দীপশুভ্র সান্যাল
আলোর উৎসব দীপাবলিতে ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করার প্রস্তুতি চলছে। অথচ সেই প্রদীপ তৈরি করেই অন্ধকারে দিন কাটছে জলপাইগুড়ির অরবিন্দ গ্রাম পঞ্চায়েতের রাহুত বাগান সংলগ্ন পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়া, বৈদ্যুতিক আলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং সরকারি সহায়তার অভাবে ক্রমশ কঠিন হচ্ছে তাঁদের জীবন। তার উপর ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে বৃষ্টির আশঙ্কায় দীপাবলির আগে প্রদীপ শুকোনো ও বাজারে পৌঁছে দেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শিল্পীরা।
পালপাড়ার প্রায় ১০০টি পরিবার মাটির হাঁড়ি, পাতিল, প্রদীপ-সহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির সঙ্গে যুক্ত। সারা বছর কাজ থাকলেও তাঁদের অধিকাংশের উপার্জনের বড় ভরসা শারদীয়া উৎসব থেকে দীপাবলির মরশুম। এই সময়ে অর্ডার অনুযায়ী প্রদীপ তৈরি করে রোদে শুকিয়ে আগুনে পোড়ানোর পর বস্তাবন্দি করে দোকানে পৌঁছে দিতে হয়। অনেক সময় পাইকাররা বাড়ি থেকেই সামগ্রী কিনে নিয়ে যান। কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকায় সময়মতো প্রদীপ শুকোনো যাচ্ছে না। বৃষ্টি হলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি লোকসানের আশঙ্কাও বাড়বে।
শিল্পীদের অভিযোগ, বাজারে একটি মাটির প্রদীপ পাঁচ থেকে সাত টাকায় বিক্রি হলেও তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে প্রতি প্রদীপে মাত্র ৫০ পয়সা পান। অন্যদিকে ট্রেকারপ্রতি প্রায় আট হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে এটেল মাটি। মাটি আনা থেকে শুরু করে প্রদীপ তৈরি, পোড়ানো ও পরিবহণ—সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে খরচ। সারাদিনের পরিশ্রমের পর সামান্য উপার্জনে সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে।
একসময় দীপাবলিতে মাটির প্রদীপের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও এখন টুনি লাইট, বৈদ্যুতিক মোমবাতি ও বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক প্রদীপের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে মাটির প্রদীপের বাজার সংকুচিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিল্পীরা। তাঁদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা পেশা হিসেবে মৃৎশিল্পকে বেছে নিতে চাইছে না। হারিয়ে যেতে বসেছে কয়েক প্রজন্মের হাতে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী শিল্প।
শিল্পীদের বক্তব্য, "বিগত সরকারের শেষ পর্বে প্রায় ১০০টি পরিবারকে ইলেকট্রিক প্লেটযুক্ত প্রদীপ তৈরির মেশিন দেওয়া হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই বহু মেশিন বিকল হয়ে পড়ে। মেশিনের বেল্ট নষ্ট হলে স্থানীয়ভাবে তা পাওয়া যায় না।" মেরামতির খরচ বহন করার সামর্থ্যও নেই তাঁদের। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দেওয়া যন্ত্রগুলিও এখন কার্যত অব্যবহৃত। পরবর্তী সময়ে মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ কিংবা আর্থিক সহায়তার জন্য প্রশাসনের তরফে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
প্রণয় পাল, দীপু পাল-সহ এলাকার মৃৎশিল্পীদের বক্তব্য, পরিবারের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচ মেটানোর পর ব্যবসায় পুনরায় বিনিয়োগের মতো অর্থ হাতে থাকে না। শিল্পী ভাতা, ঋণ ও সরকারি আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে তার সুফল তাঁরা কতটা পাচ্ছেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তাঁরা।
এই পরিস্থিতিতে পালপাড়ার শিল্পীদের জন্য সরকারি সমীক্ষা করে প্রকৃত কারিগরদের তালিকা তৈরি, নিয়মিত শিল্পী ভাতা, স্বল্পসুদে ঋণ এবং কাঁচামাল কেনার ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তার দাবি উঠেছে। সরকারি দফতর, স্কুল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মাটির প্রদীপ কেনার উদ্যোগ নিয়ে নিশ্চিত বাজার তৈরি এবং শিল্পীদের ন্যায্য মূল্য দেওয়ার ব্যবস্থাও জরুরি। পাশাপাশি বিকল মেশিন মেরামত, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, নতুন মেশিন প্রদান, বিদ্যুতে ভর্তুকি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
Comments :0