নতুনপাতা
শারদ ১৪৩৩
গল্প : ফ্যানদার পুজো ডিউটি : এক স্ট্যান্ড ফ্যানের জবানবন্দি
সায়ন সরকার
২১ অক্টোবর ২০২৬ - ৪র্থ বর্ষ
আমার নাম ফ্যানদা। সারা বছর গুদামে পড়ে থাকি, আর দুর্গাপুজোর চার দিন প্যান্ডেলে ডিউটি করি। আমার কাজ হাওয়া দেওয়া। কিন্তু গত বছরের পুজোর পর বুঝেছি, হাওয়া দেওয়া সহজ, মানুষ সামলানো কঠিন!
সকাল থেকেই প্যান্ডেলে ভিড়। আমাকে চালু করতেই হাওয়া ছড়িয়ে পড়ল। এমন সময় হাজির হলো তেরো বছরের এক ভলান্টিয়ার। গলায় ব্যাজ, হাতে বাঁশি, মুখে এমন গাম্ভীর্য—মনে হলো, দুর্গাপুজো নয়, রাষ্ট্রপুঞ্জের সম্মেলন চলছে!
এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, জুতো কোথায় রাখব?ছেলেটা বাঁশি বাজিয়ে বলল, “নিয়ম মেনে উত্তর দিকে যান!”“উত্তরে তো নর্দমা!”“তাহলে দক্ষিণে যান!”“দক্ষিণে খাবারের দোকান!”ছেলেটা বিরক্ত হয়ে বলল, “কাকু, আপনি জুতো রাখতে এসেছেন, না আমার ভৌগোলিক জ্ঞান পরীক্ষা করতে?”আমি মনে মনে বললাম, বাহ! বয়স তেরো, কিন্তু ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছে একাধিক সরকার চালিয়ে এসেছে! দুপুরে এক যুবক আমার সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধুকে বলল, “এমন ছবি তুলবি, যেন আমি পুজো উপভোগ করছি, কিন্তু মনে গভীর কষ্ট!” বন্ধু ছবি তুলল। যুবক দেখে বলল, “না না! হাসিটা বেশি হয়ে গেছে। একটু দুঃখী কর!” পাশ থেকে ভলান্টিয়ার বলে উঠল, “দাদা, একটু সরুন। পিছনে লাইন!” যুবক গম্ভীর মুখে বলল, “ভাই, একটা শেষ ছবি!” ছেলেটা জবাব দিল, “শেষ ছবি বলে কিছু নেই। এখানে সবাই শেষ ছবি তুলতে তুলতেই লাইন শেষ করে দিচ্ছে!”আমি হাওয়া দিলাম। যুবকের চুল উড়ে এমন অবস্থা হলো, যেন দুঃখের বদলে মাথায় ঝড় উঠেছে। সন্ধ্যায় এক প্রেমিক প্রেমিকাকে বলল, “তোমার জন্য আমি পৃথিবী উল্টে দিতে পারি!” মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে বলল, “সত্যি? তাহলে চলো, মটন রোল খাই!” ছেলেটি পকেট হাতড়ে বলল, “আসলে পৃথিবী উল্টে দেওয়ার কথা বলেছি, পকেট নয়!” মেয়েটি বলল, “তাহলে ফুচকা?” “এক প্লেট ভাগ করে খাব?” “ভালোবাসাও ভাগ, ফুচকাও ভাগ?” ভলান্টিয়ার পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল, “দাদা, প্রেম করুন, কিন্তু রাস্তা আটকে নয়!” প্রেমিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভালোবাসার পথে এত বাধা!” আমি মনে মনে বললাম, বাধা প্রেমে নয় ভাই, বাধা তোমার ব্যালান্সে! রাতে ভিড় আরও বাড়ল। ভলান্টিয়ার চেঁচাচ্ছে, “লাইন ভাঙবেন না! নিয়ম সবার জন্য সমান!” ঠিক তখনই তার এক বন্ধু দড়ি টপকে ঢুকে পড়ল। এক ভদ্রলোক বললেন, “এই যে, তোমার বন্ধু লাইন ভাঙল কেন?” ছেলেটা বুক ফুলিয়ে বলল, “ও বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত!” “অনুমতি দিয়েছে কে?” এক মুহূর্ত না ভেবে উত্তর, “আমি!” ভদ্রলোক বললেন, “তুমি কে?” ছেলেটা গম্ভীর হয়ে বলল, “আমি ভলান্টিয়ার!” ভদ্রলোক মাথা নেড়ে বললেন, “বুঝলাম। নিজের বাড়ির চাবি থাকলে এবার থেকে নিজেকেই বাড়ির মালিক ভাববে!” প্রথমবারের মতো ভলান্টিয়ারের মুখের ভাষা হারিয়ে গেল। আহা! এতক্ষণে প্যান্ডেলে সত্যিকারের অলৌকিক ঘটনা ঘটল! রাত শেষে কমিটির সম্পাদক অন্য সদস্যকে বললেন, “এ বছরের সেরা ভলান্টিয়ার কাকে দেওয়া যায় বলো তো?” একজন বললেন, “ওই ছেলেটাকে দাও। চার দিন ধরে খুব দাপট দেখিয়েছে!” আরেকজন বললেন, “দাপট দেখিয়েছে, না লোকজনকে জ্বালিয়েছে?” সম্পাদক হেসে বললেন, “তা ঠিক! বরং ফ্যানটাকেই দিই। চার দিন ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে হাওয়া দিয়েছে। একবারও পালায়নি!” আমি মনে মনে চেঁচিয়ে উঠলাম, আরে! আমি তো পালাতে চাইনি এমন নয়, আমার পা থাকলে তো পালাতাম রে হতভাগা! কমিটির লোকেরা হাসতে হাসতে আমার সামনে পুরস্কারটা রেখে দিলেন। আমি মনে মনে বললাম, পুরস্কার তো দিলেন, এবার কেউ কি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন? সুইচ বন্ধ হলো। অন্ধকার নামল।
শেষবার ভাবলাম, মানুষকে ঠান্ডা রাখা আমার কাজ। কিন্তু এই প্যান্ডেলে চার দিন কাটিয়ে আমার নিজেরই মাথা গরম! আগামী বছর আবার আসব। তবে কমিটির কাছে একটাই আবেদন—আমাকে ফ্যান হিসেবেই রাখবেন, ভলান্টিয়ারদের ট্রেনিং সেন্টার বানাবেন না!
দ্বাদশ শ্রেণী
কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ, উত্তর ২৪ পরগনা, পাতুলিয়া
Comments :0