STORY — RITWIK GHATAK — GACHTI — MUKTADHARA — 2026 FEBRUARY 1 — 3rd YEAR

গল্প — ঋত্বিক ঘটক — গাছটি — মুক্তধারা — ২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১ — বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

STORY  RITWIK GHATAK  GACHTI  MUKTADHARA  2026 FEBRUARY 1  3rd YEAR

গল্প  


মুক্তধারা

  ------------------------------- 
  গাছটি
  ------------------------------- 

 

ঋত্বিক ঘটক


গাঁ থেকে একটু দূরে ছোট্ট নদীর তীরে হুমড়ি খেয়ে-পড়া একটা বট গাছ। গাছ
হিসেবে সেটা খুব ভীষণ কিছু নয়।
বহু পুরোনো গাছ, গুঁড়িটা পোকায় খাওয়া, ডালগুলো পচা। বিস্মৃত কোনো
সুদূর অতীতে গাছটা ছিল তাজা, আজ নয়। কোনো কাজেই আসত না গাছটা।
শুধু গাঁয়ে আসার পথে লোকে চিনত গাছটাকে, জানত এর পরের বাঁকেই আছে
হরু কামারের হাঁপরশালা, তার পর থেকে আসল গাঁ।
বছরে একবার শুধু গাছটার গৌরব বেড়ে যেত। চড়কের সময় ওর কয়েকটা
শিকড়কে তেল-সিঁদুর দিয়ে কারা যেন চকচকে করে তুলত, দূর দূর গাঁ থেকে
লোক আসত। মেলা হতো গাঁয়ের মাঠে। তখন হঠাৎ গাছটা দ্রষ্টব্য হয়ে উঠত।
তারপর আবার সারাবছরের জন্য গাছটা পড়ে থাকত। আশপাশে পোড়ো
জমিগুলোতে গরু চরত, কখনো কখনো কোনো দূরাগত পথিক ওর শীতল ছায়াতে
বসে পোঁটলা খুলে চিড়ে-মুড়ি খেয়ে নদীর জল পান করে আবার রওনা দিত।-
জ্যোৎস্না রাতে গাছটি একাকী বিশাল মাঠের ধারে আপন আঙিনায় অপরূপ
আলো-আঁধারির সৃষ্টি করে হুমড়ি খেয়ে পরিবর্তনশীল নদীর জলে যেন কী
রহস্যের স্বপ্ন দেখত...।
ছটা ঋতু গাছটার মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যেত সমানে। নদী দিয়ে নৌকো
যেত, ছইয়ের ফাঁক দিয়ে ছোটো ছোটো মুখ অসীম কৌতূহলের সঙ্গে চেয়ে থাকত
ওর দিকে।-
ছোটো ছেলেদের আড্ডা ছিল ওই গাছতলাটায়। বাঁকাগাছের শাখায় শাখায়
ছেলেরা খেলা করত, ডাল থেকে নদীতে ঝাঁপ দিত, ইস্কুল পালিয়ে বসে থাকত।
গাঁয়ের লোকেরা ছোটোবেলা থেকে গাছটার কাছে আসত। গ্রীষ্মের অপরাহ্নে
কেউ কেউ ওর তলায় শিকড়গুলো যেখানে জটিল হয়ে একটা সুন্দর বসবার
জায়গা করেছে, সেখানে বসে নদীর স্তিমিত ছলাৎ-ছলাৎ ধ্বনি শুনত।
ওখানকার জেলেরা জানত ওর তলায় পাড়ের শিকড়ের ফাঁকে ফাঁকে মাছ
পাওয়া যায়-বহু ছোটো-বড় মাছ। তাদের ছেলেরা তাই ম্লান করতে এসে গামছা
ফেলে ধরত মাছ। জাল ফেললেও অনেক মাছ উঠত। বুড়োলোকরাও একে চিনত।
তারা গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে দেখত ছেলেদের খেলা,জেলেদের মাছ ধরা, আর নিজেদের 
মনে মাথা নাড়ত। বোধ হয় ভাবত তাদের জীবনের প্রদোষের কথা।
কিন্তু তারা নিজেরাই জানত না তাদের মনে এই বুড়ো বটের জায়গাটা কত
বড়। তারা ভাবত এটা শুধু বড়ো-শিবের বট। এটা এখানেই চিরকাল ছিল,
চিরকাল থাকবে। এটা নিতান্তই ছিল-"হরু খুড়্যার মোড় পারায়্যা বুইড়া শিবের
বট।"
এবং যতদূর সম্ভব ওটা এখানেই থাকত আরও কয়েক পুরুষ ধরে, আর
আশ্রয় দিত আরও কত অনাগত পথিককে। কিন্তু অকস্মাৎ একদিন কোনো খবর
না দিয়েই সরকারি নতুন পরিকল্পনা এসে উপস্থিত হলো। বর্তমান সেচ ব্যবস্থার
নতুন পরিকল্পনানুসারে আমাদের নদীকে বড় করে বহতা করা হবে। অতএব
একদিন বহু সাড়াশব্দ করে নিদারুণ আপত্তির সঙ্গে বুড়োশিবের বট মাটিতে
পড়ল। নদীর দুই পাড় সমান করে কেটে প্রাচীন নদীকে নয়া-ঢঙের খালে পরিণত
করা হলো-
সমস্ত গাঁ একদিকে জেগে উঠল। তারা গাছটার মূল্য বুঝতে পেরেছে।
প্রত্যেকের মনেই এল আলোড়ন- তারা মুখ ফুটে জানাল আপত্তি
কিন্তু তাদের আপত্তি ওই বিড়বিড় করে বকার মধ্যেই সীমবদ্ধ থাকল। গাছটা
পড়লই। -তার পর গাঁয়ের লোকে ধীরে ধীরে ভুলে যেতে লাগল বটগাছটাকে।
নতুন মুখ, নতুন বাড়িঘরদোর-সব নতুন। শুধু গ্রাম বৃদ্ধেরা যেত যখন ওইখান
দিয়ে তখন পাড়টা যেন বড় ন্যাড়া লাগত তাদের চোখে। তাই তারা হাত-পা
নেড়ে বর্ণনা করত এ-কথা নতুন লোকদের কাছে। এ তাদের নব-উদয়ন কথা-
কিন্তু, তাই বা ক-দিন!
বটগাছটি এতদিন ধরে এত লোককে আশ্রয় দিয়ে দিয়ে আজ লোকের মন
থেকে নিঃশব্দে মুখ বুজে অন্তর্ধান করেছে। 

Comments :0

Login to leave a comment