গল্প | মামদিদি, বাবাই আর মেসি
সৌরীশ মিশ্র
নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ২৫ জুলাই ২০২৬
"মামদিদি..." মামাতোদিদি মামের শোওয়ার ঘরের চৌকাঠ পেড়িয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই ডাকল বাবাই।
রোববারের বিকেল। ওর এই বেডরুমে বিছানায় বসে কোলের উপর ল্যাপটপটা রেখে কলেজের প্রোজেক্টের জন্য কিছু ইনফরমেশন সার্চ করছিল মাম ইন্টারনেট থেকে। তার ডানদিকে এই ঘরে ঢোকার দরজা। সে বাবাই-এর ডাকে ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সড়িয়ে তাকাল ওর প্রিয় ছোট্ট ভাইটার দিকে। তারপর বলল, "আয়। এই এলি, না! আমাদের গেট খোলার শব্দ পেয়েই বুঝেছি তোরা এসে গেছিস। মা বলছিল সকালে, তোরা আসবি বিকেলবেলা।" এইটুকু বলেই কয়েকক্ষণের একটা বিরতি নেয় মাম, তারপর ফের বলে ওঠে, "আরিব্বাবা, কি পড়েছিস এটা!" বাবাই-এর গায়ে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার জার্সি। সেইটা দেখেই বলে শেষ কথাগুলো মাম।
'বাবা কাল কিনে দিল।" বলতে বলতেই মামের পাশটায় ধপ্ করে গিয়ে বসে পড়ল বাবাই।
ভাইটা তার মেসি আর আর্জেন্টিনার যে ফ্যান সেটা ভালো করেই জানে মাম।
বিছানায় বসে একটু থিতু হয়েই মাথা নিচু করে জার্সিটার দিকে কয়েকক্ষণ দেখে বলে উঠল বাবাই, "কেমন লাগছে মামদিদি আমায় জার্সিটায়?"
জার্সিটা পেয়ে যে ভীষণই খুশি হয়েছে ওর ভাইটা, সেটা মামের মোটেই বুঝতে অসুবিধা হয় না। একেবারে আনন্দে ঝলমল করছে বাবাই-এর মুখটা যে!
মাম কোলের ল্যাপটপটা বিছানার এক পাশে রেখে তাকাল ভালো করে বাবাই-এর দিকে। ভাই-টা এমনিতেই ওর দেখতে ভালো। তার উপর জার্সিটা পরে ওকে সত্যিই মিষ্টি লাগছে খুব। ঠিক যেন ছোট্ট একটা মেসি!
মাম "দারুণ"-ই বলতে যাচ্ছিল বাবাই-কে উত্তরে, কিন্তু, হঠাৎ একটা দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় খেলে গেল ওর। সে মনে-মনে ভাবলো, ভাইটার সাথে একটু মজা করলে কেমন হয়!
যেমন ভাবা তেমন কাজ। মাম বাবাই-এর দিকে তাকিয়ে বলল, "লাগছে ভালোই, তবে আর্জেন্টিনার ঐ জার্সি পড়ে কতোদিন আর খেলবে তোর মেসি! এই তো লাস্ট ওয়ার্ল্ড কাপ-ও খেলে ফেলল এবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে।"
এই ধরনের উত্তর যে পাবে ওর মামদিদির কাছ থেকে ও, তা তো বাবাই-এর ধারণার-ও বাইরে ছিল। তাই, মামের কথাগুলো শুনে কয়েকক্ষণ মামের দিকে তাকিয়ে থাকল কেমন যেন করুণ ভাবে সে। তারপরই ঝরঝরিয়ে কেঁদেই ফেলল বাবাই।
এই দিকে, মাম তো শুধুই একটু মজা করতে চেয়েছিল বাবাই-এর সাথে। এমনিতে, বাবাই-এর মাথা খুব ঠান্ডা। রেয়ারলি রাগে-টাগে। আর ওর মামদিদি কিছু উল্টো-পাল্টা ওকে বললে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গায়েই মাখে না সেসব কথা সে। কিন্তু, যদি কখনো মামের কথায় রেগে একবার যায়, তখন ফরসা মুখটা লাল করে, ঝগড়া করতে থাকে মামের সাথে। মাম যে অতো বয়সে বড় সেসব পুরো ভুলে যায় তখন। যেন মাম ওর বন্ধু। তখন, ঝগড়া করতে করতেই মাম হঠাৎ জড়িয়ে ধরে শক্ত করে ওর বুকে বাবাই-কে। আর তাতেই মুহূর্তে জল হয়ে যায় সব রাগ বাবাই-এর। ভাইটার ঝগড়া করা রীতিমত এনজয় করে মাম। তাই, রাগানোর চান্স পেলে ছাড়তে চায় না সে। আজও যেমন ভেবেছিল ও, মেসি আর আর্জেন্টিনা সম্বন্ধে ওসব বললে, রেগে যাবে ভীষণ বাবাই। তারপর ঝগড়া শুরু করবে। আর ও তখন ওকে আদর করে ওর রাগ ভাঙাবে। কিন্তু, কি ভেবেছিল মাম, আর কি হোলো! তার মজা করার ফলে যে এইরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে তা তো ভাবতেই পারেনি সে। মাম বুঝতে পারে বড্ড ভুল হয়ে গেছে তার। ছোট্ট ভাইটার মনে আঘাত দিয়ে ফেলেছে সে। তাই তাড়াতাড়ি দু'হাত বাড়িয়ে দিয়ে টেনে নেয় মাম বাবাই-কে তার বুকে। জড়িয়ে ধরে, বাবাই-এর গায়ে-মাথায় আদর করে, একটু শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে তাকে। আর বাবাই? হাপুস নয়নে কাঁদতে-কাঁদতে অস্ফুটে শুধু বলেই চলেছে সে, "মেসি আরো অনেকদিন খেলবে আর্জেন্টিনার হয়ে। আরো আরো আরো অনেক অনেকদিন..."
মামের কানে যায় কথাগুলো। সে বুঝতে পারে, ও যতোটা ভেবেছিল, তার চেয়ে কয়েকশো গুণ বেশি ভালোবাসে তার ভাইটা মেসিকে।
মাম আদর করতেই থাকে বাবাই-কে। বাবাই কিন্তু এখনও কেঁদেই চলেছে মেসির জন্য।
Comments :0