STORY — SOURISH MISHRA — GAVASKAR GAVASKAR — NATUNPATA — 31 JANUARY 2026, 3rd YEAR

গল্প — সৌরীশ মিশ্র — গাভাসকার গাভাসকারই — নতুনপাতা — ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

STORY  SOURISH MISHRA  GAVASKAR  GAVASKAR  NATUNPATA  31 JANUARY 2026 3rd YEAR

গল্প  


 নতুনপাতা

  -------------------------- 
   গাভাসকার গাভাসকারই
  -------------------------- 

 সৌরীশ মিশ্র


 


রবিবারের সকাল। এখন সাড়ে দশটা বাজে প্রায়। জলখাবার খেয়ে তাঁর ঘরের বুকশেল্ফটা থেকে বই সব বের করে ফেলে, সেগুলো ঝেড়েঝুড়ে, ফের বুকশেল্ফে তুলে রাখছিলেন এক এক করে অনির্বাণবাবু।
বুকশেল্ফটা বেশ বড়। অনেক বই রাখা থাকে এটায়। রচনাবলীর সেটও আছে কয়েকজন সাহিত্যিকের।
বই-প্রেমী মানুষ এই অনির্বাণবাবু। তাই দায়সারা করে নয়, অতি যত্নে এই বই ঝাড়পুছের কাজটা করছেন তিনি। প্রতি বছরই দুর্গাপুজোর আগে-আগে এই কাজটা করেন। কিন্তু, এ'বছর নানান তালেগোলে সেটা আর করে ওঠা হয়নি তাঁর। তবে, মাথা থেকে বেরিয়েও যায় নি ব্যাপারটা। মাথাতেই ছিল। তাই, আজ জলখাবার খেতে-খেতেই ঠিক করে ফেললেন তিনি, আর ফেলে রাখা নয়। আজই কাজটা করবেনই তিনি। যেমন ভাবা, তেমনই কাজ। খেয়ে-দেয়ে উঠেই নেমে পড়েছেন তিনি কাজে।
অনির্বাণবাবুর হাতে একটা শুকনো কাপড়। সেটা দিয়েই বইগুলো মুছছেন তিনি। 
এই মুহূর্তে, আরো একটি বই মুছে বুকশেল্ফে তুলে রেখে আর একটা বই মেঝে থেকে হাতে তুলে নিলেন অনির্বাণবাবু। ঠিক তখনই, তাঁর মেয়ে আত্রেয়ী এসে ঢুকল ঐ ঘরে। 
আত্রেয়ী এবার ক্লাস নাইনে উঠলো। এতোক্ষণ পড়াশুনা করছিল ও। প্রতি রবিবার সকাল আটটা থেকে একজন ইংলিশ টিচারের কাছে টিউশন নেয় সে। বাড়িতেই। এইমাত্র পড়িয়ে চলে গেলেন ঐ ম্যাডাম। বাবার খুব ন্যাওটা আত্রেয়ী। মেয়েরা যেমন হয়, আর কি! 
ঘরে ঢুকেই সে বলে উঠল, "বাপি, বুকশেল্ফ পরিস্কার করছো। দাঁড়াও, আমি হেল্প করি।"
"তুই খেয়েছিস টিফিন?" জিজ্ঞেস করেন অনির্বাণবাবু।
"না। মা বলল, হাতের কাজটা সেড়ে, দিচ্ছে। একটু নাকি সময় লাগবে।"
"তাহলে এখনই আর এইসব ধুলোতে হাত দিস না। মা খাবার দিলে আগে খেয়ে নে।"
"ঠিক আছে। তবে টিফিন বাড়া হলে তো মা ডাকবেই, ততক্ষণ বসি তোমার কাছে...", বলতে বলতেই মেঝেতে অনির্বাণবাবুর পাশটায় এসে বসে পড়ল আত্রেয়ী।
অনির্বাণবাবু যে বইটা হাতে নিয়েছিলেন একটু আগে সেটা মোছা হয়ে গিয়েছিল, তাই রাখতে যাচ্ছিলেন সেটা বুকশেল্ফে, তখনই আত্রেয়ী ফের বলে উঠল, "বাপি, এই বইটাই সেটা না, যেটাতে গাভাসকারের অটোগ্রাফ আছে?"
"হ্যাঁ।"
"দেখি, দাও।" বইটা নিতে হাত বাড়ায় আত্রেয়ী।
মেয়ের হাতে বইটা দিলেন অনির্বাণবাবু। ঝটপট পাতা উল্টে বইটার যে পাতাটায় গাভাসকারের সইটা আছে সেটা বের করে অটোগ্রাফটা দেখতে থাকে আত্রেয়ী। তারপর অনির্বাণবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, "বইমেলাতে নিয়েছিলে অটোগ্রাফটা, তাই না বাপি?"
"হ্যাঁরে।"
"বলোনা বাপি গল্পটা।" বাবার মুখে আগেও অনেকবার শুনেছে আত্রেয়ী এই গল্প। তবু কেন জানি, এই গল্পটা শুনতে ভালো লাগে ওর খুব। ওর বাবার মতোন গাভাসকারের ভক্ত না হলেও গাভাসকার মানুষটাকেই কেন জানি ভীষণই ভাল লাগে তার। তাই-ই বোধহয় গাভাসকারকে চোখের সামনে দেখা, তাঁর অটোগ্রাফ নেওয়ার এই গল্প, যতবারই শুনেছে ততবারই থ্রিল্ড হয়েছে সে।
"অনেকবার তো বলেছি। তবু শুনতে চাইছিস, শোন তবে।" অনির্বাণবাবু বলতে শুরু করেন। "তখন বইমেলা হোতো ময়দানে। সে বছরও গেছি তোর দাদু আর ঠাম্মির সাথে বইমেলা। আমার তখন ক্লাস ফাইভ। ঘুরছি মেলায়। হঠাৎ মা-ই বলল বাবাকে, 'দ্যাখো তো এই স্টলের সামনে এতো লম্বা লাইন কেন? কে এসছেন ঐ স্টলে?'
আমিও দেখলাম, ঐ স্টলটায় ঢোকার লাইনটা সত্যিই বি-শা-ল।
বাবা একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানো একজনকে জিজ্ঞেস করে দ্রুত পায়ে ফিরে এসে ভীষণই উত্তেজিত ভাবে মা-কে বলল, 'লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ো তাড়াতাড়ি। গাভাসকারের একটা বই বেড়িয়েছে। সেটার জন্য ঐ বই-এর পাবলিশার গাভাসকারকে এনেছেন। উনি আছেন এই স্টলে। কেনা বই-তে সই করে দিচ্ছেন।'
'গাভাসকার এসছে, গাভাসকার!' মা-কে কিছু বলার সুযোগই না দিয়ে আমি বলে উঠি সাথে সাথে। আমি তো প্রায় লাফাতেই শুরু করে দিয়েছি ততক্ষণে।
'হ্যাঁ রে হ্যাঁ। চল্ চল্, ঝটপট লাইনে দাঁড়িয়ে যা।' বলল বাবা।
আমরা লাইনে দাঁড়ালাম। সেইদিন অনেকক্ষণ দাঁড়াতে হয়েছিল স্টলের মুখে পৌঁছতেই। তারপর স্টলের ভিতর যে কি ভিড় ছিল কি বলব তোকে! বাবা এক ফাঁকে গিয়ে এই বইটা কিনে আনল। তারপর একসময় ঠিক সামনে পৌঁছোলাম গাভাসকারের। আমি তো স্টলে ঢোকার পর থেকে শুধু উঁকি দিয়ে দিয়ে দেখেই যাচ্ছিলাম গাভাসকারকে। আর সামনে পৌঁছে একদম কাছ থেকে ওনাকে দেখে কি যে ভাল লাগল! কি হ্যান্ডসাম, ভাবতে পারবি না তুই! খবরের কাগজের ছাপা ফটোতে বা টিভিতে দেখলে বোঝা যায় ঠিকই সেটা, কিন্তু সামনা-সামনি ব্যাপারই আলাদা। উনি আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একটু হেসে ঐ পাতাটায় সই করে দিলেন।" আত্রেয়ীর হাতে অটোগ্রাফ করা পাতাটা খোলা ছিল। সেটা দেখিয়ে তাঁর গাভাসকারকে দেখার গল্প শেষ করলেন অনির্বাণবাবু। তবে গল্প শেষ করেও বলে চললেন তিনি, "জানিস টুম্পা, পরে শুনেছিলাম, ঐ একদিনে ওনার যা বই বিক্রি হয়েছিল সেইদিন, তা নাকি ছাপিয়ে গিয়েছিল অন্যান্য সমস্ত দিনের বই বিক্রির রেকর্ডকেই! ভেবে দ্যাখ্ গাভাসকারের ক্রেজ়টা! গাভাসকার গাভাসকারই!"
আত্রেয়ী অনির্বাণবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনছিল ওর বাবার কথা। তাই, ওর চোখ এড়াল না ওর বাবা যখন "গাভাসকার গাভাসকারই!' বাক্যটা বলল তখন যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল অনির্বাণবাবুর মুখখানি। আত্রেয়ী গাভাসকারের অটোগ্রাফটার উপর আলতো করে একবার হাত বুলিয়ে মনে মনে বলল, "সত্যিই গাভাসকার অতুলনীয়।"

Comments :0

Login to leave a comment