MD SALIM

গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বাঁচাতে না পারলে ভয়ঙ্কর বিপদ: সেলিম

রাজ্য কলকাতা

আরএসএস-বিজেপি যেভাবে দেশের বিচারব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক সংবিধানের পক্ষে চরম বিপদের লক্ষণ বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। শনিবার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে আয়োজিত এক আলোচনাচক্রে সেলিম বলেন, বিচারবিভাগকে প্রভাবিত করে ন্যায়বিচারকে প্রহসনে পরিণত করতে পারলে আরএসএস-বিজেপি দেশবাসীর কোনও অধিকারই স্বীকার করবে না। তাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ সোচ্চার আন্দোলনেই এর প্রতিরোধ করতে হবে। গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে না পারলে ভয়ঙ্কর বিপদ।
এদিন ‘উৎসাহী’, ‘আওয়াজ’, পশ্চিমবঙ্গ সামাজিক ন্যায় মঞ্চ, সেভ ডেমোক্র্যাসি, ‘আক্রান্ত আমরা’, প্রোটেকশন অব পিপলস রাইট অর্গানাইজেশন, অল ইন্ডিয়া ল’ইয়ার্স ইউনিয়ন এবং সৈয়দ সাজ্জাদ জাহির বার্থ অ্যানিভার্সারি কমিটির ডাকে ‘ট্র্যাভেস্টি অব জাস্টিস’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন হয়। মহম্মদ সেলিম ছাড়াও বক্তব্য রাখেন আইনজীবী সৈয়দ শাহিদ ইমাম, সমাজকর্মী বনজ্যোৎস্না লাহিড়ী প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন সংগঠনগুলির নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিরা। উপস্থিত ছিলেন নিহত আনিস খানের ন্যায়বিচার না-পাওয়া পিতা সালেম খান। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আমরা ছাড়বো না, যতদূর যেতে হয় যাব। বিজেপি-আরএসএস-তৃণমূলকে পরাস্ত করতেই হবে। 
আর সমাজকর্মী বনজ্যোৎস্না লাহিড়ী বলেছেন, দু’-একদিন নয়, টানা পাঁচবছর ধরে ন্যায়বিচারের প্রহসন আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতায় দেখছি। দিল্লির পুলিশের ভূমিকা তো দেখেছিই, তারপরে আদালতের বিস্ময়কর ভূমিকাও দেখেছি। পাঁচবছর ধরে বিচারহীন হয়ে বন্দি রয়েছেন আমাদের বন্ধুরা, তাদের জামিন না দিয়ে আদালতকে বলতে শুনেছি, ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানের পিছনেও নাকি সন্ত্রাসবাদ থাকতে পারে!


উমর খালিদ, সার্জিল ইমামদের বিনাবিচারে ইউএপিএ ধারায় আটকে রাখার উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, শুধু আমাদের বন্ধুদের জন্য বলছি না, এই আক্রমণ দেশের যে কোনও  প্রতিবাদী নাগরিকদের ওপর হতে পারে। এই কেসটা আসলে দেশের পরিস্থিতির একটা আয়না। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু বামপন্থীরা ছাড়া অন্য কোনও রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থান থেকে আওয়াজ তোলেনি। কেন অন্য কোনও দল এই হিম্মৎ দেখাতে পারছে না? এই ইউএপিএ তো আগামী দিনে তাদের বিরুদ্ধেও আরোপ হতে পারে!
মহম্মদ সেলিম বলেন, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। এর প্রতিবাদে যখন হিন্দু-মুসলমান সমস্ত ধর্মের মানুষ নির্বিশেষে, আদিবাসী, দলিত, বস্তিবাসী মানুষ অধিকার বুঝে নিতে রাস্তায় নামেন, তখন বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে সেই আন্দোলন ভেস্তে দেওয়ার ছক কষা হয়। মূলত আইনের অপব্যাখ্যা করে তার ধারাটাই পালটে দেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছে। উগ্র হিন্দুত্বের আড়ালে এমনই এক স্বৈরাচারী সরকার চলছে দেশে, বিভিন্ন ‘কালো আইন’ তৈরি করছে নিজেদের স্বার্থে। এই রাজ্যেও একই ঘটনা ঘটে চলেছে। সেই জন্যেই আনিস খানদের হত্যার প্রকৃত তদন্ত বা বিচার হয় না।
সেলিম বলেন, এটাই গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণ যা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। বামপন্থীদের আরও অনেক বেশি করে সোচ্চার হতে হবে এর বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, আমরা বাস্তবে কী দেখছি, যারা আন্দোলন করছেন তাঁদেরই নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, জেলে ভরা হচ্ছে। কিন্তু যারা উসকানি দেয় তাদের বিরুদ্ধে কোনও তদন্ত হয় না। এভাবে আন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা চলে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে নিম্ন আদালত, বিচার ব্যবস্থার মধ্যে বিস্তর ফাঁক ধরা পড়ছে। ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দিতে বিচারপতিদের এক বড় ভূমিকা রয়েছে, কিন্তু তা সবসময় বজায় থাকছে না, প্রভাব খাটানো হচ্ছে নানাভাবে। এভাবেই বিচার ব্যবস্থাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে স্বৈরাচারীরা, যেন ন্যায়বিচার চাওয়াটাই অপরাধ।
মহম্মদ সেলিম বলেন, সংবিধানের ধারাগুলির ব্যাখ্যা তো দেবে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সুপ্রিম কোর্টের কার্যকলাপ মানুষকে হতাশ করছে। বিচারহীনতাই যদি আইন হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এর বিরুদ্ধে দিকে দিকে আরও বেশি সোচ্চার হয়ে ওঠাও আমাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব। সুপ্রিম কোর্ট অনায়াসে যদি আরাবল্লী পাহাড়ের নতুন সংজ্ঞা বলে দিতে পারে, যা শেখানো হয়েছে, তাহলে একমাত্র ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদই তা অনেকাংশে রুখতে পারে- এটাও দেখা গিয়েছে। সুতরাং কর্পোরেটদের স্বার্থে নতুন আইনকানুন এনে, আইনকে প্রভাবিত করে যদি চুপ করানোর চেষ্টা হয় তাহলে প্রতিরোধে আরও বেশি করে সোচ্চার হতে হবে আমাদের।
এদিন বক্তব্য রাখতে গিয়ে সৈয়দ শাহিদ ইমাম বলেন, আসলে শাসক চাইলে বিচার হচ্ছে, না চাইলে ন্যায়বিচার হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্টও এর বাইরে নেই। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বারবারই আরএসএস-বিজেপি’র বোঝাপড়া সামনে এসেছে বিচারব্যবস্থার প্রহসনের মধ্যে দিয়েই। বামেরাই বারবার এর বিরোধিতা করেছে। আরএসএস-তৃণমূলের মূল উদ্দেশ্য একটাই, বিচ্ছিন্নতাবাদ কায়েম করা। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান ঐক্য যত বেশি মজবুত হবে আরএসএস’র প্রচেষ্টা ততই দুর্বল হবে। 
এদিন আক্রান্ত আমরা’র পক্ষ থেকে রাজ্যের ন্যায়বিচারহীন নানা অমানবিক ঘটনাবলীর চিত্র প্রদর্শিত হয়।

Comments :0

Login to leave a comment