editorial

দিশাহীন নৈরাজ্য

সম্পাদকীয় বিভাগ

প্রাক্তন তৃণমূলী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নরেন্দ্র মোদী কথিত ডাবল ইঞ্জিনের সরকার অর্ধ বর্ষ অতিক্রম করেছে। মাত্র ছ’মাস সময় কোনও সরকারেরই সাফল্য ব্যর্থতার মূল্যায়নের পক্ষে যথেষ্ট নয়। তেমন একটা নতুন সরকারকে মানুষ যখন ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনে তখন সে সরকারের উপর মানুষের বিস্তর আস্থা, ভরসা ও বিশ্বাস থাকে যে নতুন সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করে সমস্যা র সমাধান করবে, মানুষকে খানিকটা স্বস্তি দেবে। তাই নতুন সরকারের নীতি, দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যকলাপ নিয়ে সাধারণ মানুষ তেমন কোনও মন্তব্য করেন না, সমালোচনা তো দূরের কথা। বিরোধী দলগুলি তাদের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সমালোচনা-বিরোধিতা করলেও সাধারণ মানুষ প্রথম দু’-এক বছর নীরবই থাকেন অথবা কখনও কখনও সরকারের পক্ষে থাকেন। অতীতে দেখা গেছে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর অন্তত ১৫ বছর সাধারণ মানুষের মুখে সরকারের সমালোচনা বা নিন্দা শোনাই যায়নি। চতুর্থ বা পঞ্চম বামফ্রন্ট সরকারের সময় থেকে মৃদু মন্দ সমালোচনা শোনা যেত। শেষদিকে সেটা অনেকটাই বেড়েছে। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরও প্রথম পাঁচ বছর সররকার বিরোধী মতামত বা সমালোচনা সাধারণ মানুষের মুখে বিশেষ শোনা যেত না। দ্বিতীয় তৃণমূলী সরকারের সমালোচনা শুরু হয় এবং অচিরেই সেটা সরকার বিরোধিতার রূপ নিতে শুরু করে। তৃতীয় তৃণমূল সরকার বিরোধী মনোভাব তীব্র আকার নেয়।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে এখন। বস্তুত শুভেন্দুর সরকার শপথ নেবার পরদিন থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সরকার সম্পর্কে আশা-ভরসার জায়গাটা নিতান্ত ক্ষীণ। প্রথম থেকেই এই সরকারের কাজকর্ম নিয়ে মানুষ সন্দিহান ও দ্বিধাগ্রস্ত। তাই ছ’মাস কাটতে না কাটতেই মানুষের মোহভঙ্গ শুরু হয়ে গেছে। তারা সরকারের কাজকর্ম, অগ্রাধিকার, দক্ষতা নিয়ে সমালোচনা মুখর হচ্ছেন। আসলে চরম এক নৈরাজ্য, দুর্নীতি, চুরি, আইনের শাসনের পতন থেকে মানুষ মুক্তির জন্য মানুষ তাৎক্ষণিক বিকল্প হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন বিজেপি-কে। প্রধানমন্ত্রীর ডাবল ইঞ্জিনের আশ্বাস তাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তারা বিশ্বাস করেছিলেন বিজেপি’র প্রতিশ্রুতি বা সংকল্পপত্রে। কিন্তু এখন মানুষ কার্যত হতাশ। তারা যা আশা করেছিলেন শুভেন্দুর সরকারের মধ্যে তার কোনও প্রতিফলন নেই। পূর্বতন ও বর্তমান সরকারের মধ্যে নীতিগত, দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনাগত কোনও পার্থক্যই নেই। দুই সরকারই আসলে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
নতুন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের কথা ছিল শিল্প-বিনিয়োগে মনোনিবেশ করা, শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য, অধঃপতন, ধ্বংসকাণ্ড বন্ধ করে উন্নত পরিবেশ ফেরানো, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোরতা, নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ কমানো ইত্যাদি। কিন্তু তা না করে গোড়া থেকে সরকার ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বিভাজনে জোর দিয়েছে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, বাক্‌-স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় গুরুতর হস্তক্ষেপ শুরু করেছে। শার‍‌দোৎসবকেও ধর্মীয় বিভাজনে কলঙ্কিত করেছে। কথায় কথায় ধর্মকে সরকারি কাজে যুক্ত করা হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে এটা হিন্দুদের সরকার। গোটা শারদোৎসবকে বই বিরোধী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে রূপান্তরিত করেছে গুন্ডাদের রাস্তায় নামিয়ে, শিক্ষা-বই’র সঙ্গে যাদের কোনও সম্পর্ক নেই।
এমন এক আবহে শুভেন্দুর সরকার আর শমীকের বিজেপি দুই মেরুতে। মাঝখানে বেকায়দায় আরএসএস। সরকারের উপর রাজ্য বিজেপি’র রাজ্য আরএসএস’র নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না। গোটা শাসক এখন আদি বিজেপি ও নব্য বিজেপি-তে ভাগ হয়ে গেছে। নব্য বি‍‌জেপি মানে তৃণমূলের প্রাক্তনী। ডাবল ইঞ্জিনের স্টিয়ারিং আপাতত এদেরই হাতে। শুভেন্দুই এদের নেতা। তৃণমূলী ঘরানায় তৈরি হওয়া নেতা যদি ডাবল ইঞ্জিনের চালক হয় তাহলে যা হবার তাই হচ্ছে। এভাবে চললে দ্বন্দ্ব এতটাই প্রকট হয়ে উঠবে যে চালক বদল অনিবার্য না হয়ে ওঠে।

Comments :0

Login to leave a comment