Mathura School

জান মহম্মদকে ফেরাতে হবে স্কুলে, নাছোড় মথুরার গ্রাম

জাতীয়

এই স্কুলে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না। শিশুরা জাতীয় সঙ্গীত গাইতে চাইলে প্রধান শিক্ষক তাদের মারধর করেন। তিনি নিজেও কখনও জাতীয় সঙ্গীত গান না। এই স্কুলে ইসলামের প্রচার হয়। এই স্কুলে বাচ্চাদের নমাজ পড়ানো হয়। এই স্কুলে শিশুদের ব্রেনওয়াশ করা হয় মুসলিম বানানোর জন্য। এই স্কুলে তবলিগি জামাতের লোক দূর দূর থেকে এসে ভিড় করে। এই স্কুলে হিন্দু দেবদেবীদের গালি দেওয়া হয়। অতএব, এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক জান মহম্মদ সাসপেন্ড। 
স্কুলের নাম নওঝিল প্রাথমিক স্কুল, উত্তর প্রদেশের মথুরায়। গত ৩০ জানুয়ারি বিজেপি’র মণ্ডল সভাপতি দুর্গেশ প্রধান এই সব অভিযোগ দায়ের করেন প্রধান শিক্ষক জান মহম্মদের বিরুদ্ধে। বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করা হলে কোনও অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয় না। সরাসরি এনএসএ বা বুলডোজার। এক্ষেত্রেও হয়নি। বিশেষ করে অভিযোগ যখন করেছেন বিজেপি’র মণ্ডল সভাপতি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা আধিকারিক চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সাসপেন্ড করে দেন জান মহম্মদকে। স্কুলে ২৩৫ জন পড়ুয়া। এরমধ্যে ৮৯ জন মুসলিম। প্রধান শিক্ষককে নিয়ে মোট ৮ জন শিক্ষক আছেন। বাকিরা হিন্দু, তাদের মধ্যে ৬ জন মহিলা। ৩১ জানুয়ারি জান মহম্মদকে সাসপেন্ড করার খবর স্থানীয় হিন্দি কাগজগুলিতে ছাপা হয়। একে তো মুসলমান, তার ওপরে কুর্তা-পায়জামা পড়েন। লম্বা দাড়ি, মাথায় জালিদার টুপি। দেশজুড়ে যে ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, তারপরে আর এই শিক্ষককে নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশই থাকে না! 
মুসলিম প্রধান শিক্ষক হিন্দু পরিবারের শিশুদের ‘ব্রেনওয়াশ’ করে মুসলমান বানাচ্ছেন- খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেল দেখে মোটামুটি সবাই যখন নিশ্চিত, তখনই সেই সুরের তাল কেটেছে। বলা ভালো কেটে দিয়েছেন গ্রামবাসীরা। তাঁরা প্রথমে প্রাথমিক শিক্ষা আধিকারিককে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, তিনি মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিয়েছেন। কিন্তু সেই মহিলা আধিকারিক দুর্ব্যবহার করেন গ্রামবাসীদের সঙ্গে। এরপরে ৩ ফেব্রুয়ারি গ্রামের হাজারো লোক ম্যাটাডোর ভাড়া করে হাজির হন জেলাশাসকের দপ্তরে। সেখানে গিয়ে স্মারকলিপি দিয়ে স্পষ্ট অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষককে সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে। গ্রামের স্কুলে কোনো হিন্দু-মুসলিম বিভাজন নেই। এমন কোনো কাজ করেননি প্রধান শিক্ষক জান মহম্মদ। তিনি ১৮ বছর ধরে এই স্কুলে আছেন। গ্রামবাসীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে আসেন, দ্রুত প্রধান শিক্ষককে স্কুলে না ফেরালে জোরালো আন্দোলন হবে। পরের দিন নওঝিলের গ্রামবাসীরা বিক্ষোভ দেখাতে পথে নামেন। স্কুলের পড়ুয়াদের অভিভাবকরাও রাস্তায় নেমে আসেন প্রধান শিক্ষককে ফেরাতে। এরপরে নড়ে বসে প্রশাসন। প্রশাসন জানায় তিন দিনের মধ্যে তদন্ত করে পদক্ষেপ করা হবে। 
নওঝিলের গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, স্কুলটাই হিন্দুদের গ্রামে। এখানে ৫০০ লোক হিন্দু, ৫০ জন মুসলিম হবে খুব বেশি হলে। স্কুলের একদিকে কোলি সম্প্রদায়ের বাস। অন্যদিকে ব্রাহ্মণদের ঘর। কোলিদের এলাকাতেই এই স্কুল। স্কুলের পিছনেই থানা। দেড় কিলোমিটার দূরে মুসলিমদের গ্রাম। সেখান থেকেও মুসলিম পরিবারের শিশুরা আসে পড়তে। গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জয় পান্ডে জানালেন, আমার দুই ভাইপো এই স্কুলে পড়ে। স্কুলে কোনও পাঁচিল নেই, সবটাই তো খোলা। হেড স্যার নিজেই তো সিসিটিভি লাগিয়েছেন। এখানে নমাজ পড়ানো হলে, তবলিগি জামাতকে এনে ছেলেমেয়েদের মুসলিম বানানোর চেষ্টা হলে আমরা দেখতে পেতাম না? স্কুলের আরেক পাশে ঘর ডোরিলালের। প্রবীণ বাসিন্দা প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে বললেন, আঠারো বছর ধরে মাস্টার এখানে পড়াচ্ছেন। এত ভালো মানুষ, বড় মানুষ। তার নামে মিথ্যা অভিযোগ মানবই না। আরেক প্রতিবেশী ধরমবীরও জানিয়েছেন, স্কুলে রোজ জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়। মাস্টার কোনও অপরাধ করেননি। গ্রামবাসীরা মোবাইলে প্রধান শিক্ষক জান মহম্মদের ছবি দেখাচ্ছেন। তারাই জানিয়েছেন, ১১-১২ বছর বিএসএফে ছিলেন জান মহম্মদ। ইনসাস রাইফেল হাতে কাশ্মীরে পোস্টিংয়ের ছবিও দেখিয়েছেন গ্রামবাসীরা। তারাই বিজেপি নেতার মিথ্যার ফানুস ফাটিয়ে ছবি তুলে ধরছেন, যেখানে স্কুলে শিশুদের নিয়ে স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা তুলছেন জান মহম্মদ। নেতাজী-প্যাটেল-গান্ধী-নেহরুর ছবিতে ফুল-মালা দিচ্ছেন। 
স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা লক্ষ্মী চৌধুরি বললেন, স্যার সবসময় মহিলাদের সম্মান করেন। কখনও কাজে দেরি হয়ে গেলে স্যার আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে তারপর নিজে যেতেন। আরেক শিক্ষিকা কামনা আগরওয়াল বলেছেন, স্যার কখনও ধর্মের নামে কোনও ভেদভাব করেননি। খাবার ভাগ করা, যে কোনও সামাজিক কাজ বা স্কুলের শিশুদের পড়ানো। সব কাজেই স্যার সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওনার কথাবার্তা, ব্যবহারে কখনও অন্য ধর্মের মনে হয়নি। পরিবারের গুরুজনদের মতই মনে হয়েছে। 
তাহলে কেন ফাঁসানো হলো তাঁকে? কেন বিজেপি’র টার্গেট হলেন জান মহম্মদ? শিক্ষিকা লক্ষ্মী চৌধুরি বললেন, আমি বিএলও। আমার বুথে অধিকাংশই মুসলিম ভোটার। বিজেপি’র লোকরা এসে একসঙ্গে অনেক নাম বাদ দেওয়ার ৭ নম্বর ফরম জমা করতে চেয়েছিলেন। স্যার আমার সুপারভাইজার। আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করে তাদের বলি এক দিনে ১০টির বেশি ফরম জমা নেওয়া যাবে না। তারপরেই স্যারকে সাসপেন্ড করা হলো। 
গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, ‘স্যার’-এর আরও অপরাধের কথা। জান মহম্মদ স্কুলের পাঁচিল দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু স্কুলের বিরাট জমির একটা অংশ যারা দখল নিয়ে রেখেছে, তারা বিজেপি বিধায়ক রাজেশ চৌধুরির লোক। বিধায়ক নিজে ফোন করে মাস্টারকে ধমকে ছিলেন। তার শাগরেদরা বলেছিলেন, দুই মিনিটে আপনার ব্যবস্থা হবে। জান মহম্মদ স্যার স্কুলের জমি দখল নিতে বাধা দিচ্ছিলেন। আর ৮০০ মুসলিম ভোট কাটার যে চেষ্টা বিজেপি করছে সেটা করতে দেননি। এই দুটোই তার অপরাধ। এই জন্যই তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছে, স্পষ্ট বললেন গ্রামের বাসিন্দা বছর পঁয়ত্রিশের যুবক সঞ্জয় পান্ডে। গ্রামেরই বাসিন্দা নবীন পাঠকও জানিয়েছেন, এসআইআরে মহমেডানদের নাম কাটার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিলো। না মানাতেই স্যারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। বিজেপি নেতা দুর্গেশ প্রধান তো এই গ্রামের বাসিন্দাই নন, কোনও তদন্ত না করে তার অভিযোগ মেনে নিল প্রশাসন। আরেক বাসিন্দা মাঝবয়সি সঞ্জয় পাঠকেরও স্পষ্ট কথা, এটা পুরোটাই রাজনীতির বিষয়। এসআইআর-এ নাম কাটার জন্যই জান মহম্মদ স্যারের মতো ইমানদার মানুষকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। 
সরকার, প্রশাসন, শাসক দলের বিরুদ্ধে এইভাবে লড়ার সাহস পাচ্ছে কীভাবে নওঝিলের মানুষ? গ্রামবাসীদের সমবেত বক্তব্য, এই অন্যায় মানবোই না। স্যারকে স্কুলে ফিরিয়ে ছাড়বো আমরা। সঞ্জয়, নবীনদের মতো যাঁরা কমবয়সি, বললেন- একা দীপক লড়ে নিলেন, আমরা এত লোক পারবো না? উত্তরাখণ্ডের কোটদ্বারের ‘মহম্মদ দীপক’-র মানবিকতা, সাহসিকতার ভিডিও দাবানলের মতো ছড়িয়েছে। সেই দাবানল প্রতিবাদের আগুন লাগিয়েছে মথুরার অখ্যাত গ্রামেও। ঘৃণার মতো ভালোবাসাও প্রবল সংক্রামক, আরও একবার প্রমাণিত।

Comments :0

Login to leave a comment