INDIA

তেরঙ্গায় ঢাকা রামলীলা আজ দেশ বাঁচানোর মঞ্চ

জাতীয়

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে ইন্ডিয়া মঞ্চের ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচি। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) ঘিরে অনিয়ম এবং বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে পথে নেমেছে বিরোধী শিবির। কংগ্রেস, তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি, সিপিআই(এম), সিপিআই-সহ বিরোধী দলগুলির নেতা-কর্মীদের জমায়েতে সরগরম রাজধানী। একদিকে রাজনৈতিক প্রতিবাদ, অন্যদিকে জনসমাগম সামলাতে নজিরবিহীন নিরাপত্তার আয়োজন। বিরোধীদের দাবি, এই লড়াই শুধু ভোটার তালিকার অনিয়মের বিরুদ্ধে নয়, দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার ও নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা রক্ষার লড়াই।
রবিবার সকাল থেকেই দিল্লির রামলীলা ময়দানের দিকে মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিরোধী দলগুলির কর্মী-সমর্থকরা মিছিল করে সমাবেশস্থলে পৌঁছন। কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, কারও হাতে দলীয় পতাকা। এসআইআর-এর বিরুদ্ধে স্লোগান, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি এবং ‘ভোট চুরি’ বন্ধ করার আওয়াজে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। শুধু দিল্লি নয়, বিভিন্ন রাজ্য থেকেও বিরোধী দলগুলি তাদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে রাজধানীতে হাজির হয়েছে।
এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্বও একজোট হয়েছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে প্রথমে জড়ো হন কংগ্রেসের প্রাক্তন সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধি, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, সিপিআই-এর সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা এবং সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য-সহ একাধিক বিরোধী নেতা।
খাড়গের বাসভবন থেকে একটি খোলা বাসে চেপে নেতারা রওনা দেন মিন্টো রোডের দিকে। সেখান থেকেই হবে পদযাত্রা। পদযাত্রার শেষ গন্তব্য রামলীলা ময়দান। সেখানে বিরোধী জোটের মহাসমাবেশে বক্তব্য রাখবেন শীর্ষ নেতারা।
বিরোধীদের এই কর্মসূচিকে ঘিরে রামলীলা ময়দানে তৈরি হয়েছে বড়সড় পরিকাঠামো। মূল মঞ্চের উপর বসানো হয়েছে বিশাল তেরঙ্গা রঙের ছাউনি। সেখানে থাকবেন বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব। পাশাপাশি ইন্ডিয়া মঞ্চের বিভিন্ন রাজ্য শাখার প্রতিনিধিদের জন্য তৈরি করা হয়েছে আলাদা মঞ্চ।
মাঠজুড়ে সারি সারি সাদা ছাউনি, অস্থায়ী মঞ্চ এবং নিরাপত্তার জন্য ধাতব ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা প্রবেশপথ ও নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণির অংশগ্রহণকারীদের জন্য পৃথক প্রবেশপথ ও বসার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা করেছে আয়োজকরা।
সমাবেশে আসা মানুষের জন্য পানীয় জলের ব্যবস্থা, মহিলাদের জন্য পৃথক শৌচাগার এবং স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যানবাহন পার্কিংয়ের বিষয়েও ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সমাবেশস্থলে রাত কাটানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি।
সমাবেশে কত মানুষের জমায়েত হবে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে জল্পনা। ইন্ডিয়া মঞ্চের দাবি, এই কর্মসূচিতে ১০ লক্ষ পর্যন্ত মানুষের সমাগম হতে পারে। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশের অনুমান, উপস্থিতির সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারের কাছাকাছি থাকতে পারে। মাঠের বাইরে অতিরিক্ত মানুষের জন্যও জায়গা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিরোধীদের এই কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে বিভিন্ন রাজ্যে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে দাবি ইন্ডিয়া মঞ্চের।
এই অভিযোগকে সামনে রেখেই ‘ভোট চুরি’র বিরুদ্ধে দেশজুড়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছে বিরোধী জোট। তাদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে কোনও যোগ্য নাগরিকের নাম বাদ পড়া শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর সরাসরি আঘাত।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। তাদের দাবি, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার দায়িত্ব যার, তার বিরুদ্ধেই পক্ষপাতিত্ব ও অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। সেই কারণেই তার পদত্যাগ দাবি করে এই মিছিল ও সমাবেশ।
রবিবারের মহাসমাবেশের আগে শনিবার আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে ইন্ডিয়া মঞ্চ। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে আয়োজন করা হয় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রতীকী ‘জন-ইমপিচমেন্ট’ বা জনতার অভিশংসন কর্মসূচি।
এই প্রতীকী প্রক্রিয়ায় সভাপতিত্ব করেন লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার মীরা কুমার। খাড়গে সেখানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগগুলি তুলে ধরে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। পরে রাহুল গান্ধী বক্তব্য রাখেন। এরপর সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
বিরোধীদের এই কর্মসূচির রাজনৈতিক তাৎপর্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সংসদ এবং সংসদের বাইরে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধীদের সঙ্গে শাসক দলের সংঘাত চলছে। এবার সেই বিতর্ককে সরাসরি জনতার দরবারে নিয়ে যেতে চাইছে ইন্ডিয়া মঞ্চ।
উল্লেখ্য এই কর্মসূচিকে কেবল রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না ইন্ডিয়া মঞ্চ। ছাত্র, যুব, মহিলা, শ্রমিক এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের সদস্যদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনও এই কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
বিরোধীদের বক্তব্য, ভোটাধিকার কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। এটি প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। তাই ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কোনও যোগ্য নাগরিকের নাম বাদ পড়লে তার প্রতিবাদে সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।
সব মিলিয়ে, রবিবারের ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচি বিরোধী রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ জমায়েত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অন্যদিকে ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বার্তা এই দুই বিষয়কে সামনে রেখেই রামলীলা ময়দানে শক্তি প্রদর্শন করছে ইন্ডিয়া মঞ্চ। এই আন্দোলন আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত রাজধানীর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটি প্রশ্ন ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার কতটা সুরক্ষিত?

Comments :0

Login to leave a comment