El Nino

এল নিনোর চ্যালেঞ্জের মুখে রাজ্যের খরিফ চাষ, করণীয় কী

রাজ্য স্পটলাইট

শান্তনু ঝা

২০২৬ সালের খরিফ মরশুম পশ্চিমবঙ্গের কৃষি অর্থনীতির জন্য এক অপেক্ষাকৃত জটিল পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর (IMD) পূর্বাভাস দিয়েছে যে ২০২৬ সালের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু (জুন-সেপ্টেম্বর) স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত করবে, যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের  মাত্র ৯০-৯২% হবে। এটি ২০১৫ সালের পর সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাতের বছর হওয়ার আভাস দিচ্ছে। জুন মাসে দেশে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০%, যা ১৯০১ সালের পর পঞ্চম-শুষ্কতম জুন। জুলাইয়ে কিছুটা উন্নতি হলেও, IMD জানিয়েছে জুলাইয়ের বৃষ্টিপাত গড় বৃষ্টিপাতের  ৯৪%-এর কম হবে।
এদিকে, কৃষি মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৫ জুলাই পর্যন্ত খরিফ চাষের আওতাধীন এলাকা দাঁড়িয়েছে ৩৫.১ মিলিয়ন হেক্টর, যা গত বছরের একই সময়ের ৪৪.৩ মিলিয়ন হেক্টর থেকে ২০.৮% কম। অর্থাৎ, প্রায় ৯২ লক্ষ হেক্টর কম জমিতে বীজ ফেলা হয়েছে। এই চিত্রের সঙ্গে যখন উপসাগরীয় যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট যুক্ত হয়——যা বিশ্বব্যাংকের মতে ভারতের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বৃদ্ধি ৭.২% থেকে ৬.৬%-এ নামিয়ে এনেছে——তখন পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়।
পশ্চিমবঙ্গের মতো বিস্তীর্ণ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ রাজ্যে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জলবায়ু অঞ্চল, জমির ধরন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—এই তিনটি বিষয়ের উপর নজর রাখা আবশ্যক। নিম্নে অঞ্চলভিত্তিক ফসল, এখনই করণীয় পদক্ষেপ ও জমির ধরন অনুযায়ী বিস্তারিত পরামর্শ দেওয়া হলো।

১. রাজ্যের বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলের উপযোগী চাষ

পশ্চিমবঙ্গের ৬টি কৃষি-জলবায়ু অঞ্চল ও সেখানে বর্ষাকালে (খরিফ মরশুম) উপযোগী প্রধান ফসল:
• উত্তর পার্বত্য অঞ্চল (দার্জিলিঙ, কালিম্পঙ, জলপাইগুড়ির উত্তরাংশ): চা, কার্ডামম, আদা, হলুদ, শাকসবজি (পাহাড়ি ঢালু জমিতে)।
• তিস্তা-তরাই অঞ্চল (শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর): আমন ধান, পাট, ভুট্টা, শাকসবজি (লাউ, কুমড়ো, ঝিঙে, ঢেঁড়স)।
• গাঙ্গেয় সমভূমি (নব পাললিক) অঞ্চল (উত্তর দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হুগলী, হাওড়া, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূমের অংশ): আমন ধান, পাট, আখ, তৈলবীজ, শাকসবজি।
• পুরানো পাললিক অঞ্চল (মুর্শিদাবাদ ও হুগলীর পশ্চিমাংশ, দক্ষিণ দিনাজপুর, বীরভূম ও বাঁকুড়ার পূর্বাংশ, পূর্ব মেদিনীপুর): আমন ধান, ডাল, তিল, শাকসবজি।
• লাল ও কাঁকুড়ে মাটি অঞ্চল (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম): ভুট্টা, ডাল, তিল, সরিষা (বৃষ্টিনির্ভর চাষ)।
• উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চল (দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী অংশ): লবণসহিষ্ণু ধান (যেমন: সোনা-মঙ্গল), নারকেল, কাজুবাদাম।
উল্লেখ্য, পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারত এখনও ৪১% বৃষ্টিপাতের ঘাটতিতে ভুগছে, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত recorded হয়েছে——তবে এই স্বাভাবিকতা সামগ্রিক নয়, বরং অঞ্চলভেদে তারতম্য রয়েছে।

২. এখনই যে পদক্ষেপগুলো নিতে হবে (জুন-জুলাইয়ের শুরুতেই)

• জমি প্রস্তুতি: জমি থেকে আগাছা ও ফসলের আগের আবর্জনা পরিষ্কার করে নিন। জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে মাটি সমান করে নিন। জৈব সার বা গোবর সার মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিন।
• বীজ নির্বাচন: উন্নত মানের, রোগমুক্ত এবং বিশেষ করে জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল জাতের বীজ ব্যবহার করুন। আবহাওয়া অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখে স্বল্প-মেয়াদি (শত দিনের) ফসলের জাত বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
• সার ব্যবস্থাপনা: মাটি পরীক্ষা করে রিপোর্ট অনুযায়ী সুষম সার ব্যবহার করুন। অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সার ও সবুজ সারের ব্যবহার বাড়ান।
• জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা: জমিতে যাতে অতিরিক্ত জল জমে না থাকে, সেজন্য প্রয়োজনীয় নালা কেটে বা উঁচু বেড (সারি) তৈরি করে জল বের করার ব্যবস্থা করুন।
• আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ: ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের (IMD) দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি বর্ষার পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ করুন। বর্তমানে এল নিনো শক্তিশালী হচ্ছে এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ তা চরমে পৌঁছাতে পারে।

৩. জমির ধরন অনুযায়ী সম্ভাবনা, সমস্যা ও পরামর্শ

• ডুবো/নিচু জমি (ধান প্রধান): দীর্ঘদিন জলাবদ্ধ থাকলে ফসলের গোড়া পচে যেতে পারে। পরামর্শ: উঁচু বেড পদ্ধতিতে (সর্জন পদ্ধতিতে) ধান চাষ; লবণাক্ত এলাকায় লবণসহিষ্ণু ধানের জাত চাষ; ধানের সাথে মাছ চাষের সুযোগ নিন; দ্রুত জল নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরি করুন।
• নিকাশি সমস্যাযুক্ত জমি: বৃষ্টির জল জমে থেকে ফসলের শিকড় নষ্ট করে; রোগ-পোকার আক্রমণ বাড়ে। পরামর্শ: চাষ শুরুর আগেই পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা (নালা) তৈরি করে ফেলুন; প্রয়োজনে জমির লেভেল সমান করে ঢালু তৈরি করুন।
• ডাঙা/উঁচু জমি (সবজি, ডাল, তৈলবীজ, ভুট্টা): বৃষ্টি অনিশ্চিত থাকলে খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়, মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়। পরামর্শ: জল ধরে রাখার কৌশল (যেমন: মালচিং) ও বৃষ্টির জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিন; অনিশ্চিত বৃষ্টির জন্য খরা-সহনশীল ফসলের জাত বেছে নিন।

৪. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা ও অভিযোজন কৌশল

বর্তমানে বৃষ্টিপাতের ধরণ বদলে যাচ্ছে——দিন কমছে, অন্যদিকে অতি ভারী বর্ষণ হচ্ছে। এল নিনো সাধারণত ভারতের মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দেয়, কারণ এটি সমুদ্র ও স্থলভাগের তাপমাত্রার পার্থক্য হ্রাস করে, যা মেঘ গঠন ও বৃষ্টিপাতকে দমন করে। ইতিহাস বলছে, শক্তিশালী এল নিনো বছরগুলিতে ভারতের বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছে। এর ফলে অকাল বন্যা, খরা ও রোগ-পোকার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।

যে কৌশলগুলি হাতে-কলমে নেওয়া দরকার:

• ধান-নির্ভরতা কমানো ও স্বল্পমেয়াদি ফসল চাষ: কেন্দ্র ও রাজ্য ভুট্টা, বাজরা ও মুগ ডালের মতো স্বল্পমেয়াদি ফসল চাষের পরামর্শ দিচ্ছে। এল নিনো-জনিত বৃষ্টি অনিশ্চয়তায় ডাল, তুলা ও তৈলবীজের উৎপাদন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
• স্মার্ট চাষাবাদ পদ্ধতি: শস্য চক্র অনুসরণ , জৈব সার ও অ্যাজোলা ব্যবহার বাড়ানো এবং 'হাইপার-লোকাল' আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগাতে হবে।
• সেচ ও জল ব্যবস্থাপনা জোরদার: ভারতের অর্ধেকের বেশি খরিফ চাষ সম্পূর্ণ বৃষ্টিনির্ভর। পশ্চিমবঙ্গেও এই নির্ভরশীলতা কমাতে সেচ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। খাল, পুকুর ও অন্যান্য জলাধার সংস্কার করে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করুন।
• প্রচলিত সরকারি সহায়তা গ্রহণ:
 • প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা (PMFBY) : এই প্রকল্পের আওতায় খরিফ ফসলের জন্য মাত্র ২% প্রিমিয়ামে আবাদি ক্ষতির বিমা করা যায়।
 • কিষান ক্রেডিট কার্ড (KCC) : চাষের খরচ মেটাতে স্বল্পসুদে ঋণ নেওয়া সহজ করা হচ্ছে।
 • জাতীয় বীজ মজুত : প্রয়োজনে চাষিদের মধ্যে বিনামূল্যে বা কম দামে বীজ বিতরণের ব্যবস্থা রয়েছে।
• বৈচিত্রময় চাষ ও জৈব পদ্ধতি: একটি ফসলের উপর নির্ভর না করে ধান, সবজি, ডাল ও তৈলবীজের মিশ্র চাষ করুন। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব পদ্ধতিতে চাষ করলে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং পরিবর্তিত আবহাওয়ায় ফসলের সহনশীলতা বাড়ে।
২০২৬ সালের খরিফ মরশুমের চ্যালেঞ্জ শুধু আবহাওয়াগত নয়——এটি একটি বহু-মাত্রিক সঙ্কট। এল নিনো-জনিত বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তার সঙ্গে যোগ হয়েছে উপসাগরীয় যুদ্ধ-জনিত অর্থনৈতিক চাপ। বিশ্বব্যাঙ্ক ইতিমধ্যেই ভারতের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রবৃদ্ধি অনুমান ৬.৬%-এ নামিয়ে এনেছে, এবং ক্রিসিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী এল নিনো, সার সরবরাহের ঝুঁকি ও বাড়তি কীটপতঙ্গের চাপ খরিফ ফসলের উৎপাদনশীলতার জন্য বড় ধরনের সমস্যা।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য এই সঙ্কটের গভীরতা আরও বেশি, কারণ রাজ্যটি ভারতের বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী রাজ্য। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রাজ্য ৪২ লক্ষ হেক্টরে ধান চাষের লক্ষ্য রেখেছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের বিলম্বিত ও অনিশ্চিত বর্ষায় সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়া কঠিন। আর ধান উৎপাদন কমলে শুধু চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না——খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়বে, যা ইতিমধ্যেই মার্চ ২০২৬-এ ৩.৮৭%-এ পৌঁছেছে। আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্কের অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি ৫.৫%-এ পৌঁছাতে পারে।
তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আশার আলো আছে। ভারতের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্যের মজুত রয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে মূল্য চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এছাড়া, আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে বর্ষার গতি বাড়লে এবং জলাধারগুলির জলের স্তর উন্নত হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো——আমরা কি এই সঙ্কটকে সুযোগে পরিণত করতে পারি? এল নিনো-জনিত বৃষ্টি অনিশ্চয়তা পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের বাধ্য করছে শতাব্দী প্রাচীন চাষাবাদের ধারা ভাঙতে। ধান-নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্রময়, স্বল্পমেয়াদি ও খরা-সহনশীল ফসলের দিকে ঝুঁকতে তারা উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এটি যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি পথ, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিস্থাপক করে তুলতে পারে।
ইতিমধ্যে সারা পৃথিবীতেই  ‘এল নিনো’ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। কৃষিতে এর যে সম্ভাব্য প্রভাব পড়বে সে বিষয়টিও আমাদের ভাবনায় ফেলেছে। তবে সচেতনতা, প্রযুক্তি এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এর প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও সময়মতো পদক্ষেপ নিলে এই বর্ষা মরশুমে পশ্চিমবঙ্গের কৃষকরা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে পারবেন। প্রয়োজন সঠিক তথ্য ব্যবহার সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্মিলিত প্রয়াস।

Comments :0

Login to leave a comment