বিশ্বজুড়ে অতি দক্ষিণপন্থার শক্তি বৃদ্ধি এবং অনেক দেশে তাদের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের যুগে তাদের অশ্বমেধের ঘোড়া থামিয়ে দিয়েছেন ব্রাজিলের শ্রমিক-কৃষক এবং নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট মিডিয়া এবং আমেরিকার মালিকানাধীন ‘মেটা’ নিয়ন্ত্রিত সোশাল মিডিয়ার ঝোড়ো প্রচার ও পূর্বাভাসকে মিথ্যা ও সচেতন নির্মাণ প্রমাণ করে দিয়ে ব্রাজিলের মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছেন রক্ষণশীল বা অতি দক্ষিণপন্থীরা সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার নিত্য যন্ত্রণা লাঘব করতে পারে না। তাই তারা আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছে বামপন্থীদের ওপরই। চতুর্থবারের জন্য রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচন করেছেন লুইস ইনাসিও লুলা দ্য সিলভাকে। পরাজিত করেছেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোসর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু জেলবন্দি জাইরে বলসোনারোর পুত্র ফ্লাবিও বলসোনারোকে। ফ্লাবিও নিজেও ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তথা ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোরতর বিরোধী লুলাকে হারানোর জন্য ট্রাম্প এবং মার্কিন কর্পোরেট কম পরিশ্রম করেনি। আর্থিক সাহায্যও পাঠিয়েছিল অকাতরে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। শেষ হাসি হেসেছেন লুলাই।
একই সময়ে ইউরোপের বুকে সার্বিয়ার নির্বাচনে দুনিয়াকে চমকে দিয়ে ক্ষমতাসীন অতি দক্ষিণপন্থীদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন সে দেশের মানুষ। বস্তুত দেশে ছাত্র-যুবকে সামনে রেখে গত দেড়-দু’বছর ধরে গড়ে ওঠা আন্দোলনের জোয়ারে কার্যত ভেসে গেছে আলেকজান্ডার ভুচিচের সরকার। তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো ইউরোপের দেশে দেশে, বিশেষ করে ফ্রান্সে ছাত্র সমাজের আন্দোলনের তীব্রতা যে নতুন যুগের বার্তা দিচ্ছিল তারই একটা নমুনা দেখা গেল সার্বিয়ায়। অতি দক্ষিণপন্থীদের প্রভাব বাড়লেও নতুন প্রজন্ম তাদের সমর্থন করছে না। সর্বত্রই লক্ষ্য করা যাচ্ছে রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থী এবং অতি দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠছে নতুন প্রজন্ম। বুর্জোয়া উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যতই প্রত্যাশা জাগানো হোক না কেন পুঁজিবাদী সঙ্কট যে সামলানো যায় না তার প্রমাণ রয়েছে সব দেশেই। বেকারি বৃদ্ধি, রোজগারের সঙ্কট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষার অবনমন ছাত্র-যুব সমাজের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা। তাই দেশে ছড়াচ্ছে ছাত্র-যুব বিক্ষোভ প্রতিবাদ।
বিপরীতে আন্দোলন দমন করতে গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বাড়ছে দমন পীড়ন। বাড়ছে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ত প্রবণতা। ব্রাজিলেও লুলার জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল নতুন প্রজন্মের। নতুন প্রজন্ম উপলব্ধি করছে বুর্জোয়া গণতন্ত্র উদার গণতন্ত্রের নামে যে অর্থ ব্যবস্থা ও শাসন ব্যবস্থা চলছে তাতে মানুষের অর্জিত অধিকার সঙ্কুচিত হচ্ছে। শ্রম শোষণ বাড়ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কমছে। রুজির অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সর্বোপরি বাড়ছে আয় ও সম্পদ বৈষম্য। এর বিরুদ্ধে সর্বত্র সক্রিয় প্রতিবাদ বিক্ষোভ বাড়ছে ছাত্র-যুবদের উদ্যোগে। নেপালে ও বাংলাদেশে এরাই অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকারের পতন ঘটিয়েছে।
ভারতেও সাম্প্রতিককালে ছাত্র-যুবদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ বাড়ছে। অতি দক্ষিণপন্থী মোদী সরকারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন আন্তর্জাতিক বাস্তবতার অঙ্গ। ব্রাজিল ও সার্বিয়ায় অতি দক্ষিণপন্থীদের পরাজয় ভারতে চলমান নতুন প্রজন্মের আন্দোলনে নতুন অনুপ্রেরণা ও উপাদান জোগাবে।
Editorial
আশার আলো
×
Comments :0