Editorial

যুদ্ধবাজ দূর হটো

সম্পাদকীয় বিভাগ

গত কয়েক মাস ধরে লাগাতার দাবি করে চলেছেন তিনি নাকি পাক-ভারত সহ ৮টি যুদ্ধ থামিয়েছেন। রুশ—ইউক্রেন যুদ্ধও নাকি কিছু দিনের মধ্যে থামিয়ে দেবেন। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে একটার পর একটা যুদ্ধ থামিয়ে তিনি নাকি লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন। ধ্বংস ও মৃত্যু রুখে দিয়ে নিজেকে শান্তির দূত বলে জাহির করেছেন। প্রবল বাসনা ছিল নোবেল শান্তি পুরস্কার পাবার। একাধিকবার প্রকাশ্যে নিজেই নিজের হয়ে উমেদারি করেছেন। কিন্তু শান্তি পুরস্কারের জন্য নোবেল কমিটি তাঁর নাম বিবেচনাই করেনি। স্বভাবতই ক্ষুব্ধ, ক্রদ্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তির জাল পতাকা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিজেই ঢাক ঢোল পিটিয়ে নেমে পড়লেন যুদ্ধে। যুদ্ধবাজ, হিংস্র ও আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকাকে নতুন করে ফিরিয়ে আনলেন আরও হিংস্র ও আরও আগ্রাসী রূপে। এই পর্বে তাঁর প্রথম টার্গেট ছিল ভেনেজুয়েলা। একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশে কল্পিত অভিযোগ সাজিয়ে সামরিক হামলা চালিয়ে মধ্য রাতের অন্ধকারে সে দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সস্ত্রীক রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে তুলে নিয়ে পুরে দিলেন আমেরিকার জেলে। অন্য দেশের রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মনগড়া অভিযোগ তুলে তার বিচার হবে নাকি আমেরিকার জেলে। মধ্য যুগের অসভ্য বম্বেটেরাও সম্ভবত এতটা বর্বর ছিল না। সভ্যতার গর্ব করা আমেরিকা ট্রাম্পের নেতৃত্বে সেই বর্বরদেরও লজ্জায় ফেলে দিয়েছে। সমর শক্তি ও অর্থ শক্তির জোরে ট্রাম্প মনে করছেন তিনি বিশ্ব সম্রাট বনে গেছেন। গোটা দুনিয়া তাঁর পদতলে অবনত। যা খুশি তাই করার স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচারী অধিকার তাঁর আছে।
এবার তাঁর লক্ষ্য ইরান। আমেরিকার জন্মের কয়েক সহস্র বছর আগে যে ইরানি তথা পারস্য সভ্যতার আবির্ভাব সেই ইরানকেই ধ্বংস করতে তিনি মেতে উঠেছেন। ইরানকে কোনও অবস্থাতেই পরমাণু কর্মসূচি চালাতে দেওয়া হবে না। এটাই আমেরিকার শেষ কথা। কারণ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সফল হলে ইজরায়েলকে সামনে রেখে সমগ্র পশ্চিম এশিয়া ও আরব দুনিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কর্তৃত্ব তথা দাদাগিরি অচল হয়ে যাবে। কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ইজরায়েল কোণঠাসা হয়ে পড়বে। গাজা ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক সহ সমগ্র প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে ইজরায়েলের ক্রমবর্ধমান দখলদারি বন্ধ হয়ে যাবে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে প্যালেস্তাইনের আত্মপ্রকাশ আর ঠেকানো যাবে না। সর্বোপরি বিশ্বের বৃহত্তম তেল ভাণ্ডারে মার্কিন কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যাবে। নব্য উদার নীতির ক্রম বর্ধমান সঙ্কটের আবর্তে মার্কিন পুঁজির দাপট ও বিশ্ব বাজারে তার লাগাম শিথিল হবার আবহে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আতঙ্ক তাকে আরও বে‍‌শি বেশি করে আগ্রাসী ভূমিকার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ঠান্ডা যুদ্ধের পর যতদিন আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ ছিল না ততদিন আমেরিকা কিছুটা সংযত ছিল। কিন্তু যখন থেকে চীন সহ নতুন শক্তির উত্থান ঘটতে শুরু করেছে তখন থেকে আমেরিকার মনে ভয় বাসা বেঁধেছে। সেই ভয় থেকে আতঙ্ক। তারপর নিজের শক্তি জাহির করতে নিজেকে বিশ্বের শাসক প্রমাণ করতে যুদ্ধকে হাতিয়ার করেছে। ইরান আগ্রাসন তারই ফলশ্রুতি। বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত আমেরিকার পক্ষে ধারাবাহিক বা দীর্ঘ যুদ্ধ চালানোর আর্থিক সামর্থ্য নেই। তাই হুঙ্কার দিলেও সামনে রেখেছে ইজরায়েলকে।

Comments :0

Login to leave a comment