Bangladesh Election

অসম লড়াইয়ে নিরলস বামপন্থী কর্মীরা

আন্তর্জাতিক

বখতিয়ার আবিদ চৌধুরি: ঢাকা

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটায় আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে নির্বাচনী প্রচার। অর্থাৎ সোমবারই ছিল প্রচারের শেষ দিন, এ কথা বলাই যায়। ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই প্রচারে বড় দলগুলির বিপুল অর্থ ও কর্মী বাহিনীর বিপরীতে বামপন্থী দলগুলির বৃহত্তর জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’-এর প্রার্থীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রচার চালিয়ে গেছেন। প্রচার যুদ্ধে তাদের এই লড়াই স্বাভাবিকভাবেই ছিল অসম। তবে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কোনও আসন সমঝোতা হয়নি। বহু আসনে ফ্রন্টের শরিক দলের একাধিক প্রার্থী রয়েছে। ৩০০ সংসদীয় আসনের সবকটিতে প্রার্থী দিতে পারেনি ফ্রন্টের কোনও শরিক। সর্বোচ্চ দিতে পেরেছে সিপিবি। তাদের ৬৩ জন প্রার্থী কাস্তে প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নির্বাচনে। এ ছাড়া ১৭ জন ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রার্থী দিয়েছে সিপিবি। এটি  নির্বাচনে অংশ নেওয়া সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। অন্য কোনও দলই এত জন সংখ্যালঘু প্রার্থী দেয়নি। 
বামপন্থী দলগুলোর নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে প্রধানত কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতার কথা প্রাধান্য পেয়েছে। এ ছাড়াও, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিলোপ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, নারী অধিকার নিশ্চিত করা সহ বিভিন্ন অঙ্গীকার করেছে বামপন্থী দলগুলি। ইশ্‌তেহার নিয়ে গ্রাম-গঞ্জে চষে বেড়িয়েছেন বামপন্থী দলগুলির নেতাকর্মীরা। তারা মানুষের ঘরে ঘরে গেছেন, সময় নিয়ে কথা বলেছেন, জনগণের সুবিধা-অসুবিধা, দাবিদাওয়ার কথা শুনেছেন এবং নির্বাচিত হলে সেসব নিয়ে কাজ করার বিষয়ে আশা ব্যক্ত করেছেন। 
যুক্ত ফ্রন্টের অন্যতম শরিক বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফি রতন জানালেন, ‘‘বড় দলগুলি নির্বাচনী বিধিমালা মানেনি। তারা অঢেল অর্থ ব্যয় করেছে। আমি যে আসন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি (কুমিল্লা-৫) এখানে ওই বড় দলগুলির প্রার্থীদের শত শত বিলবোর্ড লাগানো হয়েছে। অথচ ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহারের নিয়ম নির্বাচনী আচরণবিধিতে নেই। আমরা আচরণবিধি মেনেই নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছি।’’ প্রচারের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ক্বাফি রতন বলেছেন, ‘‘ভালো প্রচার হয়েছে। মানুষ সাড়া দিয়েছেন। আমরা আমাদের সাংগঠনিক সামর্থ্য অনুযায়ী প্রচার কাজ করেছি। আমরা আশাবাদী—গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট এবং সিপিবি নির্বাচনে ভালো ফল করবে।’’ এবারের নির্বাচনে বামপন্থী প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-র প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বরিশাল-৫ (সদর) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মনীষা দীর্ঘদিন ধরে নিজ আসনের শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করে আসছেন এবং স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগ নিয়ে ব্যাপক সোচ্চার ছিলেন। আলোচনায় রয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন। নরসিংদী-৪ (বেলাবো- মনোহরদী) আসনে প্রার্থী হয়েছেন তিনি। এ আসনটি এক সময় বামপন্থীদের শক্তিশালী জায়গা ছিল। সাজ্জাদ জহির চন্দনের নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মেহেদী হাসান রাতুল বললেন, ‘‘এই এলাকটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় বামপন্থীদের দুর্বার প্রতিরোধের ইতিহাস রয়েছে। স্বাধীনতার পরও বহু বছর এখানে কমিউনিস্ট পার্টি শক্তিশালী ছিল। প্রচার চালাতে গিয়ে এখানকার প্রতিটি ঘরে এক থেকে একাধিক কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক নেতা ও কর্মীর দেখা পেয়েছি, যারা বহু বছর সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছেন, কিন্তু এখনো পার্টির সমর্থক। আমরা আশাবাদী।’’ নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনে এদিন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নেত্রকোনা-৪ আসনের সিপিবি প্রার্থী জলি তালুকদারের সমর্থনে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রার্থীকে নিয়ে মিছিলও হয়। ব্যানারে, প্ল্যাকার্ডে দলের প্রতীক কাস্তের ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে- ‘মমতায় সাজাবো সমতার দেশ, জিতলে কাস্তে রাত হবে শেষ।’ 
নির্বাচনী প্রচারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াত থেকে বামপন্থী দলগুলি পিছিয়ে থেকেছে। এর প্রধানতম কারণ ‘অর্থনৈতিক’, আরেকটি হলো অপেক্ষাকৃত কম জনবল। এ ছাড়া মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলির উপেক্ষাও রয়েছে। বামপন্থী দলগুলি তাদের নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহ করছে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অনুদানের ওপর। যা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট কম। অন্য দিকে বড় দলগুলির পেছনে অদৃশ্য ভাবে রয়েছে দেশের বড় ব্যবসায়ীদের হাত। স্বাভাবিকভাবেই বামপন্থীদের সঙ্গে তাদের নির্বাচনী প্রচার জলুস এবং শক্তিতে ব্যাপক পার্থক্য ছিল। তবে সবকিছু ছাপিয়ে নিরলস কাজ করে গেছে এই দলগুলির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। বহুক্ষেত্রে প্রচারে বড় দলগুলির সঙ্গে তারা পাল্লা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, এই জোটের বাইরে থাকা বামপন্থী দলগুলির মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। আওয়ামি লিগের সঙ্গে সরকারে থাকা ওই দলের প্রাক্তন সভাপতি রাশেদ খান মেনন বর্তমানে জেলবন্দি আছেন। আওয়ামি লিগের মতো ওয়ার্কার্স পার্টির কাজকর্ম নিষিদ্ধ করা না হলেও, তাদের উপরে আক্রমণ আছে। মামলা-মোকদ্দমাও চলছে। দপ্তরও একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছে। 
 

Comments :0

Login to leave a comment