতীতের স্থবিরতাকে লঙ্ঘন করে দেশবাসীকে জঙ্গম ভবিষ্যতের দিকে চালিত করার মানুষ বিশেষ মেলে না। সে কাজে বিদ্যাসাগরকে সারথি-স্বরূপ বলে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও প্রাচযর ও পাশ্চাত্য বিদ্যার সেতুবন্ধনেও তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন। মুক্তচিন্তার প্রতিভূ বিদ্যাসাগর পারিবারিক ঐতিহ্যে সংস্কৃত বিদ্যাচর্চার মানুষ হলেও নিজে পরবর্তীকালে বিদেশি ভাষা শিখেছেন এবং সেখানকার চিন্তাবিদদের কাজকর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। ছাত্র-ছাত্রী ও পাঠক সমাজকে তার সঙ্গে পরিচিত করিয়েছেন। আর সবটাই করেছেন স্বদেশের পোশাক পরে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, বিদ্যাসাগর বেশভূষায় প্রাচীন কিন্তু অন্তরে চিরনবীন।
রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ১৮৮২ সালে বাবার সঙ্গে তীর্থযাত্রীর আগ্রহে বিদ্যাসাগরের কাছে যান। আঠারো বছরের তরুণ রামেন্দ্রসুন্দর সেদিন বিদ্যাসাগরকে দেখার পাশাপাশি তাঁর কিছু কথা শুনেছিলেন। সে কথা উল্লেখ করে রামেন্দ্রসুন্দর লিখেছেন, ‘সেই উদার প্রশস্ত স্নেহপূর্ণ হৃদয় হইতে নিঃসৃত হইয়া, সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর বঙ্গের যে সকল পুত্রকন্যা র শ্রবণপথে প্রবেশ লাভ করিয়া হৃদয়ের ভিত্তিমূলে আঘাত দিয়াছে, তাহারা চিরদিন সেই কণ্ঠস্বরের স্মৃতিকর্তৃক প্রেরিত হইয়া সংসারের কর্মক্ষেত্রে কিরণ করিবেন।’ এই কথা থেকে বোঝা যায় শিক্ষা, সাহিত্য এবং বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা ইত্যাদি ক্ষেত্রে রামেন্দ্রসুন্দরের প্রধান প্রেরণা ছিলেন বিদ্যাসাগর ও তাঁর ‘প্রাচ্যি মনুষ্যত্বের আদর্শ’।
রমেশচন্দ্র মজুমদার বাংলার নবজাগরণে বিদ্যাসাগরের অবদানের কথা আলোচনা করতে গিয়ে বিধবা-বিবাহের সমর্থনে আইন প্রণয়নকে তাঁর অক্ষয়কীর্তি বলে উল্লেখ করেছেন। এর পাশাপাশি বহুবিবাহ রদ, নারীশিক্ষার প্রসার এবং বাংলা নান্দনিক গদ্য ভাষার সৃষ্টিতে বিদ্যাসাগরের ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করেছেন। সে সঙ্গে এও উল্লেখ করেছেন যে, ১৮২৩ সালে সামাজিক রীতির কথা তুলে রামমোহন বিধবাবিবাহকে সমর্থন করেননি কিন্তু তার তিন দশকের মধ্যে বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ চালু করিয়ে ছিলেন।
প্রবোধচন্দ্র সেন আলোচনা করেছেন শিশুশিক্ষায় বিদ্যাসাগরের অবদান। তিনি লিখেছেন যে, উনিশ শতকের মধ্য ভাগ পর্যন্ত একাধিপত্যি ছিল ‘শিশুবোধক’ বইটির। মধ্যেযুগের গ্রামবাংলার শিক্ষণীয় বিষয় এবং শিক্ষাপদ্ধতির প্রতিফলন ঘটেছিল বইতিতে। অক্ষয় লাইব্রেরি প্রকাশিত বইটির সম্পাদক ছিলেন পূর্ণচন্দ্র শীল। ১৮৪৯ সালে মদনমোহন তর্কালঙ্কার ‘শিশুশিক্ষা’ বইটি লিখলেন সে বছরে প্রতিষ্ঠিত বেথুন বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের কথা মাথায় রেখে। একই বছরে তিনি বইটির দ্বিতীয় ভাগ এবং পরের বছর তৃতীয় ভাগ লিখলেন। ১৮৫১ সালে বিদ্যাসাগর চতুর্থ ভাগ লিখলেন, যা ‘বোধোদয়’ নামে বেশি পরিচিত। ‘শিশুবোধক’ এর প্রথার বদলে ‘শিশুশিক্ষা’য় বিচার প্রাধান্য পেল, প্রথম বইটির রীতির বদলে দ্বিতীয় বইটির নীতি আধুনিকতার সূচনা ঘটালো। ১৮৫৫ সালে বিদ্যাসাগর প্রকাশ করলেন ‘বর্ণপরিচয়’। বাংলা বর্ণমালার সংস্কার ঘটল বইটির মাধ্যমে। একই বছরে বইটির দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হলো। শিশুমনের সযত্ন লালন ঘটল বই দুটিতে আর নান্দনিক বাংলা গদ্যে র প্রয়োগ মিলল।
রাধারমণ মিত্র ‘কলিকাতায় বিদ্যােসাগর’ প্রবন্ধে ১৯২৪ সালের ১ জানুয়ারি সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠা থেকে পরবর্তী কালে ঈশ্বরচন্দ্রের ছাত্রজীবন ও কর্মজীবনের ঘটনাবলিকে উল্লেখ করেছেন দিন, মাস ও সাল সহ। সে সঙ্গে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে বিদ্যাসাগরের কর্মজীবন, বিধবাবিবাহের ইতিহাস, বহুবিবাহ অবলুপ্তিতে বিদ্যাসাগরের উদ্যোগ এবং স্ত্রীশিক্ষা প্রচারে তাঁর অসামান্য ভূমিকার কথা তথ্য সহ তুলে ধরেছেন। উনিশ শতকের তিনের দশক থেকে সাতের দশক পর্যন্ত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের একটি যুক্তিনিষ্ঠ রূপরেখা ধরা আছে লেখাটিতে।
গোপাল হালদার তাঁর ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ প্রবন্ধে নবজাগরণের প্রধান কাল হিসেবে ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা থেকে ১৯১৯-এ মহাত্মা গান্ধির ভারতীয় রাজনীতিতে আবির্ভাবকে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যবর্তী পর্বে বিদ্যাসাগর একটি জাতির নতুন শিক্ষানীতি ও শিক্ষাদর্শ প্রণয়নে আত্মনিয়োগ করলেন। জনশিক্ষা ও নারীশিক্ষা প্রসারে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। পাঠ্যাবস্তু রচনা করলেন এবং নতুন পাঠ্যযসূচি তৈরি করলেন। জাতীয় শিক্ষার প্রাণবস্তু হিসেবে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানকে নির্দিষ্ট করলেন। অন্যদিকে বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃত— এই ত্রিভাষার মাধ্য মে শিক্ষা এবং একই সঙ্গে সাহিত্যে নবজাগরণের সূচনা ঘটালেন।
হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রবন্ধে প্রথমে ঈশ্বরচন্দ্রের পূর্বপুরুষদের জীবন এবং সংস্কৃত টোলে শিক্ষাদানের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহের কথা উল্লেখ করেছেন। এও বলেছেন যে, পরিবারের লক্ষ্য ছিল ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত কলেজ থেকে শিক্ষা শেষে গ্রামে ফিরে টোল পরিচালনা করবেন। সে সময়ে কলেজটি অবৈতনিক ছিল বলে দরিদ্র ঠাকুরদাসের বিশেষ সুবিধেও হয়েছিল। বর্তমান প্রবন্ধটির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগরের শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি বিদ্যাসাগর পরিচালিত কলিকাতা ট্রেনিং স্কুল ( পরে হিন্দু মেট্রোপলিটান স্কুল) এবং কলেজের বিষয়ে সুচিন্তিত আলোচনা মিলেছে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে দশটি প্রবন্ধের এই সংকলনটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সংগ্রহযোগ্যে। সে সঙ্গে এটিও বলার যে, বইটিতে যে দশজনের প্রবন্ধ পুনর্মুদ্রিত হয়েছে তাঁদের পরিচিতি থাকা দরকার ছিল। জরুরি ছিল প্রবন্ধগুলি প্রথম কোন পত্রিকায় এবং কত সালে প্রকাশিত হয়েছিল তার উল্লেখ। প্রুফ সংশোধনেও আরও যত্ন নিতে হতো।
কালের প্রহরী বিদ্যাসাগর
অসিতাভ দাশ ও সুব্রত বিশ্বাস। বুকস্ হেভেন। কলকাতা। ৩৫০ টাকা।
Comments :0