পার্থপ্রতিম বিশ্বাস
ইতিমধ্যে দেশজুড়ে ঘটা করে দেশের সরকার নতুন শ্রম আইন চালু করেছে শ্রমকোডের নাম করে। কিন্তু সেই নতুন আইনে শ্রমিক সুরক্ষার যে ন্যূনতম উপাদানগুলি ছিল অতীতে সেগুলিও তুলে দেওয়া হচ্ছে আধুনিকীকরণের অছিলায়। দেশের রাজধানী থেকে রাজ্যের রাজধানী সর্বত্রই আজ একুশ শতকে রাস্তার নিচ দিয়ে ছুটে চলা নিকাশি পাইপ লাইন পরিষ্কার করতে গিয়ে ম্যানহোলে নেমে আজও মারা যাচ্ছে দলে দলে শ্রমজীবী মানুষেরা। তাঁদের ন্যূনতম সুরক্ষার বালাই নেই এই নতুন শ্রম আইনে। জলবায়ু পরিবর্তনে বিধ্বস্ত শহরে রোদে পুড়ে কাজ করতে এসে হিটস্ট্রোকে মারা যাচ্ছে দলে দলে মানুষ। অথচ সরকারের কোনও হেলদোল নেই। ‘র্যা টহোল মাইনিং’ নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও মেঘালয়ের নিষিদ্ধ কয়লা খনিতে আজও মারা যাচ্ছে ডজন ডজন মানুষ। অথচ সরকারি আইনে কোনও সুরাহা নেই। সেই আশির দশকে বহুজাতিক ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানায় বিস্ফোরণ আজও মনে করিয়ে দেয় কল-কারখানায় কতটা অরক্ষিত থাকে শ্রমিকেরা।
সংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রম সুরক্ষার ছিটেফোঁটা আইন কানুন কিছুটা থাকলেও দেশের অসংগঠিত ক্ষেত্র রয়েছে সবচেয়ে অরক্ষিত অবস্থায়। যেখানে কর্মরত দেশের ৯০% শ্রমজীবী মানুষ। এই নতুন প্রযুক্তির যুগে বিপর্যয় মোকাবিলায় পরিকল্পিত প্রস্তুতি কিংবা প্রযুক্তি আবিষ্কার হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু সেই প্রযুক্তির প্রয়োগ নির্ভর করে রাষ্ট্রের শাসকের দৃষ্টিভঙ্গির উপরেই। আমাদের মতো আধা সামন্ততান্ত্রিক দেশের শাসকদলের সিংহভাগ সামন্ততান্ত্রিক ধারণাকে পুঁজি করেই দল কিংবা সরকার চালায়। ফলে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজা বনাম প্রজার যে সম্পর্ক নিহিত থাকে এদেশের সমাজেও এখন সেই অবস্থা বিদ্যমান। ফলে দেশের শাসক সিংহভাগ শ্রমজীবী মানুষকে কেবল উৎপাদনের জীবন্ত উপকরণ মনে করে বলেই তাদের সম্মান, তাদের সুরক্ষা, তাদের জীবন-জীবিকা সম্পর্কে উদাসীন থাকে। দেশের প্রধানমন্ত্রী ‘বিকশিত ভারতের’ গাল ভরা কথা প্রচার করলেও দেশজুড়ে বৈষম্য শোষণের চূড়ান্ত রূপ দেখছে এ দেশের শ্রমিকেরা। প্রযুক্তির সাথে পুঁজির মেলবন্ধনেই সৃষ্টি হয় কাজের নতুন নতুন ক্ষেত্র। অথচ সেই কাজে নিয়োজিত মানুষেরাই যদি কর্মক্ষেত্রে অসুরক্ষিত থাকে, তবে যে গোটা ব্যবস্থাটাই সমাজে ঝুঁকিপ্রবণ হয়ে ওঠে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে দেশের অর্থনীতি যদি পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের পথে ছোটে তখন সেই অর্থনীতির চালিকা শক্তিকেও সুরক্ষিত রাখা জরুরি সমাজের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে। কিন্তু দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতির বাজারে, পণ্য কিংবা পরিষেবা ক্ষেত্রে দ্রুত ও বাড়তি লাভের কড়ি নিশ্চিত করতেই শ্রমিক সুরক্ষার খরচ ছাঁটাইয়ের আধুনিক মডেল চালু করেছে এদেশের কর্পোরেট শিল্পগোষ্ঠীরা দল বেঁধে। এদেশে চালু হওয়া নতুন শ্রমকোড হলো ঠিক সেই মডেলেরই বহিঃপ্রকাশ। ফলে সঙ্গত কারণেই আসমুদ্র হিমাচল দেশের শ্রমজীবী মানুষেরা এই নতুন শ্রমকোডের বিরোধিতায় পথে নেমেছে, নেমেছে ধর্মঘটের পথে।
ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধির আবহে এখন দেশের শহরাঞ্চলে শ্রমজীবী মানুষদের একটা আট ঘণ্টার কাজে দিন চলে না। শহরের জীবনধারণের বাড়তি খরচ মেটাতে এখন একজন মানুষ সারা দিনে খেপে খেপে কখনো ছোট শিল্পে, কখনো পরিষেবা ক্ষেত্রে আবার কখনও স্বনিযুক্তি প্রক্রিয়ায় রোজগারের পথ ধরেছে। ফলে কয়েক দশক আগেও সংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিকেরা মালিকপক্ষের সাথে মজুরি থেকে সুরক্ষার প্রশ্নের যে পর্যায়ের দরকষাকষি করতে পারতো আজ সেটাও উত্তরোত্তর কঠিন হয়ে পড়ছে, শ্রমজীবী মানুষের শ্রমের এমন খন্ড খন্ড বিভাজনে। এই প্রেক্ষিতে শ্রম সুরক্ষার ন্যূনতম বিধি নিষেধ ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে কর্পোরেট সংস্কৃতিতে। কাজের সময় থেকে শুরু করে কাজের ক্ষেত্রে সুরক্ষা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই আপস করতে হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষকে। আর সেই আপসের এক প্রাণঘাতী অধ্যায়ের সাক্ষী হলো রাজ্যের মানুষ আনন্দপুরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।
সম্প্রতি পূর্ব কলকাতা লাগোয়া আনন্দপুরের গুদামে আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিরিশ জন শ্রমিক। বলাই বাহুল্য ওই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রেক্ষিতে একদিকে যেমন বেরিয়ে এসেছে রাজ্যে বিপর্যয় মোকাবিলার কঙ্কালসার চেহারা, পাশাপাশি আগুনের গ্রাসে ঝলসানো সারি সারির মৃতদেহ তুলে ধরেছে শহরের জতুগৃহে রূপান্তরের ভয়াবহ অধ্যায়কে। শহরের সেই হতশ্রী চেহারার সাথে জুড়ে গেছে নগর জীবনে বেআইনি নির্মাণের দাপট। কার্যত জলাজমি বুজিয়ে এমন একের পর এক বেআইনি নির্মাণে প্রতিদিন বেরিয়ে আসছে শহরের পুলিশ প্রশাসনের বেহাল স্বাস্থ্যের কদর্যরূপ। আনন্দপুরের আগুনের গ্রাসে ঝলসানো সারি সারি মৃতদেহের ভাঙাচোরা অংশগুলি তুলে ধরছে, ভেঙে পড়া শহরের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে। আর শহরজুড়ে এমন প্রশাসনিক অব্যবস্থার অন্তরালে চাপা পড়া শহরের শ্রম সুরক্ষার নগ্ন চেহারাটাও প্রকাশ্যে এসেছে। কার্যত একটা মোমো ও একটা ডেকোরেটরের গুদামে আগুন লাগার পর তালাবদ্ধ সেই গুদামে থাকা দলে দলে মানুষ বাইরে বেরোতে না পেরে কয়েকশো ডিগ্রি তাপে ঝলসে এবং কালো ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। শ্রমিক সুরক্ষার নিরিখে আনন্দপুরের ওই নৃশংস অগ্নিকাণ্ড আসলে এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডেরই শামিল।
অর্থনীতির নিয়ম মেনেই গত কয়েক দশক ধরে শহরের পরিধি বাড়ছে। শহরের মধ্যে জনঘনত্ব থেকে নির্মাণ ঘনত্ব সবই বেড়ে চলেছে দ্রুত। বাড়ছে শহরে কাজ করতে আসা নিত্যযাত্রীর সংখ্যা। বাড়ছে শহরে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা। কলকাতা শহর এখন আর উৎপাদন কেন্দ্রিক শহর নয় বরং সেটা হয়ে উঠেছে পরিষেবা কেন্দ্রিক। প্রতিদিন ওই পরিষেবা কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে হাজার হাজার তরুণ প্রজন্ম পেটের দায়ে কলকাতা শহরে আসে এবং ফিরে যায়। আবার রয়ে যায় কেউ কেউ শহরের অস্থায়ী আস্তানায় সারাদিনের কাজের কার্যকরী সময় বাড়িয়ে তুলতে। কখনো ফুটপাতের ছাউনি, কখনো অল্প দামের মাথা গোঁজার ঠিকানা, কখনও আনন্দপুরের মতো অভিশপ্ত গুদামঘরকে সঙ্গী করে, শহরজুড়ে থাকে এমন বহু পরিযায়ী শ্রমিকেরা। শহরজুড়ে এমন পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রাথমিক স্বীকৃতি সরকারি স্তরে সম্প্রতি মিললেও তাদের ন্যূনতম মজুরি থেকে ছুটি, দুর্ঘটনা থেকে চিকিৎসা বিমা সবই অধরা রয়ে গেছে নতুন শ্রম আইনে। দেশজুড়ে শ্রমিকের চরিত্রগত পরিবর্তন নিয়েও ভাবিত নয় দেশের কিংবা রাজ্যের সরকারগুলি। ফলে শহরে কাজ করতে এসে কর্মক্ষেত্র থেকে বাসস্থান প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রাণের ঝুঁকির সামনে পড়ছেন এই অসংগঠিত ক্ষেত্রে মানুষেরা। অভিশপ্ত মোমো কিংবা ডেকোরেটরের গুদাম দুটি ছিল দাহ্যবস্তুতে ঠাসা। ফলে ওই জাতীয় ঝুঁকিবহুল গুদাম কিংবা ওয়্যা রহাউজগুলির অগ্নিসুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি শ্রমিক সুরক্ষার স্বার্থেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় শহর কলকাতা ঘেঁষা বিস্তীর্ণ জলাভূমি যেগুলির সিংহভাগ আবার পঞ্চায়েত এলাকাভুক্ত তার ওপরেই বিনা অনুমতিতে চলেছে এমন সারি সারি নির্মাণ। আর এমন বেআইনি নির্মাণে, কোনও আইনসম্মত নির্মাণবিধি থেকে সুরক্ষাবিধি যে পালন করা হয় না, সেটা বলাই বাহুল্য।
সন্দেহ নেই ওয়্যা রহাউস বা পণ্যের গুদাম তৈরি হয় শহর শেষের অঞ্চল জুড়েই। কিন্তু সেই গুদাম কিংবা ওয়্যা রহাউস তৈরির ক্ষেত্রে যে যে আইনিবিধি থাকে তার কোনোটাই মানা হয় না বেআইনি নির্মাণে। এমন নির্মাণ কাঠামোর ভারবাহী ক্ষমতা থেকে শুরু করে তার ভেতরে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীকে নির্বাচিত বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন উচ্চতায় রাখার পরিকাঠামো বিধি রয়েছে। আছে গুদামে বাতাস চলাচলের কিংবা আলোকিত করার পরিকল্পিত উপায়। যদি গুদামে মোমোর মতো ফাস্টফুড কিংবা পানীয় সঞ্চয়ের পরিকল্পনা থাকে, যদি গুদামে রান্নার ব্যবস্থা রাখতে হয় সেক্ষেত্রে অগ্নি সুরক্ষার কড়াবিধি পালন জরুরি। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল যে আনন্দপুরের সেই ডেকোরেটরের গুদামে দলে দলে শ্রমিক রাতে থাকতেন, চলতো রান্নাবান্নার মতো কাজ, কোনও অগ্নি সুরক্ষার পরিকাঠামো ছাড়াই। আর অগ্নি সুরক্ষার পরিকাঠামো ব্যতিরেকে এমন এক একটা গুদাম থেকে কারখানা প্রতিটি হয়ে উঠতে পারে এক একটা জতুগৃহ। কার্যত পূর্ব কলকাতা ঘেঁষা আনন্দপুর-নাজিরাবাদ অঞ্চল জুড়ে সাড়ে তিনশোর বেশি প্লাস্টিক রিসাইক্লি-এর কারখানা এবং বিভিন্ন পণ্যের ছোট বড় গুদাম তৈরি হয়েছে জলাজমি বুঝিয়েই। আর সেই সবই বেআইনি নির্মাণ রাজ্যের দুর্মূল্যের সংরক্ষিত জমি জবরদখল করেই।
বাস্তবে ক্রীতদাস শ্রমিকদের যেভাবে রাখা হতো দাস ব্যবস্থায়, ঠিক সেভাবেই ওই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর বোঝা গেল যে প্রতিরাতেই সেই অবৈধ নির্মাণের অভ্যন্তরে দলে দলে মানুষকে তালাবদ্ধ করে রেখে দেওয়া হতো। রাজ্যে গত পনেরো বছর ধরে ‘মা-মাটি–মানুষের’ নির্বাচিত সরকার থাকার পরও শ্রমিকদের সুরক্ষা কিংবা নাগরিক সুরক্ষার এই ভয়াবহ অবস্থা প্রমাণ করে যে আনন্দপুরের ঘটনা নিছক এক দুর্ঘটনা নয় বরং সেটি আসলে এক প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ডের শামিল। আর এমন ক্ষমাহীন অপরাধের ক্ষেত্রে প্রস্তুত হচ্ছে প্রতিদিন শহরের পুলিশ প্রশাসনের অদক্ষতায় এবং ব্যর্থতায়। ফলে ওই অবৈধ, অরক্ষিত, ঝুঁকিবহুল নির্মাণ বেড়েই চলেছে শহরজুড়ে। অবৈধ নির্মাণ ঘটে চলেছে মাসের পর মাস পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায়। অথচ সেই পুলিশ প্রশাসন রয়েছে নির্বিকার নিষ্ক্রিয় হয়ে। পুলিশ প্রশাসনের এই নির্বিকার রূপ তুলে ধরে শহরের অবৈধ নির্মাণে লগ্নি করা অবৈধ টাকা এবং প্রশাসনের যোগসাজশকে। তার ওপরে যে মোমো কোম্পানির মালিক মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর শিল্প সফরে সঙ্গী হন রাজ্যের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে, সেই কারখানার মালিক যখন বেআইনি নির্মাণ কাঠামোকে তার ব্যবসার মূলধন করেন তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না কর্পোরেট শাসক দুর্নীতির জোটের নমুনা! শহর জুড়ে শাসক আশ্রিত সিন্ডিকেটরাজের বাস্তুতন্ত্রে এখন দ্রুত বেগে ঢুকছে জলা বুজিয়ে নির্মাণ করে দ্রুত বাড়তি লাভের লক্ষ্যে। আর সেই লাভের কড়ি শাসক দল থেকে প্রশাসনের অন্দরে বিধি মেনে ভাগ হতে হতে বিপদ বেড়েছে যেমন একদিকে, তেমনই শহরের পরিবেশের বিপদ বেড়েছে। আর সেই বিপদের এপিসেন্টারে রয়েছে শহরের প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষেরা।
Highlights
বেআইনি নির্মাণ কাঠামো ব্যবসার মূলধন হলে বোঝা যায় কর্পোরেট শাসক দুর্নীতির জোটের নমুনা! শহর জুড়ে সিন্ডিকেটরাজের বাস্তুতন্ত্রে জলা বুজিয়ে বেআইনি নির্মাণ এখন বাড়তি লাভের লক্ষ্য। সেই লাভের কড়ি শাসক দল থেকে প্রশাসনের অন্দরে ভাগ হতে হতে বিপদ আরও বাড়িয়েছে। সেই বিপদের এপিসেন্টারে রয়েছে শহরের প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষেরা।
Comments :0