সত্যব্রত ভট্টাচার্য: বিশাখাপত্তনম
আত্মসমীক্ষা আর আত্মসমালোচনার মধ্যে দিয়ে উঠে এল একটাই কথা, লড়াইয়ের পথেই আরও বেশি করে শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। শুক্রবার সম্মেলনের তৃতীয় দিনে প্রতিনিধিরা বললেন, সংগঠনকে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে হবে, আরও বাড়াতে হবে সদস্য সংখ্যা। যেখানে সম্ভব সেখানেই সংগঠনের বিস্তার ঘটাতে হবে।
শুক্রবার তৃতীয় দিনে পড়ল সিআইটিইউ’র ১৮তম সর্বভারতীয় সম্মেলন। সংগঠনের সভাপতি কে হেমলতা ও সাধারণ সম্পাদক তপন সেনের সম্মেলনের শুরুতেই তাঁদের বক্তব্যে বলেছেন, গত ৩ বছরে সিআইটিইউ সদস্য সংখ্যা কিছু বাড়লেও তাতে কোনও ভাবে আত্মতুষ্টির জায়গা নেই। বরং আরও কত মানুষের কাছে আমরা পৌঁছাতে পারলাম, সেটাই লক্ষ্য। উল্লেখ্য বৃহস্পতিবার সাংগঠনিক প্রতিবেদন অর্থাৎ দ্বিতীয় অংশের প্রতিবেদন পেশ করা হয়।
এদিন সেই সাংগঠনিক প্রতিবেদনের ওপর আলোচনা প্রসঙ্গে প্রতিনিধিরা সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতির বক্তব্যের রেশ ধরেই বলেন, সংগঠিত ক্ষেত্র বা অসংগঠিত ক্ষেত্রে লাল ঝান্ডাই যে সবসময় আন্দোলনের প্রতীক, শ্রমজীবী মানুষের সেই বিশ্বাস আছে। তাই আমাদের নিজেদেরই ত্রুটি দুর্বলতাগুলি দূর করে সংগঠনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সিআইটিইউ’র মতাদর্শকে আরও বেশি ছড়িয়ে দিতে হবে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সর্বভারতীয় সম্মেলনের গুরুত্ব এটাই।
উল্লেখ্য, ১৭ তম সম্মেলনের পর গত তিন বছরে সিআইটিইউ সদস্য সংখ্যা গোটা দেশে বেড়েছে মোটামুটিভাবে ৬ লক্ষ ৩০ হাজার। এদিন সিআইটিইউ-র বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিরা আলোচনা করেন যে কোথায় সংগঠন কতটা এগিয়েছে, কোথায় সেভাবে এগতে পারা যাচ্ছে না, কারণ কি- কি করণীয় ইত্যাদি বিষয়গুলি। সদস্য সংখ্যা আরও বাড়ানোর ওপর জোর সকলেই।
এদিন পশ্চিমবঙ্গ থেকে বক্তব্য রাখেন মঙ্গল বেনবংশী, বিশ্বরূপ ব্যানার্জি। বক্তব্য রেখেছেন পৃথা তা, কৃষ্ণা চ্যাটার্জি। এছাড়া অনিমেষ মিত্র বিএসনএলএল’র ক্ষেত্রে কিভাবে বিজেপি সরকার এই সংস্থাকে রুগ্ণ করে তুলেছে তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, বেসরকারি টেলিকম সংস্থাকে মোদী সরকার শেয়ার কিনে বাঁচিয়ে তুলছে অথচ নিজের সংস্থাকে শেষ করে দিচ্ছে। শ্রমিক-কর্মীদের ওপর প্রবল আক্রমণ নেমেছে। শূন্যপদ পূরণ হচ্ছে না। এর বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চলছে। সিআইটিইউ আমাদের পাশে আছে। গৌতম ঘোষ বাগিচা শ্রমিকদের সমস্যা তুলে ধরে বলেন, চা বাগানের জমি বেহাত হয়ে যাচ্ছে, চা শ্রমিকদের উৎখাত হতে হচ্ছে, ন্যূনতম মজুরি সহ ন্যায্য সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা। আসাম থেকে দার্জিলিঙ, নীলগিরি— সব জায়গায় একই অবস্থা। কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার কেউ সমস্যার সমাধান করছে না।
অন্যদিকে আইটি সেক্টরের সমস্যা তুলে ধরে চিনাংশু দাস বলেন, এআই কখনই মানব সম্পদের বিকল্প হতে পারে না। অথচ ওই মরীচিকাকে সামনে রেখে কর্পোরেট সংস্থাগুলি কর্মী ছাঁটাইয়ে উৎসাহিত হয়েছে। একে একে নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন আই টি কর্মীরা। আইটি সেক্টরকে আরও বেশি করে গুরুত্ব দিয়ে এই কর্মীদের কাছে সিআইটিইউ’কে পৌঁছাতে হবে। আসাম থেকে আগত প্রতিনিধি বলেছেন, আইটি সেক্টরে স্থায়ী কাজ আর থাকছে না। অ্যাপ্রেন্টিস, ট্রেইনির নামে শোষণ চলছে। অন্যদিকে ঠিকা কর্মী ও স্থায়ী কর্মীর মিলিত লড়াইয়ের ওপর আরও বেশি জোর দেওয়ার কথা বলেছেন দিল্লি থেকে আগত প্রতিনিধি। আরও বেশি করে নারী শিক্ষা, নারীদের জন্য সুযোগ সুবিধা, নারীদের জন্য হস্টেলের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার কথা জানিয়েছেন অন্ধ্র প্রদেশ, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র থেকে আসা প্রতিনিধিরা। তাঁরা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, আশা কর্মীদের জন্য লড়াই আন্দোলনের বিভিন্ন গতি প্রকৃতি তুলে ধরেছেন।
সংগঠনকে শক্তিশালী করার নানা উপায় ব্যাখ্যা করেছেন রেলওয়ে, অটোমোবাইল ক্ষেত্রের নেতৃবৃন্দ। ফিশারিজের ক্ষেত্রে সরকার কিভাবে সি-মাইনিং প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্ব উষ্ণায়নের ভয়ঙ্কর বিপদ বাড়িয়েছে সেই আলোচনা এদিন উঠে এসেছে। আলোচনায় এসেছে গৃহ পরিচারকদের সমস্যার কথা, বস্ত্রশিল্প-নির্মাণ শিল্পের সমস্যার কথা, পরিযায়ী শ্রমিকের বিপদের কথা। এসেছে টায়ার শিল্প, সিমেন্ট শিল্পের অবস্থার কথা। কিভাবে এইসব শিল্পে অস্থায়ী কর্মী বাড়ছে তার উদাহরণ দিয়েছেন তাঁরা। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য কোয়ার্ডিনেশন কমিটির পক্ষ থেকেও সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন নেতৃবৃন্দ। শ্রমিক কর্মচারীদের প্রতি বঞ্চনার নানা প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন তাঁরা। বিজেপি এবং রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি সহযোগী সরকারের অনৈতিকতার আরও বহু বিষয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তাঁদের বক্তব্যে।
একই সঙ্গে গিগ শ্রমিকদের বিপদ, ইস্পাত ও কয়লা ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণ, সঙ্কট সৃষ্টি, সরকারের শ্রমিক বিরোধী নীতিতে শ্রমিকদের অসহায়তার কথা, বিদ্যুৎ থেকে রেল, সড়ক পরিবহণ কর্মীদের দাবিদাওয়ার কথা, উঠে এসেছে এদিনও। এর মোকাবিলার সিআইটিইউ কিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে আগুয়ান হবে, শ্রমিক কর্মচারীদের পাশে দাঁড়াবে তাও শোনা গিয়েছে প্রতিনিধিদের মুখে।
CITU
দুর্বলতা কাটিয়ে, লড়াইয়ের পথেই পৌঁছাতে হবে আরও বেশি শ্রমজীবী মানুষের কাছে
×
Comments :0