PROBANDHYA | KRISWASW BHATTACHARJEE | GANABILUPTI | MUKTADHARA | 5 MARCH 2026 | 3rd YEAR

প্রবন্ধ | কৃশাশ্ব ভট্টাচার্য | গণবিলুপ্তি | মুক্তধারা | ২০২৬ মার্চ ৫ | বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

PROBANDHYA  KRISWASW BHATTACHARJEE  GANABILUPTI  MUKTADHARA  5 MARCH 2026  3rd YEAR

প্রবন্ধ 

মুক্তধারা 

গণবিলুপ্তি

কৃশাশ্ব ভট্টাচার্য 

২০২৬ মার্চ ৫ | বর্ষ ৩



পৃথিবীকে বর্তমানে আমরা যেমন অবস্থায় দেখছি তা সব সময় একই রকম ছিল না। বরং, আদিম কালের পৃথিবীর মানচিত্র ও বর্তমান মানচিত্রের মধ্যেও আকাশ-পাতাল তফাত। বর্তমানে যেই কাঁকড়াবিছা দেখে আমরা আতঙ্কিত হই, কার্বনিফেরাস যুগে তারা প্রায় ৭০ সেন্টিমিটার লম্বা দানবাকৃতি ছিল। আবার তাদের পরে এল ডাইনোসর। মানুষের আগে পৃথিবীতে যেন তাদেরই রাজত্ব ছিল। শুধু স্থলেই নয় বরং আকাশ ও জলেও তাদের রাজত্ব কায়েম ছিল। কিন্তু তারা সব গেল কোথায়?
বিজ্ঞানী ডারউইন তার তত্ত্বে বলেছেন যে , প্রাণীরা বিকশিত হয়ে নতুন প্রজাতির জন্ম দেয়, কিন্তু সেই প্রজাতির বিলুপ্তি এর পিছনে তিনি কোন গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব দিয়ে যেতে পারেননি। বিশেষজ্ঞ হারবার্ট স্পেন্সার তার ' Survival of the Fittest ' তত্ত্বটিতে বলেন যে প্রাণী সকল প্রাকৃতিক বাধা কাটিয়ে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম সেই পরিবেশে আপন স্থান বানিয়ে নিতে সক্ষম। কিন্তু পরিবেশের এই ঐতিহাসিক বিপর্যয় গুলির সম্পর্কে কি আমরা জানি?
ইতিহাসের পাতায় পাতায় সকল ঘটনার ছাপ থেকেই যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক ও বিশেষজ্ঞদের অসীম চেষ্টার ফলে আমরা পূর্বে ঘটে যাওয়া এই মহাবিপর্যয়গুলি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয়েছি। এই মহা বিপর্যয়গুলিকে নাম দেওয়া হয়েছে গণবিলুপ্তি বা ' Mass Extinction Events ' বলে। ' Mass ' শব্দটি একটি ল্যাটিন শব্দ ' Massa ' থেকে এসেছে যার অর্থ সাধারণত একটি বিশাল পরিমাণকে বোঝায়। আবার, ' Extinction ' শব্দটিও এসেছে ল্যাটিন শব্দ ' Extinctionem ' থেকে যার অর্থ হল ' নির্বাপিত করা '। এই ভয়াবহ বিপর্যয় গুলির ফলে সমগ্র পৃথিবীর প্রায় ৭০%-৭৫% প্রাণ বর্তমানে বিলুপ্ত। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কারণে ঘটা এই গণবিলুপ্তিকে ঐতিহাসিক প্রমাণের মাধ্যমে প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়।
প্রায় ৪৪ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে প্রথম হিমযুগ দেখা যায়। অনুমান করা হয় যে পৃথিবীর কক্ষপথে কিছু ভিন্নতা তৈরি হয় যা পৃথিবীপৃষ্ঠে প্রথম হিমযুগকে আহবান জানায় । একে বলা হয় ' অর্ডোভিসিয়ান-সিলুরিয়ান বিলুপ্তি '। এই সময়ে অস্বাভাবিক ভাবে তাপমাত্রা হ্রাস পায় এবং সমুদ্রের জল জমে বরফ হয়ে যায় । এর ফলে জলস্তর কমে যায়। জলজ প্রাণীরা এর সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে প্রায় ৮৫% সামুদ্রিক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর পরবর্তীকালে আজ থেকে প্রায় ৩৭ কোটি বছর আগে ' লেট ডেভোনিয়ান বিলুপ্তি ' দেখা যায়। এই সময় প্রায় ৭৫%-৮০% সামুদ্রিক প্রাণী বিলুপ্ত হয়। এর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে ভিন্ন মত আছে, তবে মূলত সমুদ্রে অক্সিজেনের অভাবের কারণে বিপর্যয়টি ঘটেছিল। ধারণা করা হয় যে শৈবালের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি ঘটায় সমুদ্রের অক্সিজেন শুষে নেয় । এই ডেভোনিয়ান বিলুপ্তি একটি যুগের শেষ ঘটিয়ে ' কার্বোনিফেরাস ' যুগের সূচনা করে। যখন জলজ পোকামাকড়রা স্থলে নিজেদের অভিযোজিত করে। এর ফলে শুরু হয় ' ইনসেক্টদের যুগ ' যা পৃথিবীপৃষ্ঠে দানব আকৃতির পোকামাকড়দের জন্ম দেয়। 
এরপর, আজ থেকে প্রায় ২৫ কোটি বছর আগে ঘটে সবচেয়ে ভয়াবহ গণবিলুপ্তি যাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ' The Great Dying ' বা 'ভয়াবহ মৃত্যু'। এই সময় সাইবেরিয়া ট্র্যাপস-এ এক বিশাল অগ্নুৎপাত হয় যার ফলে বায়ুমণ্ডলের সর্বত্র গ্রীন হাউস গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে তৈরি হয় বিপুল গ্রিন হাউস এফেক্ট ও বিশ্ব উষ্ণায়ন যা ৯৬% সামুদ্রিক ও ৭০% স্থলজ প্রাণীদের বিলুপ্তি ঘটায়। একে আবার প্রথম ইনসেক্ট ইনস্টিংশন ইভেন্টও বলে।
তার প্রায় পাঁচ কোটি বছর পরে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ২০ কোটি বছর আগে ' ট্রায়াসিক ও জুরাসিক বিলুপ্তি ' ঘটে যার প্রকৃত কারণ ছিল মহাদেশীয় পাত সঞ্চালন ও আগ্নেয়গিরি সক্রিয়তা। এই সময় প্রায় ৮০% প্রজাতি বিলুপ্ত হলেও বলা বাহুল্য এর ফলে ডাইনোসরদের বিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছিল, কারণ তাদের সমসাময়িক প্রতিযোগীরা মারা গিয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ডাইনোসররা বিশেষ ছিল । কারণ এখনকার মতো সেই সময় অক্সিজেন ছিল না। বায়ুমণ্ডলে প্রায় ১০%-১৫% অক্সিজেন ছিল।  ফলত উন্নত শ্বাসকার্য তাদের বিকশিত করতে হয়েছিল। এর অনেক সময় পরে, আজ থেকে প্রায় ৬.৬ কোটি বছর আগে ' ক্রিটেসিয়াস -প্যালিওজিন বিলুপ্তি ' ঘটে। মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে একটি বিশাল গ্রহাণু  আছড়ে পড়ায় প্রায় ৭৫% প্রজাতি বিলুপ্ত হয় যার মধ্যে অন্যতম ছিল ডাইনোসররা। তবে এর পড়ে পৃথিবী নিজেকে আবার সক্ষম করে তোলে, ওজন স্তর পুনর্গঠিত হয়, বৃদ্ধি পায় অক্সিজেন লেভেল আর ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা বিবর্তনের সুযোগ পায় যা মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে মাইলস্টোন বলে বিবেচিত হয়। 
বর্তমানে পৃথিবী যে সংকট থেকে মুক্ত এমন কিন্তু নয়, বরং পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম মনুষ্য ক্রিয়াকলাপের ফলে সৃষ্ট গনবিলুপ্তির মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ' অ্যানথ্রোপোসিন বিলুপ্তি '। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন যে বর্তমানে প্রজাতি বিলুপ্তির হার স্বাভাবিকের চেয়ে ১০০ থেকে ১০০০ গুণ বেশি। আজ যদি আমরা সতর্ক না হই তবে মানুষের কাজের জন্য পৃথিবী প্রলয়ের সম্মুখীন হতে পারে যার প্রকোপের তালিকা থেকে আমরাও বাদ যাবে না আমরাও। তাই আত্মস্বর্থ ত্যাগ করে পরিবেশকে বাসযোগ্য করাই হলো আমাদের কর্তব্য।

 

দ্বাদশ শ্রেণী,  নাটাগড় স্বামী বিবেকানন্দ সেবা সমিতি উচ্চ বিদ্যালয় 
নাটাগড়,  উত্তর ২৪ পরগনা কল্যাণনগর,  খড়দহ 

Comments :0

Login to leave a comment