Kerala Vision

বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই শক্তি, দুর্বল হলে ক্ষতি গণতন্ত্রের নেতৃবৃন্দ

জাতীয়

জাতীয় ঐক্য, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক অধিকার—এই তিন প্রশ্নকে সামনে রেখে কেন্দ্রের নীতির কড়া সমালোচনা করলেন জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লা। কেরালা রাজ্য পরিকল্পনা বোর্ড আয়োজিত ‘ভিশন-২০৩১’ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে  মঙ্গলবার তিনি বক্তব্য রাখেন। এদিন ওই সম্মেলনের শেষ দিন ছিল। সমাপ্তি অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পিনারাই বিজয়নও। উল্লেখ্য, এই সেমিনারেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন কেরালাকে দেশের সামনে বর্তমান মডেল বলে উল্লেখ করেছেন। কেরালার শিক্ষা ক্ষেত্র সহ বিভিন্ন বিষয়ের উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রশংসা করেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার। সমাপ্তি অধিবেশনে এদিন প্রকাশ কারাত, বিশিষ্ট সাংবাদিক এন রাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এদিনের সভায় বক্তারা যা বলেন, তার সার কথা- ভারতের শক্তি বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে, আর সেই ভিত্তিই যদি দুর্বল হয়, তবে গণতন্ত্রও ঝুঁকির মুখে পড়বে। 
শেষ দিনে প্রধান বক্তা ছিলেন ফারুক আবদুল্লা। তিনি বলেন, নির্বাচনী স্বার্থে বিভাজনের রাজনীতি দেশকে দুর্বল করছে। তাঁর মতে, উত্তর ভারতে মেরুকরণ বাড়লেও দক্ষিণ ভারত, বিশেষ করে কেরালা এখনও সম্প্রীতি ও উন্নয়নের এক ভিন্ন মডেল তুলে ধরছে। কেরালার দারিদ্র্য দূরীকরণ ও বহু ধর্মের সহাবস্থানের উদাহরণ টেনে তিনি একে ভারতের প্রকৃত গণতান্ত্রিক আদর্শের ধারক হিসেবে বর্ণনা করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শ স্মরণ করিয়ে আবদুল্লা বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা এমন ভারতের জন্য লড়াই করেননি যেখানে মানুষ ভয়ে থাকবে- কে কী খায়, কোথায় থাকে বা কাকে প্রার্থনা করে তার ভিত্তিতে বিচার হবে। জাতীয় সংহতি ও শান্তির পক্ষে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ভারতের শক্তি বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে, আর সেই ভিত্তিই যদি দুর্বল হয়, তবে গণতন্ত্রও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
কেরালার ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন ওই অনুষ্ঠানে বলেন, এখানে ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু সাংবিধানিক নীতি নয় বরং স্কুল, পাড়া ও কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিনের জীবনের অনুশীলন। বিশ্বের বহু সমাজের মতো ভারতেও যখন মেরুকরণ বাড়ছে, তখন কেরালা অন্তর্ভুক্তিমূলক জনপ্রতিষ্ঠান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতির মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রেখেছে বলে দাবি তাঁর। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বিজয়ন বলেন, সামাজিক সংহতি উন্নয়নের পূর্বশর্ত। সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাস ছাড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগ সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, কেরালার ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা রাজ্যের অন্যতম মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদ।
৩৭০ ধারা রদ এবং জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে কাশ্মীরের মানুষের জন্য ‘ট্র্যাজেডি’ বলে বর্ণনা করে তিনি বলেন, এই পদক্ষেপের পরেও সন্ত্রাসবাদ নির্মূল হয়নি; বরং মানুষের মৌলিক অধিকার, অবাধে চলাফেরা, কথা বলা ও মতপ্রকাশ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “জনগণের, জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা” এই আদর্শই আজ কাশ্মীরে ক্ষীণ। উত্তর ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাশ্মীরি পড়ুয়াদের ‘পাকিস্তানি’ তকমা দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এতে তাদের মানসিক ও সামাজিক চাপ বাড়ছে। সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে কেন্দ্রের দাবির জবাবে তিনি পুলওয়ামা, পহেলগাম ও উধমপুরের হামলার প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তোলেন, ৩৭০ বাতিলের পরও যদি হামলা থামে না, তবে প্রতিশ্রুতির বাস্তব ফল কোথায়?
কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের অবনতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী। সব সিদ্ধান্ত যদি দিল্লি নেয়, তবে রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন কোথায়? প্রশ্ন তোলেন ফারুক আবদুল্লা। 
কাশ্মীরের অর্থনীতি মূলত উদ্যান পালন ও পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য সমঝোতা, আপেল, আখরোট ও কাঠবাদাম চাষিদের অনিশ্চয়তায় ফেলতে পারে, এই আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।জ্বালানি নীতিতেও বিদেশি চাপের ইঙ্গিত দিয়ে আবদুল্লা বলেন, ভারত কোন দেশ থেকে তেল কিনবে বা কী দামে পণ্য বিক্রি করবে, সেসব প্রশ্নে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। 
বিজয়ন বলেন, দেশের বিভিন্ন রাজ্য ক্রমবর্ধমান আর্থিক সংকোচনের মুখে পড়ছে, অথচ জনপরিষেবা ও উন্নয়নের দায়বদ্ধতা বেড়েই চলেছে, এই প্রেক্ষিতে কেন্দ্র–রাজ্য আর্থিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পূর্বানুমান যোগ্যতা ও ন্যায্যতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিলেন পিনারাই বিজয়ন। ‘ভিশন ২০৩১’ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপ্তি অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এদিন তিনি বলেন, আজ রাজ্যগুলিই জনপরিষেবা প্রদান ও উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। কিন্তু তাদের আর্থিক পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
কেরালার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্য নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ অনুপাত বজায় রেখেছে এবং শক্তিশালী জনপরিষেবা কাঠামো ধরে রেখেছে। তবে আন্তঃসরকারি আর্থিক বন্দোবস্ত, ঋণ গ্রহণের সীমা এবং কেন্দ্রীয় অনুদানের কাঠামোয় পরিবর্তনের ফলে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এই প্রশ্নকে সংঘাতের ভাষায় নয়, গণতান্ত্রিক শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা উচিত। সহযোগিতা মূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য প্রয়োজন পূর্বানুমান যোগ্যতা, ন্যায্যতা এবং সাংবিধানিক ভূমিকাগুলির প্রতি সম্মান। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও পরিকাঠামোর মতো ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে রাজ্যগুলির যথেষ্ট আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে। 
আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কেরালা কল্যাণমূলক কর্মসূচি, শিক্ষা ও জনপরিষেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছে বলে জানান বিজয়ন। ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক ও সমাজের দুর্বল অংশের জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলি আর্থিক দায়বদ্ধতা ও সামাজিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ভিশন ২০৩১’ শুধুমাত্র একটি নীতিপত্র নয়; এটি আত্মসমীক্ষা, সংলাপ ও কল্পনার সম্মিলিত প্রয়াস—রাজ্যের ৭৫তম বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে অতীতকে বুঝে বর্তমানকে মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের রূপরেখা।
কেরালায় জননীতির প্রণয়ন বরাবরই রাষ্ট্র ও সমাজের সংলাপের মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ভূমি সংস্কার, জনশিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ, সামাজিক সুরক্ষা এবং বিকেন্দ্রীভূত পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় কেরালার উন্নয়নযাত্রা গড়ে উঠেছে—এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে বাজার একা সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করতে পারে না, মন্তব্য তাঁর। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সবার মর্যাদা ও মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষমতার ভিত্তিতে বিচার করা উচিত বলেও তিনি বলেন। বিজয়ন বলেন, ‘ভিশন ২০৩১’-এর আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে কেরালার ভবিষ্যৎ কৌশল তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত নীতির ওপর নির্ভরশীল—গুণগত কর্মসংস্থানসহ প্রবৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক ন্যায়। বিজয়ন জোর দিয়ে বলেন, ২০৩১ সালের কেরালা হবে সমৃদ্ধ, উদ্ভাবনী ও সহনশীল। কিন্তু সর্বোপরি, তাকে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় অটল থাকতে হবে। 

Comments :0

Login to leave a comment