গল্প
নতুনপাতা
--------------------------
প্রকৃত বন্ধু
--------------------------
সৌরীশ মিশ্র
"মা, তুমি কোথায়? রান্নাঘরে?" ওর পড়ার ঘর থেকে ছুটে বেরোতে বেরোতে কথাকটা চেঁচিয়ে বলল বান্টি।
স্কুল থেকে একটু আগেই ফিরেছে সে। এইবার ক্লাস সিক্স হোলো ওর। ওদের স্কুলে ক্লাস সিক্স থেকেই ডে। এগারোটা থেকে সাড়ে তিনটে পর্যন্ত ক্লাস।
স্কুলব্যাগটা থেকে এক এক করে বই-খাতাগুলো বের করছিল বান্টি। আর ঐগুলো বের করে যেই না টিফিন বক্সটা টেনে বের করেছে ব্যাগ থেকে, ওমনি ব্যাপারটা খেয়াল হোলো ওর। আর সাথে সাথেই এও মাথায় এলো, এই ব্যাপারটা জানানো দরকার এখনই মা-কে। তাই, টিফিন বক্সটা হাতে নিয়েই সে ছুটে বেড়িয়ে এল ওর পড়ার ঘর থেকে।
বান্টি ধরেছিল ঠিকই। ওর মা সম্পূর্ণা দেবী রান্নাঘরেই ছিলেন। ছেলে স্কুল থেকে ফিরেছে। একটু টিফিন খায় সে এই সময়। তারপর খেলতে যাবে মাঠে। তারই ব্যবস্থা করছিলেন তিনি। তখুনি, বান্টির চেঁচিয়ে বলা কথাগুলো শুনতে পেলেন। টিফিন দেবেন, তাই একটা ডিশ ধুছছিলেন তিনি। সেটা ধুতে ধুতেই তিনিও একটুখানি গলা চড়িয়েই বললেন, "হ্যাঁ, আমি রান্নাঘরে। কেন, কি হয়েছে? যা বলবি, এখানে এসে বল্।"
সম্পূর্ণা দেবীর বলা সবে শেষ হয়েছে, বান্টি ছুটে এসে দাঁড়াল রান্নাঘরের সামনে। জোড় দৌড়ে আসায়, এখন হাঁফাচ্ছে ও। সে ঐ অবস্থাতেই কোনোমতে বলল, "মা, টিফিন বাড়ো নি তো? বেড়ো না।"
ছেলের কথা শুনে অবাক হন সম্পূর্ণা দেবী। যে ছেলে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই "মা, খেতে দাও, এক্ষুনি খেতে দাও, ভীষণ খিদে পেয়েছে।" বলে বলে প্রতিদিন তাঁকে পাগল করে দেয়, সে এ বলছে কি! হাতের ডিশটা ধোয়া হয়নি তখনও তাঁর। জলের কলটা তাড়াতাড়ি বন্ধ করে, ডিশটা সিঙ্কেই রেখে, ভেজা হাতটা তাঁর শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে, ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছেলের কাছে তাড়াতাড়ি গিয়ে কপালে হাত রাখলেন বান্টির তিনি বলতে বলতে, "কেন রে, টিফিন খাবি না কেন? শরীর-টরির খারাপ হোলো নাকি তোর? না:, গা তো গরম নয়।"
"না, না। শরীর খারাপ হয় নি মা। শরীর খারাপ হবে কেন!" বলে বান্টি।
"তবে! টিফিন খাবি না, বলছিস কেন?" অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন সম্পূর্ণা দেবী।
"আজ অনন্য এসেছিল স্কুলে, মা।" বলে বান্টি।
"অনন্য? ও, স্কুলে তোর বেস্ট ফ্রেন্ড। ওর তো খুব শরীর খারাপ হয়েছিল। তা, কেমন আছে এখন ও?"
"এখন অনেকটাই ভাল, মা। তবে, এতো বড় একটা অপারেশন হোলো তো, তাই খাবার কিছু রেস্ট্রিকশন আছে। যেমন, অয়লি ফুড, স্পাইসি ফুড, জাঙ্ক ফুড, এসব খাওয়া যাবে না কোনো, নেক্সট কিছুদিন। তা, আমি আর ও তো সবসময় টিফিন শেয়ার করে খাই। আর আজ তো তুমি আমাকে টিফিনে লুচি দিয়েছো। আমি তো জানি, ওরও লুচি খুব ফেভারিট আমারই মতো। ও বাড়ি থেকে এনেছিল ওকে ডক্টর যেরকম প্রেসক্রাইব করেছেন তেমন টিফিন। ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ওর সামনে কি করে খাই মা লুচি! ওকে মিথ্যে মিথ্যে করে বললাম, আজ টিফিন আনতে ভুলে গেছি আমি। ওর টিফিন থেকেই খেয়েছি আজ। কাল থেকে যতদিন অনন্যর খাবারের রেস্ট্রিকশন থাকবে, আমাকেও অয়লি, স্পাইসি ফুড, টিফিনে দিও না, মা। আর, এই টিফিনটা এখন আমি খেয়ে নিচ্ছি। সেটাই বলতে দৌড়ে এলাম। তুমি যদি আবার অন্য টিফিন বাড়ো।" টানা এতোগুলো কথা বলে কয়েকক্ষণের জন্য একটু থামে বান্টি। তারপর ফের বলে ওঠে সে, "আমি অনন্যর সামনে এই টিফিনটা খাই নি, ঠিক করিনি, মা?"
"খুব, খুব ভালো করেছিস বাবা। খুব ভালো করেছিস।" সাথে সাথেই বলে ওঠেন সম্পূর্ণা দেবী। আর কথাটা বলতে বলতেই তিনি টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন তাঁর ছেলেকে দু'হাতে তাঁর বুকে। সম্পূর্ণা দেবীর চোখে আনন্দাশ্রু। ছেলের জন্য রীতিমত গর্ব হচ্ছে তাঁর।
Comments :0