BJP Floor Crossing

দরজা বন্ধ, জানলা খোলা বিজেপি’র

সম্পাদকীয় বিভাগ

রাজনীতি থেকে নীতি শব্দটি বিসর্জনে বিজেপি এবং তৃণমূলের যৌথ উদ্যোগ নির্লজ্জতার সীমা আগেই ছাড়িয়েছে। এবার তৃণমূলের দলত্যাগী তিন প্রাক্তন সাংসদকে বিজেপি’র টিকিটে ফের রাজ্যসভায় পাঠানোর ঘোষণায় নির্লজ্জতার নতুন নতুন নজির দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। গত বুধবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভার তিনটি আসনে নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ও নির্দেশিকা জারি হয়। পরদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবারই বিধাননগরে বিজেপি’র কার্যালয়ে গিয়ে বিজেপি’তে যোগ দিয়েছেন তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইক। গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর তিনজনই রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগ করেন, তৃণমূলও ছাড়েন। এবার বিজেপি’র রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য নিজেই তাঁদের হাতে বিজেপি’র পতাকা তুলে দেন এবং জানিয়ে দেন যে, আগামী ২৪ জুলাই রাজ্যসভার আসনের যে নির্বাচন হবে, তাতে বিজেপি’র পক্ষ থেকে এই তিনজন প্রার্থী হচ্ছেন। 
বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরেই তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের দলত্যাগের যে হুড়োহুড়ি দেখা গিয়েছিল তা যে নিছক দলত্যাগ নয়, বিজেপি’র তরফে দল ভাঙানো এবং নীতি আদর্শহীন তৃণমূল নেতাদের ক্ষমতার অলিন্দে টিকে থাকার প্রয়াস তা একের পর এক ঘটনায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। বিধানসভায় তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে পঞ্চাশ থেকে শুরু হয়ে প্রায় সত্তর জন মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্ব অস্বীকার করে বিজেপি’র অনুমোদিত বিরোধী দল তৈরি করেছেন। যারা নির্বাচিত হতে পারেননি তাঁরাও লাইন দিয়েছেন। তৃণমূলের সাংসদদেরও অধিকাংশই বিজেপি’র দখলে চলে গিয়েছেন। দল ভাঙানোর কাজ অতীতে মমতা ব্যানার্জিও করেছেন। এখন তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে তাঁরই হাতে টিকিট দেওয়া নেতারা পুলিশি তদন্তের ভয়ে, মামলা থেকে বাঁচতে দল বদল করছেন। অর্থাৎ তৃণমূলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অতীত এতটাই কালিমালিপ্ত, তাঁরা এতটাই নীতি আদর্শহীন যে বিজেপি’র রাজনীতির বিরোধিতায় সম্পূর্ণ অক্ষম। একটা নির্বাচনী ফলাফলের ধাক্কায় মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের বাংলার বুকে বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ের যাবতীয় বাগড়ম্বরপূর্ণ প্রচারের অসাড়তা চোখের সামনে ফুটে উঠেছে।
অন্যদিকে বিজেপি’র রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরেই আগ বাড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে তৃণমূল থেকে বিজেপি’তে ঢোকার দরজা বন্ধ, আপাতত কাউকে নেওয়া হবে না। এখন তিনিই তৃণমূলের প্রাক্তন তিন রাজ্যসভা সাংসদের হাতে দলীয় পতাকা তুলে দিয়ে রাজ্যসভায় পাঠানোর ঘোষণা করে বলেছেন, এই তিনজনের বিজেপি’তে যোগদান ব্যতিক্রমী ঘটনা, কোনও বিচ্যুতি নয়। তৃণমূলীদের জন্য দরজা বন্ধের কথা বলে এখন তিনি এত বড় এবং এত গুরুত্বপূর্ণ জানলা হাট করে খুলে দিয়েছেন যে বিজেপি’র নেতারা নয়, তৃণমূলের সদ্য প্রাক্তন নেতারাই রাজ্যসভায় গিয়ে আবার বসবেন, এবং কয়েকদিন আগেও সংসদে তাঁরা যা বলেছিলেন তার বিপরীত সুরে মোদীর প্রশংসা করবেন অক্লেশে। একদিকে শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারীরা তৃণমূলের দুর্নীতিগ্রস্ত ও দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিচ্ছে, ডিম ছোঁড়া থেকে জেলে পোরা এবং এনকাউন্টার কোনোকিছুই বাদ যাচ্ছে না। কিন্তু সেগুলি বরাদ্দ চুনোপুঁটিদের জন্য, সব অপরাধের মাথারা কেউ বিধানসভায় সাজানো বিরোধী দলের নেতা হয়ে বসছেন, আর কেউ সরাসরি গেরুয়া পতাকা হাতে রাজ্যসভায় যাত্রা করছেন। ট্রয়ের ঘোড়ার পেটের ভিতরে লুকিয়ে থাকা গ্রিক সৈন্যদের মতো তৃণমূলের পেটের ভিতর থেকে আরএসএস’র বিশ্বস্ত লোকজন বেরিয়ে আসছেন। দরজা বন্ধ রাখা বিজেপি’র এমন খোলা জানলা দিয়ে তৃণমূলীদের ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ দুই ধরনের মানুষের সঙ্গেই সরাসরি বেইমানির দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। তৃণমূলের সাধারণ কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে বেইমানি করছেন তৃণমূলের নেতারাই। আর এই তৃণমূল নেতাদের শাস্তির প্রতিশ্রুতি শুনে বিজেপি’র প্রতি ভরসা করা সাধারণ মানুষজনের প্রতি বেইমানি করছেন বিজেপি নেতারাই। তবে বারবার প্রতারণার শিকার হওয়া রাজ্যবাসী চিরকালই প্রতারিত হয়ে যাবেন তাঁদের এমন নির্বোধ ভাবাটা ভুল।

Comments :0

Login to leave a comment