দীপশুভ্র সান্যাল: জলপাইগুড়ি
ধর্ম আলাদা, কিন্তু উৎসবের আনন্দ এক। কেউ পুজোর আয়োজন করছেন, কেউ মেলা বসানোর কাজে ব্যস্ত, আবার কেউ অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এভাবেই হিন্দু-মুসলিম, দুই সম্প্রদায়ের যৌথ উদ্যোগে ১০২ বছরে পা দিল জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের গড়ালবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের শোভার হাটের সেরুপাড়ার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ও মেলা। ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের যে ঐতিহ্য তাঁরা বহন করে চলেছেন, তা আজও বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর পঙ্ক্তি, ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ’— সেরুপাড়ার এই উৎসব যেন সেই মানবিক দর্শনকেই বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এখানে উৎসব কোনও একটি সম্প্রদায়ের একার নয়, বরং এলাকার মানুষের সম্মিলিত আবেগ, ভালোবাসা ও ঐতিহ্যের মিলনমেলা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, জমিদারি প্রথার সময়ে এই মেলা চালু হলেও তার অবসানের পর প্রায় ৪৫-৫০ বছর ধরে পুজো ও মেলার যাবতীয় দায়িত্ব সামলে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পুজো কমিটির সহসভাপতি মফিদার রহমান জানান, পুজো ও মেলার প্রায় ৮০ শতাংশ কাজই করেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। অন্যদিকে, কমিটির সভাপতি রঞ্জিত হালদার জানান, এই উৎসবকে ঘিরে কর্মসূত্রে বাইরে থাকা যুবকেরা যেমন বাড়ি ফেরেন, তেমনই বিবাহিত মেয়েরাও বাপের বাড়িতে ফিরে মিলিত হন পরিবারের সঙ্গে। ফলে পুজো ও মেলা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকে না, হয়ে ওঠে সামাজিক বন্ধন অটুট রাখার অন্যতম উপলক্ষ।
তিন দিন ধরে চলা এই মেলায় বসবে ভাওয়াইয়া পালাগানের আসর, আয়োজন করা হবে নৃত্য প্রতিযোগিতারও। জলপাইগুড়ি ছাড়াও কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার এবং সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু মানুষের সমাগম ঘটে এই উৎসবে। লোকসংস্কৃতি, পারিবারিক মিলন এবং দুই সম্প্রদায়ের সম্মিলিত অংশগ্রহণে মেলার পরিসরও ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে।
Comments :0