দেবাঞ্জন দে
ভারতের কোনও প্রান্ত— ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বোনা একটি মেয়ে আর খানিকক্ষণেই পরিণত হবে লাশে! ডাক্তারির স্বপ্নটা ঝুলবে পলেস্তারা খসা দেওয়াল থেকে টাঙানো বাজাজ কোম্পানির সিলিং ফ্যানের গা থেকে। আরেক দেওয়ালের ঝুলিয়ে রাখা ক্যালেন্ডারের আঁকিবুঁকি বলছে গত এক বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে মেয়েটা। আর বলছে দিন সাতেক আগেই ছিল সেই ফাইনালের দিন— যে নিট পরীক্ষার জন্য এক বছরের প্রস্তুতি, বাপ-মা'র জমিজমা, গয়নাগাঁটি বন্ধক রেখে প্রাইভেট কোচিংয়ের প্রেপ প্যাকেজের টাকা জোগানে, এই সমাজে মেয়ে হয়েও ডাক্তার হতে চাওয়ার লড়াই তো আরও আরও বহুদিনের। অথচ যে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য এতো লড়াই, সেই প্রশ্নগুলোই ফাঁস হয়ে গেছে পরীক্ষার আগেই। বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা তিলতিল করে লড়াইয়ের স্বপ্নগুলো আর স্বপ্নের লড়াইগুলোর ওপর কেউ যেন এক নিমেষে বসিয়ে দিয়েছেন বাতিলের স্ট্যাম্প। সুইসাইড নোট লিখতে বসে তাই নিজের নাম দিল সে ‘বাতিল’।
কোথাও এই ‘বাতিল’রা কার্নিশে দাঁড়িয়ে প্রহর গুনছে শেষ হয়ে যাওয়ার। কোথাও ভিড় প্ল্যাটফর্মে হাত পা ছুঁড়ে একবার ধরে ফেলার চেষ্টা শেষ ট্রেনটা, যেটা তাকে পৌঁছে দেবে পরীক্ষা কেন্দ্রে। কোথাও আবার উপচে পড়া জেনারেল কামরায় অসুস্থ হয়ে মরে যাচ্ছে বেঘোরে। কোথাও নাম লেখাচ্ছে জোমাটো, সুইগ্যি'র ডেলিভারি চেনে। কোথাও মিশে যাচ্ছে ড্রাগ, আসক্তি, অন্ধকার জগতের অপরাধ চক্রে। কোথাও স্রেফ হতাশা, গ্লানি, যন্ত্রণা বুকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে নিজের থেকে। ভারতে লেখাপড়ার জগতে অ্যাসপিরেন্টদের নতুন নাম ‘বাতিল’।
ফের ভারতেরই কোনও প্রান্ত— ঝকঝকে স্কুলে ক্লাস চলছে ছাত্র-ছাত্রীদের। ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন সব্বাইকে— "বড় হয়ে কী হতে চাও?" কেউ বলল ডাক্তার, কেউ বলল ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বলল প্রফেসর, কেউ বলল লেখক, একজন বলল মন্ত্রী! চমকে উঠে ম্যাডাম সেই ছাত্রের কাছে প্রশ্ন করলেন— "মন্ত্রী হতে চাও কেন?" ম্যাডামকে আরও চমকে দিয়ে ছাত্র সটান জবাব দিল— "অনেক টাকা কামানো যাবে তাই!" যা ছিল একসময় দেশের সেবা, নীতির সেবা তা এখন দ্বেষের চক্র, দুর্নীতির কাঠামো। মন্ত্রী হতে চাওয়ার কারণ তাই আর দেশব্রত নয়, দুর্নীতি, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষ্যে স্থির হয়ে গেছে। এভাবেই বাতিল হয়ে গেছে দেশের বিবেক।
লেখাপড়ার সঙ্কট আমাদের দেশে ব্যাপক অংশের ছাত্র-ছাত্রীদের ছিটকে বের করে দিয়েছে মূলস্রোতের শিক্ষা থেকে। বাকি যে কতিপয় অংশ যা হোক করে লেখাপড়া চালাচ্ছে তাদের পরিণতি হচ্ছে হতাশা, গ্লানি অথবা ব্যর্থ ক্ষোভে। দুর্নীতি পেয়ে গেছে স্বাভাবিকত্ব। সমাজে সৎ মানুষটাই হয়ে উঠেছে প্রবল বেমানান। যেন নীতিবোধ একটা নিষিদ্ধ শব্দ! সৎ হয়ে ওঠাটা অপরাধ! অসৎ হওয়াই সমাজের অভিপ্রেত! আসলে সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে রাষ্ট্রের। ঠিক যেমন স্বপ্ন দেখানো আর সেই স্বপ্নকে বাতিলের খাতায় না ফেলে, সত্যি করার লক্ষ্যে অবিচল থাকার ক্ষেত্রেও সবচেয়ে দায়িত্বশীল হওয়ার কথা রাষ্ট্রের। অন্তত ভারতের সংবিধান সেই কথাই বলে। অথচ রাষ্ট্র এখন থেকে সবচেয়ে পচাগলা দুর্নীতিগ্রস্ত, খুনি, ধ্বংসাত্মক বাহিনীর বীভৎস জঙ্গি আস্ফালনের প্রতিরূপ। যুদ্ধ চলছে রাষ্ট্র বনাম জনতা। দুর্নীতি বনাম ভবিষ্যৎ।
গত দশ বছরে, প্রায় পঁচিশটা সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি। সবমিলিয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েক কোটি। ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি প্রজন্ম। মেডিক্যা ল হোক বা গবেষণা দুর্নীতি সর্বত্র। পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থার বেনজির গাফিলতির পরেও কোনও সদর্থক পদক্ষেপ নেই সরকারের। কখনো প্রশ্নপত্র ফাঁস, কখনো মূল্যায়নে ত্রুটি, কখনো পরীক্ষার ডেট বাতিল। সংশয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ। বাতিল গোটা বছরের প্রস্তুতি, পরিশ্রম। প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজেপি’র সরাসরি যোগ। তদন্তে নাম উঠে এসেছে বিজেপি’র খুচরো নেতাদের। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে আসেনি কোনও বিবৃতি। শিক্ষা মন্ত্রী চুপ, প্রধানমন্ত্রী বেপাত্তা!
গোটা দেশজোড়া পেপার লিকের চক্র। মহারাষ্ট্রের নাসিকের ছাপাখানা থেকে প্রশ্নপত্র বেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে হরিয়ানা, রাজস্থান। সেখান থেকে নিলামে উঠে পৌঁছে যাচ্ছে বিহার, বাংলা, ওডিশা হয়ে দক্ষিণ ভারতের নানা প্রান্তে। দেশজোড়া নেটওয়ার্কের প্রধানতম লিঙ্কগুলো বিজেপি শাসিত রাজ্যে, সেই সেই রাজ্যের স্থানীয় নেতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ধরাও পড়েছে অনেকেই। কিন্তু দায় কার? সরকার, তার কী ভূমিকা? শিক্ষা মন্ত্রকের প্রধান আড়ালে কেন?
২২জন ছাত্র-ছাত্রী বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার পথ। শুধু নিট পরীক্ষার দুর্নীতির কারণে। গত ন’বছরে একের পর এক পরীক্ষা দুর্নীতি ও তার ফলাফলস্বরূপ ছাত্রমৃত্যু খুঁজলে তা বেড়ে দাঁড়াবে কয়েকশোয়। এই মৃত্যুর দায় নেবে কে? এই হতাশা, গ্লানি, ঘৃণা, বিচ্ছিন্নতার দায় নেবে কে? এই ব্যর্থতার পরেও কোন মুখে চেয়ারে বসে আরাম পোয়াচ্ছেন শিক্ষা মন্ত্রী? কোন জাদুবলে বছরের পর বছর ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও বদলাচ্ছে না পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা? বদলাচ্ছে না মূল্যায়ন পদ্ধতি? মূল্যায়নের ধারাকে কেন্দ্রীভূত করা কী এই দুর্নীতির নেটওয়ার্কের সুবিধার্থে?
এই প্রশ্নগুলোই তুলেছে দেশের ককরোচরা— আজকের প্রজন্মের বিক্ষুব্ধ, বীতশ্রদ্ধ মন। যন্তর মন্তরে লাগাতার ধরনায়, অনশনে ঘুরে ফিরে এসেছে এই প্রশ্নগুলোই। বিশ্ববরেণ্য শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াঙচুক এই প্রশ্নগুলো সামনে রেখেই একুশ দিন ধরে কিছু খাননি। দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রথিতযশা মানুষজন তাঁকে অনশন ভাঙার আবেদন জানাতে, উত্তরে বলেছেন- "What will change if I eat!" কী বদলাবে উনি কয়েকমুঠো খাবার খেলে! যে ব্যবস্থা দিনের পর দিন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে তালা ঝোলায়, গরিব মধ্যবিত্তের কাছ থেকে কেড়ে নেয় লেখাপড়ার ন্যূনতম সাংবিধানিক অধিকার, বিকৃত করে ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞানের পাঠক্রম, বিক্রি করে দেয় দেশের গোপন তথ্য, ধ্বংস করে দেশের সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদকে, সেই ব্যবস্থা পালটানোর লড়াই চলছে।
সেই লড়াইতে এখন জুড়ে গেছে লাখো লাখো সোনাম ওয়াঙচুক, লাখো লাখো ককরোচরা। ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে এসে তারা ভবিষ্যতৎগড়তে চাইছে। দেশের মানবসম্পদের ভবিষ্যৎ। না খেয়ে যুদ্ধ, ঘুষ খাওয়া সরকারের বিরুদ্ধে। দেশের প্রতি প্রান্তরে গড়ে উঠছে প্রতিরোধের যন্তর মন্তর। একুশ দিন অনশনের মধ্যে সরকার একবারও দেখা করার প্রয়োজন মনে করেনি প্রতিবাদী ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে। অথচ প্রকাশ্য দিবালোকে একজন লড়াকু শিক্ষাবিদকে অনশন মঞ্চ থেকে অপহরণ করে তুলে নিয়ে গেছে। দিল্লির যন্তর মন্তর মিশে গেছে ভারতের মাটির শেকড়ে।
মগজধোলাইয়ের সিলেবাস প্রত্যাখান করে লড়াইয়ের পাঠক্রমে নেমে পড়েছে দেশের ছাত্র সমাজ। অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াই। কম খরচে লেখাপড়ার অধিকার, লেখাপড়ার পরিকাঠামোর জন্য সরকারি ব্যয় বরাদ্দের অধিকার, সেই বরাদ্দ সঠিকভাবে খরচের অধিকার, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশের অধিকার, ভয়মুক্ত ক্যাম্পাসের অধিকার, সঠিক মূল্যায়নের অধিকার, মানুষের মতো করে বাঁচার অধিকার। এই অধিকারবোধগুলোকে যান্ত্রিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে রাখার বহু চেষ্টা করেছে সরকার বাহাদুর। ধর্মের চাদর জড়িয়ে আড়াল করতে চেয়েছে অধিকারের ধর্মকে। নিস্তব্ধ করতে চেয়েছে ছাত্র সমাজের মূল ধর্ম— প্রশ্ন করা, জবাব চাওয়া, অনুসন্ধান, অনুসন্ধিৎসার প্রবণতাকে। লড়াইয়ের প্রবণতার ওপর আঘাত নামাতে তৈরি করেছে একের পর এক দমন পীড়নের রাস্তা। জেলের কুঠুরি বা সিলেবাসের ঘুপচি কোথাও আটকে রাখা যায়নি ভারতের ছাত্র মনের ক্ষোভকে। সেই ক্ষোভ পরিণত হয়েছে বিক্ষোভে। স্ফুলিঙ্গ পেয়ে গেছে দাবানলের ঠিকানা। মিছিল মিশে গেছে জনস্রোতে। খিদের জেদ ডাক পেয়েছে জেদের খিদের।
একেবারে সম্মুখ সমরে সরকার বনাম জনতা। দিল্লিতে সংসদ অভিযানে লাঠি, জলকামান, টিয়ার গ্যাসের মুখেও জেদী ছাত্র-জনতা আওয়াজ দিয়েছে ব্যবস্থা পালটানোর। সেই পালটানোর প্রথম ধাপ দুর্নীতিবাজ শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পালটানো। পার্লামেন্ট শিক্ষা দুর্নীতির আলোচনাকে সামনে আনা। সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করানো এই বিষয়ে। দিল্লির রাজপথে মিশে গেছে ভারতের সমস্ত প্রান্তের অলিগলি, আলপথ, রাজসড়ক। 'বাতিল' প্রজন্ম জেগে উঠেছে শিক্ষা, কাজ, আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে। দুর্নীতির মদতদাতা, হত্যাকারী, অসাংবিধানিক ব্যবস্থাটাকে বাতিল করার লড়াই। মন থেকে মন ফেরি হচ্ছে সেই অমোঘ স্লোগান— জাগো, জাগাও, জেগে থাকো।
Comments :0