মীর আফরোজ জামান: ঢাকা
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে দরিদ্র্য দূর করার একটি দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন ড. ইউনুস। বাস্তবতা হচ্ছে- সে সুযোগটি তিনি কাজে লাগাতে পারেননি। অথচ শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মহম্মদ ইউনূসের একটি বিখ্যাত দর্শন হচ্ছে ‘দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো’। তার আমলে বাংলাদেশে নতুন করে ৩০ লক্ষ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সৃষ্ট গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। ঠিকভাবে দায়িত্ব সামাল দিতে নিজের পছন্দমতো উপদেষ্টা পরিষদ ও বিশেষ সহকারী নিয়োগ করেন। উপরন্তু বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক ও ছাত্র শক্তিগুলোর ব্যাপক সমর্থন ছিল তাঁর প্রতি। যে কারণে ঘুনে ধরা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে দারিদ্র্য নির্মূল, দুর্নীতি প্রতিরোধ, ব্যবসাবাণিজ্যসহ আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আনার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরির ব্যাপক সুযোগ ছিল ড. ইউনূসের। তিনি সেই সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাজ্তন ভিসি প্রফেসর আবদুল বায়েস বলেন, তিনি একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল বিপর্যস্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। অথচ তাঁর সময়ে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ বৃদ্ধি ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই ছিল নিম্নমুখী। ব্যবসাবাণিজ্যে ছিল আস্থার সংকট। শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদন ছিল নিম্নমুখী। না ছিল কোনো নতুন উদ্যোগ, না এসেছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। উল্টো দেশে বেকারত্ব ও গরিব মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্রায় ৩০ লক্ষ নতুন দরিদ্র্য হয়েছে ড. ইউনূসের আমলে।
ব্যক্তি খাতের গড় বিনিয়োগ চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন : ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের গড় বিনিয়োগ হার ছিল জিডিপির ২৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে তা কমে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে আসে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়ন ছিল গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সরকারি বিনিয়োগ হিসেবে প্রচলিত এডিপি বাস্তবায়নের হার জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ছিল সাড়ে ১১ শতাংশ। গত ১০ বছরে এর চেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়নি।
খেলাপি ঋণের হার বিশ্বে সর্বোচ্চ : ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের স্থিতি ৬ লক্ষ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আগের বছরের ডিসেম্বর শেষেও বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক ২ শতাংশ খেলাপি ছিল। এর মধ্যেই ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে তা নজিরবিহীন। গবেষণা সংস্থার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন বিশ্বে সর্বোচ্চ।
নব নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে ২৩ লক্ষ কোটি টাকা ঋণের বোঝা রেখে বিদায় নিলেন ড. ইউনূস। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ লক্ষ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে ব্যাংকিং উৎস থেকে ৬১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা নিয়েছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। এ ছাড়া আলোচ্য সময়ে আরও প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে।
ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশের নিচে। দেখা যাচ্ছে, ভোক্তার মজুরি বাড়ার হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার এখনও বেশি। এ কারণে মানুষের আয়ের চেয়ে খরচ হচ্ছে বেশি। কমেছে ক্রয়ক্ষমতা। অথচ মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার নীতিনির্ধারণী সুদের হার বাড়িয়ে রেখেছে। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে গেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। বেড়েছে ব্যবসাবাণিজ্যে পরিচালন ব্যয়।
ইউনূসের আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর সরকারের উপদেষ্টার ব্যক্তিগত আধিকারিককে সাসপেন্ড করাও হয়েছে।
সচেতন মহলের অভিমত, ড. ইউনূস বিদায়ী ভাষণে কতগুলো অধ্যাদেশ জারি করেছেন আর কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তা প্রচার করলেও এসব সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে কোনো জবাব দেননি। ১৮ মাস অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের দায়িত্বে থাকলেও তিনি দেশের গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কোনো সংবাদ সম্মেলন করেননি।
Bangladesh
ব্যর্থ ইউনূস, গরিবের সংখ্যা বেড়েছে ৩০ লক্ষ
×
Comments :0