সাত্যকি রায়
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি একটি গভীর রূপান্তরের সম্মুখীন। বর্তমানে আমরা যে পর্যায়ে আছি সেটাকে আপাতদৃষ্টিতে পরিবর্তনের ১৪ বছর হিসাবে আখ্যায়িত করলেও আসলে এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যায়। এই অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের ক্লান্তি, শেষের দিকে বামপন্থী বিকল্পের অস্বচ্ছতা এবং কিছু ক্ষেত্রে হলেও আঞ্চলিক স্তরে ক্ষমতার আস্ফালন যা মানুষের মনে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করে তুলেছিল। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক রসায়ন গড়ে উঠেছিল নানা বাম ও ডান শক্তির এবং বামফ্রন্ট পরাস্ত হলো। তখন বামের ভোট ডানে গেল বলে কাউকে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুনিনি। সবাই মনে করেছিলেন এতে অস্বাভাবিক কি আছে? সরকার পক্ষের ভোট অন্য পক্ষে গেলেই তো সরকার বদলায়। কেউ কেউ মমতা ব্যানার্জিকে গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষের যথার্থ প্রতিনিধি মনে করেছিলেন যিনি ‘ভদ্রলোক’ও শাসক বামেদের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। টালির বাড়ি, হাওয়াই চটি ইত্যাদি যুক্ত হলো! তাই তাদের হয়ত মনে হয়েছিল বামের ভোট যেন বামেই আছে!
তারপরেই শুরু হলো বামপন্থীদের উপর আক্রমণ। খুন, বাড়ি ছাড়া করা, পেশার ক্ষেত্রে আক্রমণ, নানা ধরনের মামলায় জর্জরিত করে তোলা ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলিকে বড় পরিবর্তনের ‘পার্শ্বীয় বা আনুষঙ্গিক ক্ষতি’ (Collateral Damage) হিসাবেই স্বাভাবিকীকরণ করা হলো। ঠিক কিভাবে এর মোকাবিলা করা হবে সরকারি সমর্থনের স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়ে ওঠা বাম প্রজন্মের বুঝতে বেশ কিছুটা সময় গেল। বাংলা ততদিনে ‘দিদিময়’হয়ে উঠছে। নির্বাচনে বামপন্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না দেওয়াটাও পরিবর্তনের গতি জাড্যর স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে দেখা হলো। এই পর্যায়ে ছিল মূলত বামপন্থার বিনির্মাণ ও জনবাদের উত্থান। শ্রমজীবীদের সংগঠিত হওয়ার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করা, অধিকারের বদলে অনুদানের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম নীতিকে নেতা বা নেত্রীর জনপ্রিয়তার অধীন করে তোলা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে ব্যক্তি নেতৃত্বের মধ্যে সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা— এই সব কিছুই দক্ষিণপন্থী জনবাদের সুস্পষ্ট লক্ষণ যা একপ্রকার এলিট বিরোধী স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেখা হলো। যে বাঙালি রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-মানিক-শক্তি-সুনীল-সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিকদের প্রবাহমান ঐতিহ্যের অখণ্ড অংশ বলে মনে করেন, সেই বাংলার রাজনীতিকে ‘খেলা হবে খেলা হবে’-এর স্তরে নামিয়ে আনাটা অনায়াসে গ্রহণ করতে শিখল। দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে ভুল নাম বলা, অসংযত ও অসংলগ্ন মন্তব্য করা সব কিছুই সিলমোহর পেতে থাকে বুদ্ধিবৃত্তিকতা (Intellectualism) এবং ভদ্রলোক বিরোধী সাধারণ মানুষের সহজিয়া বহিঃপ্রকাশ হিসাবে।
বামপন্থা মানে শোষিত নিপীড়িত মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ চেতনার নির্মাণ, শ্রমজীবীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। স্বাধীনতা পূর্ব এবং পরবর্তীকালে মূলত ষাটের দশক থেকে বিভিন্ন ঘরানার বামপন্থী আন্দোলন বাংলার মানুষের মধ্যে এই চেতনার বীজ বপন করেছিল এবং তাকে বিকশিত করেছিল। এ কথা ঠিক যে বামপন্থী সরকার দীর্ঘদিন থাকার কারণে কিছু বামপন্থী মানুষও এটা ভাবতে শুরু করেছিলেন যে, আর এসব শ্রেণি সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ, সমাজ বিপ্লব কেন? এসব তত্ত্ব কথা থাক এখন খালি বামফ্রন্টের পর বামফ্রন্ট তারপরে আবার বামফ্রন্ট— এই অনন্ত যাত্রার সাথি হতে পারাটাই একমাত্র লক্ষ্য। অচিরেই তাঁদের সেই ভুল ভাঙল। তৃণমূল জিতে এসে যেটা সযত্নে করতে পারল তা হলো, বামপন্থীদের দুর্বল করা। শুধুমাত্র বামপন্থীদের আসন কমেছে তা নয়, রাজনৈতিক বিচার বিবেচনার মাপকাঠিকেই ওলোটপালোট করে দিতে পেরেছে। রাজনৈতিক পরিসর থেকে আদর্শের উত্তাপ বা কোন দূরের স্বপ্নকে নির্বাসন দেওয়া বাঙালিকে শেখাতে পেরেছে তৃণমুল। গর্বের সঙ্গে চিন্তাভাবনায় অগভীর হয়ে ওঠা, বিনা পরিশ্রমে অন্যায় রাস্তায় রোজগারের স্বাভাবিকীকরণ, সরকারি বদন্যতায় পুজো এবং ইমামভাতা এই সব কিছুকে অনুমোদন দিতে শিখেছি আমরা। শেষ পরিণতি সরকারি পয়সায় মন্দির নির্মাণ এবং তার সামাজিক স্বীকৃতি।
হিটলার ও মুসলিনীর নৃশংস ফ্যাসিবাদী জমানার পর পৃথিবীতে কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষেই আর ফ্যাসিবাদের কথা বলে মানুষের সমর্থন আদায় করা সম্ভব ছিল না। একারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীতে এক ধরনের রাজনীতির উত্থান হলো, যাকে পপুলিজম বা জনবাদ বলা হয়। এই রাজনৈতিক প্রবণতার প্রধান লক্ষণ হলো, এটি কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শের কাঠামো নির্ভর নয়। বামপন্থী, রক্ষণশীল বা উদারবাদী— কোনও ছাঁচেই একে ফেলা যাবে না। তারা আপাতদৃষ্টিতে বৃহত্তর জনতার প্রতিনিধিত্ব করলেও এবং কিছু ক্ষেত্রে মানুষের কিছু সুরাহা করলেও, এই রাজনীতি জনতাকে তার শ্রেণি অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন করার তীব্র বিরোধী। এ কারণেই কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শ না থাকলেও একটি লক্ষণ তাদের সর্বদাই সুস্পষ্ট– তারা ঘোষিত কমিউনিস্ট বিরোধী। তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গেয় বামপন্থী চেতনাকে প্রতিস্থাপিত করল জনবাদী রাজনীতির মধ্যে দিয়ে।
এবার এল পরিবর্তনের দ্বিতীয় পর্যায়। যে কোনও সরকার ক্ষমতায় থাকলে ধীরে ধীরে যেমন সুবিধাভোগী অংশের জন্ম হয়, সেরকম বঞ্চিতদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমাগত দলীয় কার্যালয়ে পরিণত হতে শুরু করল। নির্বাচন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিরোধীদের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা প্রবল হলো। এর ফলে ক্ষোভ বিক্ষোভ বাড়তে থাকে। এর মধ্যে কেন্দ্রে বিজেপি’র সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য একটি ‘গৃহপালিত বিরোধী নির্মাণ’-এর প্রকল্প চালু হলো। রাজ্যে আরএসএস’র শাখার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনজগতে দ্রুত পরিবর্তনও লক্ষ্য করা গেল। বন্ধুবান্ধব আত্মীয় পরিজনের আলোচনা এবং হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে হঠাৎ করে ধর্মীয় পরিচয রাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে শুরু করল, যা বিগত কয়েক দশকে এ রাজ্যের মানুষের অভিজ্ঞতায় ছিল না। সরকার পক্ষের প্রকট প্রতীকী সংখ্যালঘু তোষণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় পরিচিতির মানুষকে তাদের ধর্ম পরিচয় সম্পর্কে সজাগ করে তুলল। বাংলার গ্রামে গঞ্জে শহরে মফস্বলে গজিয়ে উঠতে দেখা গেল অসংখ্য মন্দির, পাশাপাশি সংখ্যালঘু মানুষ তাদের নিরাপত্তা সম্পর্কে চিন্তিত ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য জাহির করতে শুরু করল। রাজনীতির ভাষ্য ধীরে ধীরে বদলে গেল। বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ এবং সে সম্পর্কিত ধর্মীয় মেরুকরণ রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করল। কিছু বাম সমর্থক একদিকে যেমন তৃণমূলের শাসনে আক্রান্ত হয়ে রামের মধ্যে নিরাপত্তা খুঁজতে চাইলেন। অন্যদিকে আরেক দল বাম সমর্থক তৃণমূলকে বামেদের চেয়েও কার্যকরী ধর্মনিরেপেক্ষ শক্তি বলে মনে করলেন।
এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে মানুষের নানা রকম সত্তা ও পরিচয় থাকে। আয়, সম্পত্তি, জাত, ধর্ম, লিঙ্গ, যৌনপছন্দ এই সব কিছুর নিরিখে আমরা আসলে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা মানুষ। আমরা ভোটের অধিকারে সমান হলেও সমাজের বহুমাত্রিক ক্ষমতার কাঠামোয় ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় অবস্থান করি। কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাথমিক স্বীকৃতিটি হলো আমরা প্রত্যেকে সমান সহনাগরিক। গোটা দেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রের এই প্রাথমিক স্বীকৃতি গভীরভাবে আক্রান্ত। সমান সহনাগরিকের বোধ নিশ্চয়ই সব মানুষকে সমান করে দেয় না, কিন্তু যে দেশে গণতন্ত্র আছে সে দেশে এই বোধ অন্যান্য কাঠামোগত বৈষম্যকেও চিনতে সাহায্য করে। মানুষ সমতার এই প্রাথমিক মনোভাব থেকে অনুভব করতে শুরু করে যে সমতার স্বীকৃতিই যথেষ্ট নয়, তাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে কার্যকরী করা জরুরি। কিন্তু যদি মানুষ এটা মেনেই নেয় যে সম্পত্তির অধিকার শুধুমাত্র কিছু মানুষের হওয়াটাই স্বাভাবিক অথবা পুরুষদের নারীদের তুলনায় একই কাজে বেশি মজুরি পাওয়াটাই স্বাভাবিক, ভোটের অধিকার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা শুধুমাত্র একটি বিশেষ ধর্মের বা জাতের মানুষের হওয়াটাই স্বাভাবিক, তাহলে প্রকারান্তরে আমরা মেনে নিচ্ছি যে ঊর্ধ্বতন ক্ষমতাবান জনগোষ্ঠীর দ্বারা নিম্নতর প্রজাতি শাসিত হবে এতে অন্যায়ের কিছু নেই। এটাই ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিত রচনা করে এবং সত্যি সত্যিই ওই আদলে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বামপন্থী চেতনা শূন্য থেকে মহাশূন্যে তলিয়ে যেতে পারে। এই রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বিতর্কের মাপকাঠি ২০১১ সালে বামপন্থীরা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরপরই এই বাংলায় স্বাভাবিক করে তোলা কঠিন ছিল। চোদ্দো বছরের দক্ষিণপন্থী জনবাদী রাজনীতি এই মেরুকরণকে জনচেতনায় গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। শুধু বামপন্থী বোধ নয় খেয়াল করে দেখুন খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, প্রশাসনের চরম অব্যবস্থা, শিক্ষার বেহাল অবস্থা এসব কিছু মানুষের অনুভূতিতে কর্পুরের মতো উবে যাচ্ছে। এসব কিছুই এক অদ্ভুত নির্বিকারত্বের কৃষ্ণগহবরে তলিয়ে যাচ্ছে। আমরা কোথায় জিতছি কোথায় হারছি হয়ত নিজেরাও জানি না।
মাঠ এখন তৈরি হয়েছে আসল রূপান্তরের, বাম নিকেশের শেষ পর্যায়। খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ ঘাড়ের উপরে নিঃশ্বাস ফেলছে আর বাঙালি ঐতিহ্যর ষোলো আনা জলাঞ্জলি দিয়ে সরকারি পয়সায় মন্দির তৈরি করে জয় বাংলার আর্তনাদ করছে তৃণমূল। এই ছদ্ম লড়াইকে গ্রহণযোগ্য করতে ভোটদাতার কাছে এক অদ্ভুত উপযোগিতার তত্ত্ব হাজির করা হচ্ছে। ভোটটা নষ্ট করবেন না। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে নষ্ট করার আর কি বাকি আছে? যদি সত্যিই এই বাংলায় মানুষের দুটিই পছন্দ অবশিষ্ট থাকে, এক যারা এদেশের গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর খোলনলচে বদলানোর জন্য ওৎ পেতে বসে রয়েছে, কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে বেচে দিচ্ছে দেশের জল, জঙ্গল, খনি, বিমা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিষেবা, আর তার বিনিময় ভোটার কেনার টাকা জোগাড় করছে, তারা আসলে বিরোধী শূন্য একদলীয় গণতন্ত্রের দিকে গোটা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। আর অন্য পছন্দটি হলো যারা সরকারি পয়সায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা কখনও দাঙ্গা স্পনসর করে নিজেদের আপাদমস্তক দুর্নীতি ঢাকার শেষ চেষ্টা করা। এই দুইয়ের একজনকে ভোট দিয়ে ভোটের কার্যকারিতা ফলাতে হবে আমাদের? বেশিরভাগ মানুষই আজ প্রকৃত অর্থেই অসহায় কিন্ত নিজের শক্তি প্রকাশ করার আত্মপ্রসাদ পেতে চাইছেন এই দুয়ের মধ্যে কাউকে জিতিয়ে দিয়ে। আমরা সবাই যেন নিজেদের অক্ষমতা ঢাকার সহজ রাস্তা খুঁজছি। রামমোহন বিদ্যাসাগরের রাজ্যে আমরা আজও অভয়া বা তামান্নার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার আদায় করতে পারিনি। আমরা ‘কার্যকরী’মতদানের নামে পশ্চিমবঙ্গকে হয়ত সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কাছাকাছি নিয়ে যেতে চলেছি। একটি দল হয়ত অচিরেই আরেকটিতে বিলীন হয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যে দ্বিজাতি রাজনীতির সুর বাজতে শুরু করেছে। হিন্দুদের একটা দল মুসলমানদের আরেকটা দল।আগামী প্রজন্মের জন্য অনন্ত অন্ধকারের পছন্দ তৈরি করে যাব আমরা।
বামপন্থীরা ভোটে জিতবে কি জিতবে না, তা জানি না কিন্ত বামপন্থীরা গোটা দেশে দুর্বল হওয়ার সাথে সাথে নিঃশব্দে রোলার চলছে খেটে খাওয়া মানুষের উপর। নতুন শ্রমকোড, বীমায় বিদেশী পুঁজির একশোভাগ অনুপ্রবেশ, আসলে মনরেগার নাম পরিবর্তন উদ্দেশ্য নয়, কাজের অধিকারকে খোলাখুলি অস্বীকার— এসব চলছে জোর গতিতে। এটাই নয়া ফ্যাসিবাদী প্রকল্প। অনেকেই বলেন, তিরিশের দশকে ইউরোপে ফ্যাসিবাদ এসেছিল পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে বামপন্থী উত্থানকে খতম করতে। এখন তো বামপন্থীরা পৃথিবী জুড়ে দুর্বল— দেশেও তাই, রাজ্যেও তাই। সত্যিই কি বামপন্থা আজকে শাসকশ্রেণির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ? মনে রাখা দরকার, তিরিশের দশকের পুঁজিবাদ আজ বৃদ্ধ হয়েছে। লেট ক্যাপিটালিজমে সংকটের চেহারা ভয়াবহ শুধু নয় পুঁজিবাদের সংকটকে সাময়িকভাবে মোকাবিলা করার পুরনো অস্ত্রগুলো আজ আর নেই। ইতালি ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী প্রকল্প কার্যকরী হওয়ার সময়ও রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগ ছিল অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার জন্য। পরিকাঠামো, অস্ত্র কারখানায় সরকারি বিনিয়োগের মধ্যে দিয়ে একদিকে যেমন মুনাফার হারকে চাঙ্গা করা সম্ভব হয়েছিল, অন্যদিকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছিল। আজকের নয়া উদারবাদের যুগে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণ অসম্ভব। এক দীর্ঘস্থায়ী মন্দার গভীরে নিমজ্জিত হয়ে চলেছে পুঁজিবাদ। আর্থিক বৈষম্য আকাশছোঁয়া। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমবর্ধমান কর্মহীনতা পুঁজিবাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে ক্রমাগত অস্থির করে তুলবে। অতএব বারুদ জমছে এবং জমবে। দুনিয়ার শাসক শ্রেণী এটা খুব ভালোভাবে বোঝে যে এই বাস্তবতার বারুদকে দাবানলে পরিণত করতে পারে একমাত্র বামপন্থীরাই। তাই লেট ক্যাপিটালিজমে ফ্যাসিবাদ বামপন্থী উত্থানকে খতম করার জন্য কোনও একটি নির্দিষ্ট সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে হাজির হয় না, তা আজকে একটি চলমান প্রক্রিয়া। ক্রমবর্ধমান সঙ্কটের বাস্তবতায় বামপন্থী চেতনা ক্রমাগত বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। তাই শূন্য হোক, মহাশূন্য হোক একটা ছোট স্ফুলিঙ্গও বিপজ্জনক। অন্যদিকে একে বাঁচিয়ে রাখা এবং বিকশিত করার লড়াইটাই আজ খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য জরুরি, ওটাই মেহনতি মানুষের ভাষা প্রকাশের শেষ অবশিষ্ট পছন্দ। এদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ১০৫ বছরের ইতিহাসে বামপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে খুব অল্প সময়ের জন্যই। বাংলা, কেরালা ও ত্রিপুরায় তারা বেশ কিছুটা সময় ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু জিতুক বা হারুক আসল কথা হলো, তারা গরিব খেটে খাওয়া মানুষের পাশে ছিল। এরকম বহু কমিউনিস্ট নেতা এই বাংলায় ছিলেন এবং আজও আছেন যারা মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনে এমপি এমএলএ মন্ত্রী হয়েছেন। আবার অনেকে কোনোদিন জেতেননি এমনকি কোনদিন নির্বাচনে প্রার্থীও হননি। কিন্তু স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় এরকম অনেক নাম আজও কিংবদন্তির মতো মানুষের মনে গেঁথে রয়েছে যাদের মানুষ মনে রেখেছেন তাঁদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের একমাত্র ভরসা হিসাবে। এই লড়াইকে বাঁচাতেই হবে। আর সে জন্য ক্লীবতার ঘেরাটোপে আটকে থাকা পছন্দের বাইরে গিয়ে সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে তাদের দিকে যারা আম্বানি, আদানিদের টাকায় বেঁচে নেই, যারা ধর্মকে হিংসার অস্ত্র বানায় না অথবা ধর্মনিরপেক্ষতাকে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতিগুলোকে ঢাকার ঢালে পরিণত করে না— শক্তিশালী করতে হবে তাদের যারা আজও স্বপ্ন দেখে মেহনতির অধিকারের রাহুমুক্তির। বামপন্থাই খেটে খাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের একমাত্র নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।
Left Alternative
বামপন্থাই প্রকৃত বিকল্প
×
Comments :0