Migratory Birds

বেসরকারি স্কুলের নামে জলাভূমি ভরাট, বিপন্ন পাখিদের আশ্রয়স্থল, বাধা পরিবেশকর্মীদের

জেলা

ছবি- প্রবীর দাশগুপ্ত

দীপশুভ্র সান্যাল: জলপাইগুড়ি

শীতের আমেজ পুরোপুরি পড়ার আগেই জলপাইগুড়ি জেলার সদর ব্লকের অন্তর্গত খড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের রাখাল দেবী ভাটাখানা এলাকার বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙছে দেশ-বিদেশের নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির কিচিরমিচির শব্দে। ভাটাখানা নামটি মূলত অতীতে এই অঞ্চলে থাকা একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন ইটভাটাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে ইটভাটা সংলগ্ন জলাশয়টিতে প্রতি বছরই শীতের কয়েক মাসের জন্য আশ্রয় নেয় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। কেউ ফিরে যায় পুরনো ঠিকানায়, আবার কেউ বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে, ফোটায় ছানা। কিন্তু এবার সেই পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলই বিপন্ন। জলাশয়ের উল্টোদিকে বেসরকারি স্কুল তৈরির উদ্যোগকে ঘিরে জলাভূমি ভরাটের অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, জলাভূমির চরিত্র বদলে গেলে হয়তো আর ফিরবে না পরিযায়ী পাখির দল। অন্যদিকে উল্টো দিকের একটি জলাশয় ভরাট করার অভিযোগ রয়েছে। উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির আড়ালে হলদিবাড়ি-জলপাইগুড়ি রাস্তার ধারে প্রকাশ্য দিবালোকে জেসিবি, ট্রাক্টর-সহ বিভিন্ন যন্ত্র দিয়ে জলাভূমি ভরাট ও জমি সমান করার কাজ চলছে। আগে রাতের অন্ধকারেও ভরাটের কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ। 
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এলাকায় ‘গণশক্তি’-র সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিক পৌঁছালে স্থানীয় এক দোকানদার ছবি তুলে অন্যদের খবর দেন। বস্তুত খবর করা নিয়ে হুমকির মুখে পড়তে হয় সাংবাদিকদের। পরিবেশকর্মীদের উপস্থিতিতে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কও হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। 
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, জলাভূমি ভরাটের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে যাওয়া সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মীদের সঙ্গে এমন আচরণ কেন? উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে কি প্রতিবাদের কণ্ঠও স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে? 
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, সরকারি স্কুলের পঠনপাঠন নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। তাই এলাকায় বেসরকারি স্কুল গড়ে উঠলে শিক্ষার উন্নতি হবে, পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। অভিযোগ, স্থানীয় ক্লাব ও বাসিন্দাদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে জলাভূমি ভরাটের পক্ষে রাজি করানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু পরিবেশকর্মীদের প্রশ্ন, উন্নয়নের নামে কি জলাভূমির স্বাভাবিক চরিত্র বদলে দেওয়া যায়? জমিকে নিচু জমি বলে চিহ্নিত করলেই কি তার জলাভূমির বৈশিষ্ট্য অস্বীকার করা সম্ভব? অভিযোগ, তৃণমূলের আমলেও এই জলাশয় ভরাটের চেষ্টা হয়েছিল। তখন বিজেপির নেতারা জলাভূমি রক্ষার দাবিতে সরব হয়েছিলেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তৎকালীন বিডিও মিহির কর্মকার পুলিশ পাঠিয়ে ভরাটের কাজ বন্ধ করেছিলেন। রাজনৈতিক পালাবদলের পর একই জলাশয় ভরাটের অভিযোগে পরিবেশকর্মীদের প্রশ্ন, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার অবস্থানও কি বদলে যাচ্ছে?
বিজ্ঞানকর্মী রিতা রায় সেনগুপ্ত জানালেন, বিষয়টি নিয়ে বিএলআরও, এসডিও-সহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অভিযোগ জানিয়েও সদুত্তর মেলেনি। জলাভূমি সংরক্ষণ বিধি, ২০১৭ এবং পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার আইনের প্রযোজ্য বিধান মেনে জমির প্রকৃত শ্রেণি, চরিত্র পরিবর্তনের অনুমতি এবং ভরাটের বৈধতা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। জমির সরকারি নথিতে কী শ্রেণি রয়েছে, কোনও অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী—তা প্রকাশ্যে আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা। তাদের দাবি অবিলম্বে ভরাটের কাজ বন্ধ করে নিরপেক্ষ তদন্ত, বেআইনি কাজ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং জলাভূমি রক্ষা করে উন্নয়নের। পাশাপাশি, ফাইটো কেমিক্যালের অব্যবহৃত বিপুল জমিতেও উন্নয়নের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ না করলে জলাভূমি রক্ষায় বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন বিজ্ঞানকর্মী রিতা রায় সেনগুপ্ত। ঠান্ডা পড়ার আগেই এখানে পরিযায়ী পাখিরা চলে আসে। দেখা মেলা পাখি লেসার হুইসলিং ডাক, ব্রোঞ্জড ড্রোঙ্গো, চেস্টনাট-টেইলড স্টার্লিং, স্টর্ক-বিলড কিংফিশার এবং বিভিন্ন প্রজাতির ঘুঘুর। ভোরবেলা পাখিদের কিচিরমিচিরে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে, যা প্রকৃতিপ্রেমী ও পক্ষীবিদদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। এখন প্রশ্ন, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির আড়ালে কি হারিয়ে যাবে এলাকার প্রাকৃতিক ঐতিহ্য? শীতের সকালে কি আর শোনা যাবে পরিযায়ী পাখিদের কিচিরমিচির?

Comments :0

Login to leave a comment