Editorial

রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ডের বিপজ্জনক ঝোঁক

সম্পাদকীয় বিভাগ

প্রাক্তন তৃণমূলী, অধুনা বিজেপি শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে রাজ্যের আরএসএস-বিজেপি সরকারের ছ’মাস কাটতে না কাটতেই তিন তিনটি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটিয়ে তিন অভিযুক্তকে হত্যা করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বীকৃত মানবাধিকার এই ঘটনায় পুরোপুরি লঙ্ঘিত হয়েছে এবং সেটা করেছে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচিত সরকার। এটা বিচারবহির্ভূত রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড ছাড়া আর কিছুই নয়। ভারতের আইন এবং সংবিধান এটা কোনোভাবেই অনুমোদন করে না।
তিন মাস আগে বারুইপুরে এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় এক অভিযুক্তকে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে ঘটনাস্থলে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। গাইঘাটায় ঠিক একই ঘরানার পুনর্নির্মাণের জন্য ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে খুন করে পুলিশ। তার কয়েক ঘণ্টা পর মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে এক বিজেপি কর্মীর খুনের অভিযুক্তকেও একইভাবে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে নিয়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই গুলি করে খুন করে পু‍‌লিশ। তিনটি ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে নিয়ে গিয়ে ঘটনাস্থলে গুলি করে খুন করে পুলিশ। তিনটি ঘটনার ক্ষেত্রেই পুলিশের কাজকর্ম হুবহু এক। তদন্তকারী অফিসার সহ অভিযুক্তকে ঘিরে থাকা পুলিশবাহিনীর কাছ থেকে নাকি অভিযুক্ত বন্দুক কেড়ে নিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করেই কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়েছে অভিযুক্ত। তখন পুলিশ নিজেদের প্রাণ রক্ষার জন্য গুলি করে তাদের খুন করেছে। পুনর্নির্মাণের জন্য কি অসতর্ক ও অদক্ষ পুলিশদেরই পাঠানো হয়? তা না হলে এত সশস্ত্র পুলিশের সামনে অভিযুক্ত এত সহজে একজনের বন্দুক কেড়ে নিয়ে পুলিশের দিকেই গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করতে পারে কীভাবে? অভিযুক্তদের কেউ বিপজ্জনক দাগী এবং অস্ত্র চালনায় দক্ষ এমনটাও শোনা যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের ভাষ্য নিয়ে সন্দেহ হতে পারে। তাছাড়া পুনর্নির্মাণের সময় বাছা হয়েছে গভীর রাত যাতে কাকপক্ষীও টের না পায় এবং কোনও সাক্ষী না থাকে। তাছাড়া সন্দেহ রয়েছে পুনর্নির্মাণের জন্য নির্ধারিত নিয়ম ও বিধি মানা হয়েছে কি না।
তিনটি ঘটনাই অতীব ভয়ঙ্কর। অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সাজা দেবার অধিকার আছে একমাত্র আদালতের। সরকার বা পুলিশকে সে অধিকার সংবিধান দেয়নি। পুলিশের কাজ সর্বোচ্চ তৎপরতায় ও দক্ষতায় তদন্ত শেষ করে যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করা যাতে আদালত দ্রুত সাজা দিতে পারে। বাস্তবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে পুলিশ নিজের কাজে অদক্ষতা ও অপদার্থতা প্রমাণ করে বিচারবহির্ভূতভাবে খুন করে সাজা দিচ্ছে। এটা দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে সরকার নিজেই সর্বশক্তিমান হবার প্রবণতা। মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্র ও বর্বরতন্ত্রে এমনটাই ছিল। শুভেন্দু অধিকারীর সরকার সেই স্বৈরাচারী বর্বরতন্ত্র ফেরাতে চাইছে। এই প্রবণতা বিচার ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা যেমন কমবে তেমনি মানুষই নিজের হাতে আইন তুলে নিতে উৎসাহী হবে। তদন্ত বা বিচারের প্রয়োজন নেই, কাউকে সন্দেহ হলেই তাকে সাজা দিয়ে দেওয়া যাবে। এটা কোনও সভ্য মানবিক সমাজের কাজ নয়। সরকারের ক্ষমতা ও দাপট দেখানোর জন্য আইনের শাসনকে পদদলিত করা যায় না। তেমন বিচারবহির্ভূত রাষ্ট্রীয় খুন করে ধর্ষণ বা নারী নির্যাতন কমানো যায় না। মনে রাখতে হবে শুভেন্দু জমানায় ধর্ষণ ও নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ বেড়েছে, কমেনি। একটা-দুটো এনকাউন্টার করে বাকি সব ঘটনার তদন্ত শিকেয় তুলে রেখে আসলে অপরাধীদের প্রশ্রয় ও মদত দেওয়া হচ্ছে।

Comments :0

Login to leave a comment