প্রবন্ধ | নৌকা, নদী, বলাগড়ের নৌকা শিল্প এবং শ্রেণী সংগ্রাম
অয়ন মুখোপাধ্যায়
মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ১৬ জুলাই ২০২৬
ট্রেন বনাম নৌকা: কারিগরদের পিছিয়ে পড়া
ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, বলাগড়ের এই পিছিয়ে পড়ার প্রক্রিয়াটি কিন্তু রাতারাতি ঘটেনি। অর্থনৈতিক ইতিহাস নিয়ে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁরা দেখিয়েছেন যে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি যখন পূর্ব ভারতীয় রেলওয়ে হুগলি জেলায় লাইন পাততে শুরু করল, তখন থেকেই জলপথের একচেটিয়া ক্ষমতায় প্রথম বড় ধাক্কাটা লাগে বলাগড়ের নো শিল্পে। গবেষকদের একাংশ মনে করেন, বাংলায় ব্রিটিশ পুঁজি যখন স্টিমার আর রেলকে নিয়ে এল, এদেশি নৌকা-শিল্পের বাজার তখনই ছোট হতে বাধ্য হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে যখন নদীতে লোহার চাদর আর ফাইবার গ্লাসের মোটরচালিত ‘ভটভটি’র রাজত্ব শুরু হলো, তখন এই লড়াই আরও একটা মোচড় খেল। যাদের পকেটে রেস্ত ছিল, তারা চট করে কাঠের নৌকার মায়া কাটিয়ে মোটরের ডিলারশিপ নিয়ে বসল। আর বলাগড়ের সেই বুড়ো কারিগর, যিনি কাঠের গায়ে ছেনি চালাতে চালাতে বুড়ো আঙুলের ছাপটাই ক্ষইয়ে ফেলেছেন, তিনি আধুনিকতার এই স্পীডবোটে চড়ার টিকিটটাই পেলেন না। তিনি পড়ে রইলেন অ্যানালগ যুগেই, কারণ আধুনিক হতে গেলে যে পুঁজি লাগে, তা তো তাঁর ওই ছেনি-হাতুড়ির বাক্সে কোনো দিন জমা হয়নি।
টেন্ডারের দুর্নীতি বনাম বাম আমলের নীতি
সমকালের রাজনীতি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিগত তৃণমূল জমানায় সরকারি স্তরে নৌকার টেন্ডার নিয়ে যে বিশাল দুর্নীতির কারবার সামনে এসেছে, তা বলাগড়ের সাধারণ কারিগর দের পিঠ পুরোপুরি দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। সরকারি প্রকল্পের ফায়দা আজ আর আসল শ্রমিকের ঘরে পৌঁছায় না, তা কাটমানি আর তোলাবাজির সিন্ডিকেটের চক্করে পড়ে কতিপয় দলীয় নেতার পকেটে চলে যায়। অথচ এর একটা বড় ঐতিহাসিক বিকল্প আমাদের চোখের সামনেই আছে। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বিভিন্ন দপ্তর যেমন মৎস্য দপ্তর সুন্দরবন উন্নয়ন পরিষদ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকার নিজেই সরাসরি বলাগড়ের সমবায়গুলোর থেকে বড় সংখ্যায় নৌকা কিনত, যা নদী এলাকার গরিব মৎস্যজীবী ও মাঝিদের মধ্যে বিলি করত এমনকি সরকারি কাজে ব্যবহার করার জন্য কিনে রাখতো। এর ফলে কারিগরদের কাজের নিশ্চয়তা থাকত এবং বিক্রির জন্য কোনো দালালের মুখা পেক্ষী হতে হতো না। আজ যদি বলাগড়ের নৌকা শিল্পকে বাঁচাতে হয়, তবে দলবাজি আর টেন্ডার দুর্নীতির এই কালো হাত উপড়ে ফেলে বাম আমলের সেই সরাসরি সরকারি ক্রয়ের নীতিকে আবার ফিরিয়ে আনা দরকার।
চলবে
Comments :0