কলকাতা বন্দরের জমিতে তারাতলায় যে বেআইনি গুদামের শেড নির্মাণে দুর্ঘটনায় ১৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে তার দায় নির্ধারণে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী খুবই তৎপরতা দেখাচ্ছেন। কলকাতা কর্পোরেশনের ঘুঘুর বাসার দিকে তিনি আঙুল তুলেছেন এবং পুলিশও সঙ্গে সঙ্গেই প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিককে গ্রেপ্তার করেছে। শুধু তাই নয়, কলকাতা ও আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাণিজ্যিক নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য সরকার নাকি সব নির্মাণ কাজ খতিয়ে দেখে তারপরে সেগুলির বাস্তবায়ন করতে দেবে। বৈধ প্ল্যান এবং তার অনুমোদন ব্যতিরেকেই যে বহু নির্মাণ কাজ হয়েছে এবং তার জন্য দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা কলকাতা শহরের বুকেই বারবার ঘটেছে তা কারো অজানা নেই। কলকাতা পৌর কর্পোরেশন নিঃসন্দেহে এক্ষেত্রে দায় এড়াতে পারে না। কিন্তু শুধু কলকাতা কর্পোরেশন নয়, কলকাতা বন্দরেরও অবগতিতে এবং প্রশ্রয়েই তারাতলার দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রী কলকাতা কর্পোরেশনের ‘কালী’ পর্যন্ত হাত বাড়িয়েছেন, কিন্তু তার ওপরে পূর্বতন শাসকের মাথাদের দিকে তিনি হাত বাড়াবেন কিনা সন্দেহ এখনও রয়েই গেছে। একইসঙ্গে বন্দরের জমিতে বেআইনি কারবারের রমরমা নিয়ে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের জড়িত থাকার বিষয়টিকে তিনি আড়াল করতে চাইছেন কিনা সেই প্রশ্নটিও সঙ্গত হয়ে উঠেছে।
তারাতলায় যে প্লটে গুদামের নির্মীয়মাণ শেড ভেঙে ১৭জনের মৃত্যু ঘটেছে এবং অনেকে আহত হয়েছেন সেখানে বেআইনি নির্মাণের কথা কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষেরও অজানা ছিল না। কিন্তু তারাও কোনও দায়িত্ব পালন করেনি। দুর্ঘটনার পরে এখন তদন্তের অনেক ভণিতা করা হলেও বাস্তবে এই বেআইনি নির্মাণের কথা আগেই কলকাতা বন্দরের চেয়ারম্যান, কেন্দ্রীয় সরকারের বন্দর ও জাহাজ মন্ত্রকের আন্ডার সেক্রেটারিকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন সিআইটিইউ নেতা সরফরাজ আলম। কলকাতা ডক লেবার বোর্ড ওয়ার্কমেন্স ইউনিয়নের সভাপতি এবং বন্দর এলাকায় বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা এই প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব গত ফেব্রুয়ারি মাসেই তথ্যের অধিকার আইনে তারাতলার দুর্ঘটনাস্থলের জমিতে নির্মাণ কারা করছে, কাদের জমির লিজ দেওয়া হয়েছে, এনওসি দেওয়া হয়েছে কিনা এসব জানার জন্য প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু তথ্যের অধিকার আইনে তাঁকে কোনও জবাব দেওয়া হয়নি। কলকাতা বন্দরের এস্টেট ম্যানেজার তাঁকে নির্মাণ কাজ সংক্রান্ত এনওসি দেওয়া হয়েছে কিনা এবং এই সংক্রান্ত কোনো তথ্য দিতে অস্বীকার করেন। এরপর গত ১১ মে কলকাতা বন্দরের চেয়ারম্যান এবং বন্দর ও জাহাজ মন্ত্রকের আন্ডার সেক্রেটারিকে চিঠি লিখে সরফরাজ আলম জানান, যে ঠিকাদারকে নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে কলকাতা বন্দরের জমিতে কংক্রিটের নির্মাণ করে বেআইনি পার্কিং ব্যবসা চালানোর অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এমন একজন ব্যক্তিকে বন্দরের জমিতে নির্মাণের অনুমতি দেওয়া উদ্বেগজনক, বন্দরের অবিলম্বে নজরদারি চালানো উচিত। তদন্ত এবং বৈধতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত ঐ নির্মাণ বন্ধ রাখা হোক। কিন্তু ইউনিয়নের এইসব দাবিতে বন্দর কর্তৃপক্ষও কর্ণপাত করেনি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কলকাতা কর্পোরেশনের মতো কলকাতা বন্দরেও যে ‘কালী’রা রয়েছেন তাঁদের অপরাধ লঘু হতে পারে কি?
রেল কর্তৃপক্ষের মতোই বন্দরের উন্নয়নের জন্য কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট বিপুল পরিমাণ জমি নিয়েছিল। বন্দরের উন্নয়নমূলক কাজে সেই জমি ব্যবহারের বদলে বন্দর কর্তৃপক্ষ বেসরকারি ও কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে লিজে জমি দিয়ে টাকা আয় করতে নেমেছে। রেল এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষও এই কাজ করছে। হকারদের উচ্ছেদ করে বড় ব্যবসায়ীদের লিজে জমি দিয়ে শপিং মল করাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের লিজে বণ্টনের জন্য কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে জমি দেওয়া হয়নি। তাছাড়া জমি লিজে দিলেই দায় শেষ হয় না। সেই জমিতে বেআইনি নির্মাণ হচ্ছে কিনা সেটা দেখাও বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কোনোটাই তারা করেনি। কাজেই তারাতলার দুর্ঘটনা জমি নিয়ে অপরাধচক্রের কাজের ফল, এর দায় কলকাতা কর্পোরেশন এবং কলকাতা বন্দর কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না।
Editorial
তারাতলার দায় নিতে হবে
×
Comments :0