ভ্রমণ
মুক্তধারা
ষোলোআনা নিজমিয়ানা
অভীক চ্যাটার্জী
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বর্ষ ৩
গোলকন্ডা ফোর্ট
আমি যখনই কোনো দুর্গ দেখতে যাই, আগে তার ইতিহাসটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি। তাতে সুবিধে যেটা হয়, দুর্গ তৈরির পেছনে সব কারণগুলো বোঝা যায়। আসুন ছোট্ট করে জেনে নিই এই দুর্গটারও ইতিহাস।
শহরের প্রায় উপকন্ঠে বর্তমানে ভগ্নপ্রায় দুর্গটি দ্বাদশ শতক থেকেই তৎকালীন দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তির কেন্দ্র ছিল । দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে এটিকে নির্মাণ করেন কাকাতিয়া রাজবংশের রাজপুরুষেরা। এটি তখন ছিল কাদামাটি দিয়ে নির্মিত এক দুর্গ, যার তৎকালীন নাম ছিল " মঙ্গল" । এটি কৌশলগত অবস্থানেই জন্যই এটি ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারপর ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে কুলী কুতুব শাহ বাহমানি সালতানাত থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে গোলকোন্ডাকে রাজধানী করেন। তাঁর হাত ধরেই কুতুব শাহী রাজবংশের সূচনা। এই সময়েই দুর্গটি পূর্ণাঙ্গ পাথরের দুর্গে রূপান্তরিত হয়।
দুর্গটির প্রাচীর প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ, এতে রয়েছে ৮টি প্রধান ফটক,
৮৭টি বুরুজ, বহু গুপ্ত সুড়ঙ্গ ও জলাধার।এই দুর্গের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো শব্দ প্রতিধ্বনি ব্যবস্থা—ফতে দরজায় হাততালি দিলে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে দুর্গের সর্বোচ্চ প্রাসাদে তা শোনা যায়। এটি শত্রু আগমনের আগাম সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
এতবড় দুর্গ, তার এত ব্যায়ভার বহন করতে টাকা লাগতো প্রচুর। এখন প্রশ্ন হলো এই টাকা আসতো কোত্থেকে? এখানেই আসে কুতুবশাহী দের অর্থের মূল উৎস, হীরা! গোলকোন্ডা ছিল আক্ষরিক অর্থেই হীরক রাজ্য। ইউরোপীয় পর্যটক ও বণিকদের লেখায় “Golconda Diamonds” ছিল এক বিলাসবহুল প্রতীকের নাম।কৃষ্ণার অববাহিকায় অবস্থিত খনিগুলি থেকে বিশ্বের বহু বিখ্যাত হীরা পাওয়া যায়।যার একটির কথা আমরা সবাই কম বেশি জানি। কোহ - ই - নূর!
গোলকোন্ডা শুধু সামরিক দুর্গ নয়, এটি ছিল শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মীয় সহাবস্থানের কেন্দ্র। দুর্গের ভিতরে ভগ্নপ্রায় মসজিদ, দরবার হল, প্রাসাদ, উদ্যান ও জল সরবরাহের উন্নত ব্যবস্থা দেখলে পারস্য ও দাক্ষিণাত্য স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব মেলবন্ধন খুঁজে পাওয়া যায়।
১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব প্রায় ৮ মাস ধরে গোলকোন্ডা অবরোধ করেন।আবদুল্লা খানের বিশ্বাসঘাতকতায় দুর্গের ফটক খুলে যায় এবং কুতুব শাহী শাসনের অবসান ঘটে। এরপর দুর্গটি ধীরে ধীরে তার গুরুত্ব হারায়।
সন্ধ্যাবেলায় লাইট এন্ড সাউন্ড শো হয় গোলকোন্ডা দুর্গে। সেটি অবশ্যই দেখা উচিৎ। খুবই আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে সেটি হায়দরাবাদ তথা এই দুর্গের ইতিহাস বলে।
আজ গোলকোন্ডা ASI সংরক্ষিত একটা ভ্রমণের জায়গা হলেও আপনি যখন সেই দুর্গের পথ ধরে হাঁটবেন, অদ্ভুত এক অনুভূতি হবে আপনার। আজ সে বাতাস কানে কানে বলে যায় তার গৌরবময় ইতিহাসের কথা, সেই সাথে শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি কানে কেঁদে যায় তার বিশ্বাসঘাতকতার করুন বার্তা। গোল পাথরের দুর্গ বা গোলকোন্ডা আজও এক বয়ে চলে তার নয়শো বছরের ইতিহাসের ভার। ভোরের আলো তার ঘুম ভাঙায়, আর সাঁজের আলো বিলি কেটে যায় তার পক্ক কেশে। আর সে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে তার নিঃসঙ্গ গোধূলি বেলায়।
Comments :0