editorial

মূর্খের স্বর্গে সরকার

সম্পাদকীয় বিভাগ

রাজ্যে আরএসএস-বিজেপি জমানায় একেবারে গোড়াতেই বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ-খুনকে কেন্দ্র করে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার রাজ্যবাসীকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে — ঘটনা যা-ই ঘটুক বা সরকার যা খুশি তাই করুক, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার বা বিক্ষোভ দেখানোর আগে দশবার ভাবতে হবে। কারণ ফ্যাসিস্ত বৈশিষ্ট্যযুক্ত এই হিন্দুত্ববাদী সরকার কোনও অবস্থাতেই প্রতিবাদ বা বিরোধিতা সহ্য করতে রাজি নয়। দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকলেও, সংবিধান ধর্ম-মত-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করলেও, মত প্রকাশের, সমালোচনা করার ও বিরোধিতা করার অধিকার দিলেও হিন্দু রাষ্ট্রের একদলীয় আধিপত্যবাদে বিশ্বাসী আরএসএস-বিজেপি তা দিতে রাজি নয়। মানুষের যাবতীয় গণতান্ত্রিক অধিকার সুকৌশলে ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে কেড়ে নিয়ে মানুষকে প্রতিবাদহীন, ভিন্নমতহীন অনুগত অন্ধভক্ত প্রজা বানাতে চায়।
নির্বাচনের আগে এসআইআর-কে কেন্দ্র করে এবং নির্বাচনের পর নতুন বিজেপি সরকারের হকার ও গরিব বস্তিবাসী মানুষকে বেপরোয়া উচ্ছেদ তথা বুলডোজার রাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে দেখে এবং তাদের বামপন্থীদের আপসহীন অগ্রণী ভূমিকা থাকায় নতুন সরকার তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে। একদলীয় আধিপত্যবাদী মানসিকতা থেকেই তারা ভাবতে শুরু‍‌ করেছে ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে বিরোধিতার পরিসরে এবং প্রতিবাদ বিক্ষোভের ঝাঁঝে লাগাম টানতে হবে। তা না হলে সরকার বিরোধী মনোভাব ও জনমত দ্রুত বেড়ে সরকারের অস্তিত্বই বিপন্ন করে তুলতে পারে। সর্বোপরি বামপন্থীরা রাজ্য রাজনীতির ফোকাল পয়েন্টে চলে আসতে পারে। তেমন হলে আরএসএস-বিজেপি’র সামনে গুরুতর বিপদ সংকেত।
আরএসএস জানে তাদের হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক আধিপত্যবাদের মতাদর্শের ঘোরতর বিরোধী বামপন্থীরা। বামপন্থী মতাদর্শ মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে, জাতের ভিত্তিতে, ভাষার ভিত্তিতে, সংস্কৃতির ভিত্তিতে ভাগ শেখায় না। বামপন্থা সকল ভারতীয়কে ভারতের নাগরিক হিসাবে সমান অধিকারে ও সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে শেখায়। সংবিধানের ধর্মনিরেপক্ষতাকে প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করার, সমালোচনা করার ও প্রতিবাদ করার অধিকারকে সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করে। ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান এবং নাগরিকদের পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক অধিকারই ভারতীয়ত্বের মূল ভিত্তি। হিন্দুত্ববাদীরা এর বিরোধী। তারা রাষ্ট্র বা সরকার নিয়ন্ত্রিত ও খর্বিত গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত ও খণ্ডিত নাগরিকত্বে বিশ্বাসী। এরা ধর্মান্ধ রাজনৈতিক হিন্দুত্বের উগ্রতার বাইরে মনুষ্যত্ব, মানবাধিকার, মানবতা ইত্যাদি কোনও কিছু নিয়েই ভাবতে শেখেনি। তাই আদর্শগত প্রশ্নে ভারতে বামপন্থাই আরএসএস’র প্রধানতম শত্রু। এটা তারা একাধিকবার প্রকাশ্যে ঘোষণাও করেছে। তাই যখন যেখানে সুযোগ পায় সর্বাগ্রে বামপন্থীদের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্রের জাল বোনা শুরু করে দেয়। বারুইপুরেও তার অন্যথা হয়নি।
মনে রাখতে হবে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যে বিরোধী দল কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আগের শাসক দলের বড় অংশ ভিড়ে গেছে বর্তমান শাসক দলের ছত্রছায়ায়। বাকিরা বিক্ষুব্ধ তৃণমূলরূপে আছে বাফার জোনে। নামে বিরোধী দল হলেও নিয়মতান্ত্রিক বিরোধিতার নাটক করে সরকার পক্ষের গুডবুকে থাকার চেষ্টা করছে যাতে সময় ও সু‍যোগ বুঝে বিজেপি-‍তে ঢুকে পড়া যায়। আদি তৃণমূল তো ভেন্টিলেশনে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। এই অবস্থায় মানুষের পাশে রাস্তার লড়াইয়ে শাসকের মুখোমুখি আছে একমাত্র বামপন্থীরাই, আরও নির্দিষ্ট করে বললে সিপিআই(এম)। তাই বামপন্থীদের ঠেকাতে অনেক হিসাব কষে আইনের অপব্যবহার করে বামপন্থীদের ফাঁসানোর জন্য ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছে। সুজন চক্রবর্তী, মোনালিসা সিন্‌হা, লায়েক আলিদের বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে এবং লায়েক আলিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভারতে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বামপন্থীদের ভয় দেখাবে, প্রতিবাদী আন্দোলন বন্ধ করবে। মূর্খের স্বর্গে বাস করছে। বামপন্থীদের জেলবন্দি করে, অত্যাচার-নিপীড়ন, খুন করে দমানো যায় না। বিশ্বে কোথাও কোনোদিন যায়নি। শুভেন্দু অধিকারী কোন ছাড়।

Comments :0

Login to leave a comment