Bangladesh Elections

হাসিনার সমর্থকরা ভোট দেবেন কাদের নজর সেদিকেই

আন্তর্জাতিক

মীর আফরোজ জামান: ঢাকা
আগামীকাল বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ভারত থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন থেকে শুরু করে পাকিস্তান সকলেই এই নির্বাচনের উপর গভীর নজর রাখছে। মার্কিন প্রশাসনের শর্ত মেনে ভোটের মুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করে বাংলাদেশর অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর থেকে এই প্রতিবেশী দেশে হিংসা বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশ কয়েকটি সংস্থা এই বিষয়ে নানা তথ্য প্রকাশ করেছে। তাছাড়া, এই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ মহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই নির্বাচনে বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে। তাছাড়া, রাজনৈতিক হিংসায় অসংখ্য ঘটনা ঘটছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবির উপর সন্দেহ প্রকাশ করছে। বহু বছরের মধ্যে প্রথমবারের বাংলাদেশ শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ ছাড়াই নির্বাচন হতে চলেছে। হাইকমান্ডের নির্দেশ অনুযায়ী আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে এই ‘বিশাল ভোটব্যাংক’ এখন নির্বাচনের সবচেয়ে বড় সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামি লিগের ঘরানার ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে গেলে তা অনেক প্রার্থীর ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
আওয়ামি লিগ  নির্বাচনের বাইরে থাকায় তাদের সমর্থক ও ‘নিরীহ’ কর্মীদের ভোট নিজেদের বাক্সে নিতে পর্দার আড়ালে লড়ছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামপর্যায়ে এই অঘোষিত প্রতিযোগিতা সবচেয়ে বেশি।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচন বর্জনের ডাক দিলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ‘মব কালচার’, হামলা-মামলা থেকে বাঁচতে এবং এলাকায় টিকে থাকতে অনেক কর্মী-সমর্থক পছন্দের কোনো প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। অনেক এলাকায় স্থানীয় আওয়ামি লিগ নেতারা গোপনে বিএনপি বা জামায়াত প্রার্থীর লোকজনের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। যদিও রাত পোহালেই শুরু হবে ভোট গ্রহণ।
ঢাকা-৫ আসনে আওয়ামি লিগের শীর্ষ নেতারা বর্তমানে ময়দানে নেই। তবে, কর্মীরা অনেকদিন ধরে গোপন মিছিল ও বিক্ষোভ চালিয়ে আসছেন। এই আসনে মূলত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা সক্রিয়। ভোট দেওয়ার বিষয়ে এই আসনের ওয়ার্ড পর্যায়ের এক নেতা জানান, গণ-অভ্যুত্থানের পর বেশিরভাগ শীর্ষ নেতা দেশ ছেড়েছেন। নিচের সারির নেতারা কোনোভাবে সক্রিয় থাকলেও তাদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তাঁরা কাকে ভোট দেবেন, নাকি ভোট কেন্দ্রেই যাবেন না সে বিষয়ে কোনো নির্দেশ মেলেনি। আবার ভোট কেন্দ্রে গেলে গ্রেপ্তারের ভয়ও আছে, গ্রেপ্তার হলে জামিন মিলবে না। সঙ্গে আছে ‘মব’ আতঙ্ক। এসব ভেবে তারা সেভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। মাঝেমাঝে ফেসবুকে ও টেলিগ্রাম গ্রুপে কিছু নির্দেশ আসে কিন্তু সেই নির্দেশের ওপরও আস্থা রাখতে পারছেন না নেতা কর্মীরা। তবে সুযোগ সন্ধানী অনেক নেতা-কর্মীরা বিএনপি জামাত ও এনসিপির মত দলের মধ্যে ঢুকে গেছে। এই কালচার আওয়ামি লিগের মধ্যেও ছিল। কেউ কেউ জানান, তাদের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি, জামায়াতসহ সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থীর মাঠপর্যায়ের নেতারা যোগাযোগ করছেন। তাদেরকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, ভোট দিয়ে জয়ী করতে পারলে মামলা-হামলা থেকে তাদেরকে সুরক্ষা দেওয়া হবে। নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হবে। অনেকে এমন আশ্বাসে ভোটকেন্দ্রে যাবেন বলে মত তাদের।
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও-১ আসনে এক পথসভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘আমাদের হাসিনা আপা ভারতে চলে গেছেন। তিনি সেখানে গেছেন, ভালো করেছেন। কিন্তু নিজের কর্মী-সমর্থকদের বিপদে ফেলে গেলেন কেন? আমরা সাধারণ সমর্থকদের জানাতে চাই আপনারা ভয় পাবেন না, আমরা আপনাদের পাশে আছি। যারা অন্যায় করেছে, কেবল তাদেরই শাস্তি হবে। কিন্তু যারা নির্দোষ, তাদের কোনো ক্ষতি হতে দেব না।’ তার এই বক্তব্যকে আওয়ামি লিগের সাধারণ সমর্থকদের আশ্বস্ত করার কৌশল হিসেবে দেখছেন অনেকে।
এর আগে নির্বাচনী প্রচারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের দিকে টানতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ভোট পাওয়ার জন্য তারা আওয়ামী লীগের কর্মীদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এর অন্যতম লক্ষণ হলো ভোটের বিনিময়ে অনেক নেতাকর্মীকে মামলা থেকে রেহাই বা প্রত্যাহারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। 
আওয়ামি লিগ কর্মী-সমর্থকদের ভোট টানা প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম গণশক্তিকে বলেন,‘‘কারো ভোটব্যাংক ভাঙা বা গড়া আমাদের কাজ নয়। দেশের সাধারণ ভোটারদের কাছে আমাদের আদর্শ ও উদ্দেশ্য তুলে ধরব এবং ভোট চাইব। ভোটার আগে কোন দল করতেন, সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমাদের প্রত্যাশা হলো ভোটাররা প্রতিটি দলের ইশতেহার ও আদর্শ দেখে তাদের সিদ্ধান্ত নেবেন। নির্বাচনের দিন নিজের পছন্দমতো ভোট দেওয়াই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, আমরা সেটাই বিশ্বাস করি।’’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘‘ব্যক্তিগতভাবে আমি এটাকে কোনোভাবে সমর্থন করি না। নির্বাচনী ময়দানে অনেক কৌশল থাকে, সেক্ষেত্রে হয়তো কোথাও কোথাও এমনটা হচ্ছে বা কোথাও হয়তো তাদের নেওয়া হচ্ছে। উভয় দলই এটি করছে। তবে, কিছু নিরীহ কর্মী আছে যারা একসময় আওয়ামি লিগে নাম লিখিয়েছিল, হয়তো তাদের দলে নেওয়া হচ্ছে।’’ 
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল সাড়ে চারটে পর্যন্ত ভোটগ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ভোটদানের সময় এক ঘন্টা বাড়ানো হয়েছে, কারণ ভোটাররা সংসদীয় আসনের জন্য গণভোট করবেন। এবারের বাংলাদেশের নির্বাচনে মোট ৫৯টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। প্রধান দলগুলির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নেতৃত্বাধীন রয়েছে ১০ দলের জোট। জাতীয় নাগরিক দল (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ জোট দল। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এবং জাতীয় পার্টি (কাদর) - এবং বামপন্থী দলগুলি - বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি -ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন রাজনৈতিক দলের এবং ২৪৯ জন নির্দল। মহিলাদের অংশগ্রহণ ৭৬ জন। ৬৩ জন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ১৩ জন নির্দল। 
মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। প্রায় ১২.৭৭ কোটি ভোটার রয়েছেন। প্রায় ৬.৪৮ কোটি পুরুষ এবং ৬.২৮ কোটি মহিলা। যদিও মহিলা ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হলেও প্রার্থী হিসেবে তাদের অংশগ্রহণ ৪ শতাংশেরও কম। ভোটারদের একটি বড় অংশ তরুণ, যার মধ্যে ৪৫.৭০ লক্ষ প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। মোট ৫ কোটি ৬০ লক্ষ ভোটারের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশিকে ব্যালটের মাধ্যমে বিদেশ থেকে ভোট দেওয়ার সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment