India USA trade deal

গত পাঁচ বছরে দেশে বন্ধ হয়েছে প্রায় দু’লক্ষ সংস্থা

আন্তর্জাতিক

দেশের শিল্প ও কৃষিকে আরও গভীর সঙ্কটের দিকে ঠেলে দেওয়ার বন্দোবস্ত হিসাবে ভারত- মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি ঘিরে যখন গোদী মিডিয়া উল্লাসে মেতে উঠেছে, ঠিক সেই সময় সংসদে উঠে এল দেশের অর্থনীতির এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান। মোদী সরকারের কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রকের দেওয়া তথ্যই জানাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে দেশে ধ্বংস হয়ে গেছে প্রায় দু’লক্ষ সংস্থা।
সিপিআই(এম) সাংসদ ভি. শিবদাসনের প্রশ্নের উত্তরে কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রক জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে দেশে মোট ১ লক্ষ ৮৯ হাজার ২৯৫টি সংস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার ঢাকঢোল পেটানোর মাঝেই এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে দেশের বাস্তব অর্থনৈতিক অবস্থার ভয়াবহতা।
মন্ত্রকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০–২১ থেকে ২০২২–২৩ আর্থিক বছরের মধ্যে কোম্পানি আইনের ২৪৮(১) ধারায় প্রায় এক লক্ষ সংস্থার নাম রেজিস্টার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০২০–২১ সালে যেখানে মাত্র ২১৭টি সংস্থাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে ২০২১–২২ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৩০৫ এবং ২০২২–২৩ সালে তা আরও বেড়ে হয় ৬৮ হাজার ৮৯৩। এত বিপুল সংখ্যক সংস্থা কার্যত উধাও হয়ে যাওয়ার পেছনের আর্থিক, নীতিগত বা কাঠামোগত কারণ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করেনি মোদী সরকার।
এছাড়াও, কোম্পানি আইনের ২৪৮(২) ধারায় স্বেচ্ছায় কাজ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে ৯১ হাজারেরও বেশি সংস্থা। ২০২০–২১ সালে যেখানে ১২ হাজার ৪৮৭টি সংস্থা বন্ধ হয়েছিল, ২০২১–২২ সালে তা লাফিয়ে বেড়ে হয় ৩৩ হাজার ৯২৩। পরবর্তী তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে হাজার হাজার সংস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে এটি কোনও সাময়িক মন্দা নয়, বরং নীতিগত ব্যর্থতার ফল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী মোদী সরকারের একের পর এক জনবিরোধী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। নোটবন্দি দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে যেভাবে ধ্বংস করেছে, তার ক্ষত আজও পূরণ হয়নি। তার ওপর অবৈজ্ঞানিক জিএসটি কাঠামো ছোট ব্যবসা ও উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির শ্বাসরোধ করেছে। কোভিড-পর্বে বড় কর্পোরেটদের জন্য করছাড় ও প্রণোদনার বন্যা বইলেও, ক্ষুদ্র শিল্প ও অসংগঠিত ক্ষেত্র কার্যত কোনও সহায়তা পায়নি।
এই প্রেক্ষাপটেই মার্কিন–ভারত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে উঠছে আরও গুরুতর প্রশ্ন। ট্রাম্পের ঘোষিত শর্ত অনুযায়ী ভারতের বাজার মার্কিন পণ্যের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, অথচ ভারতীয় পণ্যের উপর বসবে উচ্চ শুল্ক। এর অর্থ, দেশীয় শিল্প ও কৃষি আরও প্রতিযোগিতাহীন হয়ে পড়বে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি সংস্থার অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। কৃষিক্ষেত্রে ভরতুকি ও সুরক্ষা কমলে কৃষকের আয় আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে—যার সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতিতে।
ভি শিবদাসনের বক্তব্য, এই বিপুল সংখ্যক সংস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশের অর্থনীতির গভীর সঙ্কটেরই প্রতিফলন। তাঁর অভিযোগ, জনবিনিয়োগ কমিয়ে, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র বিক্রি করে এবং বহুজাতিক কর্পোরেটের স্বার্থরক্ষাকেই সরকারের নীতির কেন্দ্রে রেখে মোদী সরকার কার্যত দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
তাঁর দাবি, অবিলম্বে জনবিনিয়োগ বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে রক্ষা করার কার্যকর নীতি গ্রহণ এবং জনবিরোধী নয়া উদারনৈতিক নীতিগুলি প্রত্যাহার করা ছাড়া এই সঙ্কট থেকে বেরোনোর কোনও পথ নেই। নচেৎ ‘উন্নয়ন’-এর গল্পের আড়ালে সংস্থা বন্ধ হওয়া, কর্মহানি ও দারিদ্রই দেশের অর্থনীতির স্থায়ী বাস্তবতা হয়ে উঠবে।

Comments :0

Login to leave a comment