বিজয় প্রসাদ
ভেনেজুয়েলা সঙ্গে বা তার সাবেক অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে মৌলিক কোনও সমস্যা ছিল না আমেরিকার। মার্কিন সরকার ও তাদের কর্পোরেট শ্রেণির প্রকৃত সমস্যা ছিল হুগো সাভেজের প্রথম সরকারের সূচনা করা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে।
২০০১ সালে সাভেজের বলিভারীয় প্রক্রিয়া “অর্গানিক হাইড্রোকার্বন আইন” পাশ করে। এই আইনে তেল ও গ্যাসের সব মজুতের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা নিশ্চিত করা হয়। তেল ক্ষেত্রের অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মতো প্রক্রিয়া রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির হাতে রাখা হয়, তবে পরিশোধন ও বিক্রির প্রক্রিয়া বেসরকারি—এমনকি বিদেশি—কোম্পানির অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়। বিশ্বের সর্ববৃহৎ পেট্রোলিয়াম ভাণ্ডার মজুত থাকা সত্ত্বেও, ভেনেজুয়েলা ইতোমধ্যে ১৯৪৩ ও ১৯৭৫ সালে তেল জাতীয়করণ করেছিল। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে আইএমএফ ও বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলির চাপিয়ে দেওয়া নয়া উদারনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে তেল শিল্প আবার ব্যাপকভাবে বেসরকারিকরণ করা হয়।
সাভেজ যখন নতুন আইনটি কার্যকর করেন, তখন রাষ্ট্র আবার তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নেয়। দেশের বৈদেশিক আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদেশে তেল বিক্রির উপর ছিল। মার্কিন মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলি, বিশেষ করে এক্সঅনমোবিল ও শেভরন- এতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় এবং তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সরকারের ওপর সাভেজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করে।
২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সাভেজকে উৎখাত করার জন্য একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করে, যা কয়েক দিনের মধ্যেই ব্যর্থ হয়। এরপর তারা দুর্নীতিগ্রস্ত ভেনেজুয়েলার তেল কোম্পানি ব্যবস্থাপনাকে দিয়ে একটি ধর্মঘট শুরু করায়, যার উদ্দেশ্য ছিল অর্থনীতিকে ধ্বংস করা। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকরাই কোম্পানিকে রক্ষা করে এবং ব্যবস্থাপনার হাত থেকে তা ফিরিয়ে নেয়। সাভেজ এই অভ্যুত্থান ও ধর্মঘট—দুটিই টিকে যান, কারণ তাঁর পেছনে জনগণের বিপুল সমর্থন ছিল।
মারিয়া কোরিনা মাচাদো, যিনি ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন, “সুমাতে” (অর্থাৎ “যোগ দাও”) নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যা একটি প্রত্যাহার গণভোট আয়োজন করে। ২০০৪ সালে নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট দিতে আসেন এবং তাদের বড় অংশ (৫৯ শতাংশ) সাভেজকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে বহাল রাখার পক্ষে ভোট দেন।
তবু মাচাদো বা তাঁর মার্কিন পৃষ্ঠপোষকরা—যাদের মধ্যে তেল কোম্পানিগুলিও ছিল, তারা থেমে থাকেনি। ২০০১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত তারা বলিভারীয় প্রক্রিয়াকে উৎখাত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, মূলত মার্কিন মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলিকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্য। ফলে ভেনেজুয়েলার প্রশ্নটি “গণতন্ত্র” নিয়ে নয় (এই শব্দটি এত বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে যে, এর অর্থ ক্ষয়ে যাচ্ছে); বরং এটি হলো আন্তর্জাতিক শ্রেণি সংগ্রামের প্রশ্ন— ভেনেজুয়েলার জনগণের তাদের তেল ও গ্যাসের ওপর নিয়ন্ত্রণের অধিকার বনাম মার্কিন তেল কোম্পানিগুলির আধিপত্যের দাবি।
বলিভারীয় প্রক্রিয়া
১৯৯০-এর দশকে হুগো সাভেজ যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে এলেন, তখন তিনি ভেনেজুয়েলার জনগণের, বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষকদের ভাবনাকে নাড়া দেন। এই দশকটি চিহ্নিত ছিল এমন সব রাষ্ট্রপতির বিশ্বাসঘাতকতায়, যারা তেলসমৃদ্ধ দেশটিকে আইএমএফ’র চাপিয়ে দেওয়া কৃচ্ছ্রসাধন থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে ঠিক সেই নীতিগুলিই বাস্তবায়ন করেন। তারা সামাজিক গণতন্ত্রী হোক (যেমন কার্লোস আন্দ্রেস পেরেজ, ১৯৮৯–১৯৯৩) বা রক্ষণশীল হোক (যেমন রাফায়েল ক্যালডেরা, ১৯৯৪–১৯৯৯)—সব ক্ষেত্রেই ভণ্ডামি ও বিশ্বাসঘাতকতাই রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছিল। একই সঙ্গে ভয়াবহ বৈষম্য ছিল। সাভেজের নির্বাচনী বিজয় (৫৬ শতাংশ ভোট, পুরানো দলগুলির প্রার্থীর ৩৯ শতাংশের বিপরীতে) ছিল এই ভণ্ডামি ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে একটি গণরায়।
১৯৯৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তেলের দাম তুলনামূলক ভাবে বেশি থাকায় সাভেজ ও বলিভারীয় প্রক্রিয়া সুবিধা পায়। তেল আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে সাভেজ তা সামাজিক উন্নয়নে ব্যবহার করেন। তিনি একাধিক গণভিত্তিক সামাজিক কর্মসূচি চালু করেন—যার মধ্যে ছিল প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা, শ্রমজীবী ও কৃষকদের জন্য সাক্ষরতা ও মাধ্যমিক শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং আবাসন।
রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা হয় সামাজিক ন্যায়ের বাহন হিসেবে, বাজারের সুবিধা থেকে শ্রমজীবী ও কৃষকদের বঞ্চিত করার যন্ত্র হিসাবে নয়। এই সংস্কারগুলির পাশাপাশি সরকার জনপ্রিয় ক্ষমতা গড়ে তুলতে অংশগ্রহণমূলক কাঠামো—যেমন কমিউন গড়ে তোলে। কমিউনগুলি স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, সরকারি তহবিল নিয়ন্ত্রণ, সমবায় ব্যাঙ্ক ও সামাজিক উৎপাদন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। এটি ছিল বলিভারীয় প্রক্রিয়ার অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ, ধনী ও ক্ষমতাবানদের শাসনের বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত হাইব্রিড যুদ্ধ
২০১৩–১৪ সালে দুটি ঘটনা বলিভারীয় প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে হুমকির মুখে ফেলে। প্রথমত, হুগো সাভেজের অকাল মৃত্যু (মাত্র ৫৮ বছর বয়স); দ্বিতীয়ত, তেল-আয়ের ধস। সাভেজের উত্তরসূরি নিকোলাস মাদুরো তেলের দাম পতনের মুখে পড়েন ২০১৪ সালের জুনে, যেখানে দাম ছিল ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০৮ ডলার, তা ২০১৫ সালে ৫০ ডলারের নিচে এবং ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ৩০ ডলারের নিচে নেমে আসে। তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল ভেনেজুয়েলার জন্য এটি ছিল বিপর্যয়কর।
সাভেজের মৃত্যুর আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে একটি হাইব্রিড যুদ্ধের কাঠামো তৈরি করেছিল। হাইব্রিড যুদ্ধ বলতে বোঝায়—অর্থনৈতিক চাপ, আর্থিক শ্বাসরোধ, তথ্যযুদ্ধ, আইনি কারসাজি, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও বাছাই করা হিংসার সমন্বিত ব্যবহার, যার উদ্দেশ্য সার্বভৌম রাজনৈতিক প্রকল্পকে উলটে দেওয়া।
হাইব্রিড যুদ্ধ দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি দিককে অস্ত্রে পরিণত করে পরিচালিত হয়। মুদ্রার ওপর আক্রমণ, নিষেধাজ্ঞা, পণ্যের ঘাটতি সৃষ্টি, গণমাধ্যমের বয়ান, এনজিওদের চাপ, বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে হয়রানি এবং কৃত্রিমভাবে বৈধতা সংকট তৈরি—এই সবকিছুর লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের সক্ষমতা ধ্বংস করা, জনগণের সমর্থন ক্লান্ত করে দেওয়া এবং সমাজের ভেতরের ঐক্য ভেঙে ফেলা। এর ফলে যে দুর্ভোগ তৈরি হয়, সেটাকেই পরে ‘অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে বাইরের জবরদস্তিমূলক কাঠামোটি আড়াল থাকে।
২০১৭ সালের আগস্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন বেআইনিভাবে ভেনেজুয়েলার ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং ২০১৮ সালে তা আরও কঠোর করে, তখন থেকেই ভেনেজুয়েলা ঠিক এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলার সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক চ্যানেল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং দেশটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মকানুন অতিরিক্তভাবে মেনে চলতে বাধ্য করা হয়। একই সময়ে পশ্চিমী গণমাধ্যমগুলি পদ্ধতিগতভাবে নিষেধাজ্ঞার প্রভাবকে ছোট করে দেখায়, আর মূদ্রাস্ফীতি, পণ্যের ঘাটতি ও অভিবাসন সংকটকে কেবল অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে। এর ফলে সরকার পরিবর্তনের বয়ান আরও জোরদার হয়। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় জীবনযাত্রার মানের যে ভয়াবহ পতন ঘটে, তা এই স্তরভিত্তিক অর্থনৈতিক শ্বাসরোধের কৌশল থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।
ভাড়াটে বাহিনীর হামলা, বিদ্যুৎ গ্রিডে নাশকতা, এক্সঅনমোবিলের স্বার্থে গায়ানা ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি, একটি বিকল্প “প্রেসিডেন্ট” (হুয়ান গুয়াইদো) তৈরি করা, নিজের দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাওয়ার আহ্বান জানানো একজন ব্যক্তিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া (মাচাদো), রাষ্ট্রপতিকে হত্যার চেষ্টা, ভেনেজুয়েলার উপকূলে মাছ ধরার নৌকায় বোমা হামলা, ভেনেজুয়েলা থেকে তেলবাহী জাহাজ জব্দ করা এবং দেশের উপকূলে নৌবহর জড়ো করা—এই প্রতিটি পদক্ষেপের উদ্দেশ্য একটাই: ভেনেজুয়েলার ভেতরে মানসিক চাপ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা, যাতে বলিভারীয় প্রক্রিয়া আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়, দেশটি ১৯৯৮ সালের অবস্থায় ফিরে যায় এবং সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকারী সব হাইড্রোকার্বন আইন বাতিল করা যায়।
মারিয়া কোরিনা মাচাদো যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যদি দেশটি ১৯৯৮ সালের অবস্থায় ফিরে যায়, তাহলে ১৯৯৯ সালের সংবিধানের মাধ্যমে অর্জিত সব গণতান্ত্রিক অগ্রগতি বাতিল হয়ে যাবে। বাস্তবে, মাচাদো এমনও বলেছেন যে ভেনেজুয়েলার জনগণের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা হবে “ভালোবাসার কাজ”। যারা সরকার উৎখাত করতে চায়, তাদের স্লোগান হলো- পেছনের দিকে এগনো।
এদিকে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো কারাকাসে এক জনসমাবেশে ইংরেজিতে বলেন, “আমার কথা শুনুন- যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের প্রতি এই বার্তা।” সেই রাতেই একটি রেডিও ভাষণে তিনি বলেন, “সরকার পরিবর্তন নয়, যা আমাদের আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়ার মতো অন্তহীন ও ব্যর্থ যুদ্ধগুলির কথা মনে করিয়ে দেয়। সিআইএ-পরিচালিত কোনও অভ্যুত্থান নয়।”
“যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই”—এই লাইনটি সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং গানেও রূপ নেয়। মাদুরো একাধিকবার সমাবেশ ও আলোচনায় সঙ্গীতের তালে তালে এই কথাটি গেয়ে ওঠেন এবং অন্তত একবার এই বার্তাযুক্ত একটি টুপিও পরে হাজির হন।
সৌজন্য: পিপলস ডিসপ্যাচ
Comments :0