editorial

বইয়ের জন্যে হাঁটুন

সম্পাদকীয় বিভাগ

এই একবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমবাংলার বুকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের কিছু মনুষ্য প্রজাতির আবির্ভাব ঘটেছে। এতদিন এরা কোন অন্ধকার গুহায় থাকতো কারও জানা নেই। প্রাক্তন তৃণমূলী শুভেন্দুর নেতৃত্বে রাজ্যে আরএসএস-বিজেপি’র সরকার গঠনের পর থেকেই এই অন্ধকারের জীবরা সুড়সুড় করে গর্ত থেকে বেরোতে শুরু করেছে। এই বিশেষ প্রজাতির মানুষরা মুখে জয় শ্রীরাম ধ্বনি দেয়, দেশ প্রেমের ও দেশ রক্ষার কথা বলে। আবার নিজেদের সনাতনী বলেও জাহির করে। বই কি জিনিস, ওটা কি কাজে লাগে এদের কেউ সম্ভবত বলে দেয়নি বা বুঝিয়ে দেয়নি। তাই শেখার জন্য, বোঝার জন্য, চিন্তা-চেতনার মান উন্নত করার জন্য, জ্ঞান অর্জনের জন্য যে বই পড়তে হয় সেই বোধ এদের হয়নি। বিদ্যান, জ্ঞানী-গুণী মানুষ, চিন্তাশীল ও মননশীল মানুষের জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে বই‍‌য়ের মাধ্যমে। তাঁরা লেখেন, ছাপাখানা সেটা ছাপায়, প্রকাশ করা, প্রকাশ করে বিক্রেতারা পাঠকের কাছে বিক্রি করে। পাঠক বা ক্রেতা সেগুলি পড়েন। সদ্য উদয় হওয়া এই মানুষরা এসবের কোনও কিছুই জানে না। কে বা কারা এদের মগজে জ্ঞানান্ধের মাদক ভর্তি করে দিয়েছে। দম দেওয়া পুতুলের মতো এরা শেখানো বুলি অনর্গল আউড়ে যায়। যা নির্দেশ দেয় সেটাই অন্ধের মতো পালন করে। 
এই বিশেষ প্রজাতির মনুষ্যকুলই এবারের শারদোৎসবকে বই ধ্বংসের উৎসবে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। এই স্বঘোষিত সনাতনী ভক্তরা তাদের গুরুর নির্দেশে রাজ্যজুড়ে বুক স্টলে (সিপিআই(এম) সহ বামপন্থীদের) হামলায় মেতে উঠেছিল। কখনও প্রকাশ্যে বা কখনও রাতের অন্ধকারে, দুর্গা মণ্ডপের আশেপাশের জনবহুল এলাকায় তৈরি হওয়া অস্থায়ী বুক স্টলগুলি ছিল এই গন্ডাদের টার্গেট। লাঠি, রড সহ সশস্ত্র তাণ্ডব চালায় স্টলে স্টলে। নিজেদের সনাতনী বলে পরিচয় দিয়ে সোল্লাসে ভে‍‌ঙে লন্ডভন্ড করে স্টল। বই ছিঁড়ে, ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পায়ের তলায় পিষে সোল্লাসে নৃত্য করে। স্টলকর্মীদের হেনস্তা, গালিগালাজ, মারধর কোনও কিছুই বাদ যায়নি। বই ধ্বংসে এসে কি বীভৎস আনন্দ। বই প্রেমী সাধারণ মানুষ ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছেন না মনুষ্যরূপী এই অমানুষরা এতদিন ছিল কোথায়?
রাজ্যের শাসক দলের কর্তা বলে দিয়েছেন এদের সঙ্গে দলের যোগ নেই। একমন্ত্রী তো লজ্জায় মাথা হেঁট করেছেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী নিন্দা করা তো দূরের কথা ক্রমাগত স্টলে হামলায় উসকানি দিয়ে গেছেন। এমনকি জায়গায় জায়গায় পুলিশ নিজেরাই গেছে স্টল ভাঙতে। কলকাতায় তো স্টল ভাঙতে পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল বুলডোজার। আর বই ফেলতে নিয়ে গিয়েছিল কর্পোরেশনের আবর্জনা ফেলার গাড়ি। মুখ্যমন্ত্রী একবারও বারণ করেননি। বোঝাই যাচ্ছে পুলিশ সরকারি নির্দেশে কাজ করছে। তেমনি যে গুন্ডাবাহিনী স্টলে হামলা চালি‍‌য়েছে তারা বেশির ভাগ জায়গায় বলেছে সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীর কথায় উৎসাহিত হয়ে একাজ করছে। সরকারি মদতে এবং দলের মদতে যে একাজ হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। যদি না হতো তাহলে দল কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতো গুন্ডাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার। তেমনি সরকার নিজেই গুন্ডাদের গ্রেপ্তার করে জেলে পুরতো, কিছুই করেনি। উলটে পুলিশ পাঠি‍‌ছে স্টল ভাঙতে। সরকার ও শাসক দলের এহেন আচারণ, স্বঘোষিত সনাতনী ও দেশপ্রেমী গুন্ডাদের নির্ভয়ে মহানান্দে গুন্ডামি স্তম্ভিত করেছে রাজ্যে শিক্ষাদরদি ও বইপ্রেমী মানুষকে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তারা কার্যত বাক্‌রুদ্ধ। এই মানুষরাই এবার এগিয়ে এসেছেন, প্রতিবাদে মুখর হচ্ছেন। বৃহত্তর নাগরিক সমাজে বিশিষ্টজনেরা সহমতের ভিত্তিতে আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিবাদের। ডাক দিয়েছেন বইয়ের জন্য হাঁটুন। বই পাড়ায় বই প্রেমীরা আসবেন বইয়ের শত্রুদের বিরুদ্ধে পা মেলাতে।

Comments :0

Login to leave a comment