Editorial on Vote

ভোটাতঙ্ক

সম্পাদকীয় বিভাগ

রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকার ও রাজ্য নির্বাচন কমিশন গোপন বোঝাপড়ার ভিত্তিতে চোর পুলিশ খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। বিগত প্রায় এক বছর ধরে নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং দিনক্ষণ নিয়ে নানা কথা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে উভয়ই ঘাপটি মেরে বসে আছে। কখনো শোনা গেছে গ্রীষ্মের দাবদাহের মধ্যে ভোটের আয়োজন না করে আগেই সেরে ফেলা হবে। অর্থাৎ শীতের শেষেই হয়ে যাবে ভোট। মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাকে এড়িয়ে কোনও এক ফাঁকে পঞ্চায়েত নির্বাচন হবে। অতঃপর শোনা গেল ভোট নাকি গরমেই হবে। আর পরে শোনা গেল শেষ পর্যন্ত বর্ষাতেই নাকি ভোট হবে। গত ছ’মাস ধরেই মানুষ অপেক্ষায় আছেন এই বুঝি ভোটের দিন ঘোষণা হবে। কিন্তু কিছুই হলো না। আচমকা সাড়ম্বরে ঘোষণা হলো মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো নাকি জেলা পরিক্রমায় বের হবেন। দু’মাস ধরে চলবে তার সেই বিলাসবহুল রাজকীয় পরিক্রমা। যুবরাজের নিরাপত্তা, দেখভাল এবং যাত্রা মসৃণ করতে ব্যস্ত থাকবে প্রশাসন ও পুলিশ। অতএব পঞ্চায়েত নির্বাচন বিশ বাঁও জলে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মুখে কুলুপ। ভুলেও কেউ নির্বাচনের কথা উচ্চারণ করছে না। কেউ জানে না কবে হবে পঞ্চায়েত নির্বাচন। আদৌ হবে কিনা সেটা নিয়েও বিস্তর সন্দেহ আছে। তবে সরকার ও শাসক দলের যা ভাবসাব তাতে আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে পঞ্চায়েত নির্বাচন না হবার সম্ভাবনাই বেশি।
সরকার এবং কমিশনের লুকোচুরির আড়ালে যে সত্যটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে সেটা হলো মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নির্বাচনের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছেন। রাজ্যবাসীর মনোভাবের পরিবর্তনের ইঙ্গিত তিনি পাচ্ছেন তাতে এই মুহূর্তে পঞ্চায়েত ভোট হলে বিরোধী শূন্য পঞ্চায়েত গড়ার আস্ফালন নিমেষে উবে যাবে। বিধানসভা নির্বাচন এবং লোকসভা নির্বাচন যেহেতু মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না তাই এই দুই ভোট ছাড়া আর কোনোরকমের ভোটে মুখ্যমন্ত্রীর সায় নেই। গণতন্ত্রের উৎকৃষ্ট উদাহরণ নির্বাচিত সংস্থা। জনস্বার্থে পরিচালিত যেকোনও সংস্থাই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠন হওয়া জরুরি। গণতন্ত্রকে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত প্রসারিত করতে হলে এভাবেই নির্বাচনকে গুরুত্ব দিতে হয়। বাম আমলে নির্বাচিত প্রতিনিধির দ্বারা গণতান্ত্রিক পরিচালন ব্যবস্থা শুধু পঞ্চায়েত-পৌরসভায় ছিল না, সম্প্রসারিত হয়েছিল স্কুল, কলেজ, পাঠাগার, সমবায়, বিশ্ব বিদ্যালয়, বিভিন্ন শিক্ষা পর্ষদ-সহ সর্বত্র। সেই প্রসারিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখন তৃণমূল জমানায় ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত। মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে সব ধরনের নির্বাচিত সংস্থা তুলে দিয়ে অনুগত জোহুজুরেদের দিয়ে চালানো হচ্ছে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের নির্বাচিত প্রতিনিধির বদলে ছাত্র সংসদের দখল দেওয়া হয়েছে দলের কর্মীদের হাতে। বিশ্ববিদ্যাতলয়, কলেজ, স্কুল পরিচালন সমিতিতেও নির্বাচন হয় না। চালায় দলীয় নেতারা। সর্বত্র সর্বক্ষেত্রে কায়েম হয়েছে দলীয় কর্তৃত্ব।
মমতা ব্যানার্জি মানুষকে ভয় পান। নির্বাচন হলে মানুষ তাঁকে ভোট দেবেন এমনটা তিনি নিশ্চিত নন। এই অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে। তাই নির্বাচন এড়িয়ে স্বৈরাচারী কায়দা ক্ষমতা হাতে রাখার কৌশল প্রয়োগ করছেন বারে বারে। এখন পঞ্চায়েত নির্বাচন হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর দলের ভরাডুবি হবে। যদি তা হয় তাহলে সামনের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না। এত বড় একটা ঝুঁকি মমতা ব্যানার্জি নেবেন না। তাই নানা অছিলায় কালবিলম্ব করে ভোট এড়াতে চাইছেন। বদলে লোকসভা ভোটে টিকে থাকার মরিয়া প্রয়াস শুরু করেছেন এখন থেকেই। ভাইপোর রাজকীয় সফর সেই লক্ষ্যেই জল মাপার পদক্ষেপ।
 

Comments :0

Login to leave a comment