Neoliberal Magic

উদারনীতির ম্যাজিক!

সম্পাদকীয় বিভাগ

বুর্জোয়া অর্থনীতির নব্য উদারবাদী ধারার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো অর্থনীতিতে রাষ্ট্র বা সরকারের প্রত্যক্ষ কোনও ভূমিকা বা নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। কেবলমাত্র সহায়ক ও উৎসাহদাতার ভূমিকা পালন করবে। এমনকি সরকারের মালিকানাধীন বা পরিচালনাধীন কোনও শিল্প-বাণিজ্য সংস্থা অর্থাৎ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাও থাকবে না। সবটাই ছেড়ে দিতে হবে বেসরকারি বৃহৎ পুঁজির মালিক তথা কর্পোরেটের হাতে। অর্থনীতি পরিচালিত হবে বিনিয়ন্ত্রিত খোলা বাজারের নিয়মে। আসলে বৃহৎ পুঁজির নিয়ন্ত্রণে। সরকার বা রাষ্ট্রের কাজ হবে কর্পোরেট পুঁজি বা বেসরকারি মালিকদের চাহিদা মতো আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণ করা। অর্থাৎ বেসরকারি পুঁজি তাদের সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করতে চায় কার্যত বিনা সুদে পর্যাপ্ত ঋণ পেতে, বকেয়া ঋণ বাড়লে তা মকুব করতে, শ্রমখাতে বা শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার খাতে ব্যয় সর্বনিম্ন করতে, সরকারকে দেয় করের শূন্য বা শূন্যের কাছাকাছি করতে। ১৯৯১ সালে দেশে উদারনীতি চালু হলেও তার রূপায়ণের প্রশ্নে সর্বোচ্চ গতি পায় মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং অর্থনীতির বিকাশের জন্য যে ‘অ্যানিমেল স্পিরিটের’ কথা বলেছিলেন সেটা তাঁর জমানায় দৃশ্যগোচর না হলেও মোদী জমানায় খানিকটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই অ্যানিমেল স্পিরিট আসলে অর্থনীতির যাবতীয় কিছু বেসরকারি হাতে সমর্পণ করা।
মোদী ক্ষমতায় এসেই যে কাজটি সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে করার চেষ্টা করেছেন সেটা হলো এই ধারণা বদ্ধমূল করা যে সরকারি নিয়ন্ত্রণে অর্থনীতির বিকাশ হয় না। সরকারের বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ। তাই দায়িত্ব নিতে হবে বেসরকারি পুঁজিকেই। অর্থনীতির বিকাশ হবে বেসরকারি মালিকানা ও বেসরকারি বিনিয়োগের হাত ধরে। বেসরকারি কর্পোরেট যাতে অবাধে, নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারে এবং পর্যাপ্ত মুনাফা ঘরে তুলতে পারে তার ব্যবস্থা করে দিতে হবে এবং বলা যায় গ্যারান্টি দিতে হবে সরকারকে। যদি কোনও কারণে সমস্যা তৈরি হয়, প্রত্যাশিত মুনাফা না মেলে তবে নানা ঘুর পথে সেটা পুষিয়ে দিতে হবে সরকারকেই। মোদী সরকার গুছিয়ে সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
একের পর এক নীতি বদল করে দেশি-বিদেশি পুঁজিকে বে‍‌শিরভাগ ক্ষেত্রে অবাধ বিনিয়োগের অধিকার দেওয়া হচ্ছে। জলের দরে জমির বন্দোবস্ত হচ্ছে। বিদ্যুতে ছাড়, করে ছাড়, কম সুদে ঋণ মিলছে। কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ঋণ ও বকেয়া হলে মকুব হয়ে যাচ্ছে। শ্রম আইন বদল করে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ মালিকের মরজির উপর অর্পণ করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি কর্পোরেট পুঁজিকে মোদী সরকারের অদেয় কিছু নেই। কর্পোরেট করের হার ৩০ শতাংশ থেকে কমতে কমতে ২৫ শতাংশ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সেটা ১৫ শতাংশ। এইভাবে করের হার কমে যাবার ফলে মোদী জমানায় বছরে গড়ে এক লক্ষ কোটি টাকা করে কর আদায় কমেছে। তেমনি নিয়মিত অনাদায়ী বকেয়া কর মকুব হয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার। সহজে মোটা ঋণ মেলার পরও সেটা শোধ দেয় না কর্পোরেটগুলি। পরে সরকার সেগুলি মকুব করে দেয়। এইভাবে মোদী জমানায় বৃহৎ কর্পোরেটের ১০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি ঋণ মকুব হয়েছে। বেসরকারি কর্পোরেট পুঁজি যা যা চাইছে মোদী সরকার সবই পূরণ করছে। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ কিছু হচ্ছে না। নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। শ্রমিকদের আয় বাড়ছে না। সর্বোপরি অর্থনীতির সম্প্রসারণও হচ্ছে না। তবে কর্পোরেটের তথা মালিকদের আয় ও সম্পদ কিন্তু হু হু করে বেড়ে চলেছে।

Comments :0

Login to leave a comment