Post Editorial

বিজেপি সরকারের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি

সম্পাদকীয় বিভাগ

মালিনী ভট্টাচার্য

‘জলস্পর্শ করব না আর চিতোর রানার পণ/ বুঁদির কেল্লা মাটির পরে থাকবে যতক্ষণ’—পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার এখন যা অবস্থা তাতে এখানে যে কোনও বুঁদির কেল্লা ভাঙা শাসকদলের কাছে মাটির কেল্লা ভাঙার মতোই সোজা। তবু নানা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী এ রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তন করাকেই সেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আবার দেখা যাচ্ছে তথাকথিত ‘গুন্ডাদমন বিল’ বা ‘ওবিসি সংরক্ষণ বিলে’র চাইতে এর জন্য সরকার অনেক বেশি আঁটঘাট বাঁধার প্রয়োজন মনে করছে। জানা যাচ্ছে, মন্ত্রীসভায় বিল অনুমোদিত হবার পরেও একটি কমিটি তৈরি করে তার সুপারিশের ভিত্তিতেই এটি বিধানসভায় পাশ করানো হবে। 
আগে থেকেই বলে দেওয়া হচ্ছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির ক্ষেত্রে এ বিল কার্যকরী হবে না। অবশ্য বিলটির উদ্দেশ্য যদি হয় বিভিন্ন পারিবারিক আইনের আওতায় থাকা মেয়েদের সম-অধিকার সুনিশ্চিত করা তাহলে শুধু আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির মেয়েরাই বা তা থেকে বঞ্চিত থাকবেন কেন এ প্রশ্নের কোনও উত্তর এখন অবধি পাওয়া যায়নি। ইতিপূর্বে দেশের তিনটি রাজ্যে বিজেপি সরকার অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করে দিয়েছে। রাজ্যগুলি হলো উত্তরাখণ্ড, গুজরাট ও অসম। সেখানে একটি সাধারণ বিষয় উঠে এসেছে। তা হলো সব সম্প্রদায় ও আদিবাসী ছাড়া সব জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে পুরুষদের একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ করা। 
আমাদের দেশের নারী আন্দোলনে একেবারে গোড়া থেকেই মেয়েরা এ দাবি করে এসেছেন, এতে আপত্তির কিছু নেই। বর্তমানে আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে কয়েকটি ছাড়া শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত মানুষই শরিয়তি আইন মোতাবেক একাধিক বিবাহ করতে পারেন। কিন্তু এ রাজ্যে (হয়তো সারাদেশেই) তাঁদের সমাজেও একাধিক বিবাহের রেওয়াজ নিজে থেকেই প্রায় অবলুপ্ত হয়েছে, গোদি-মিডিয়া যতোই না কেন সাজানো নমুনা দাঁড় করানোর চেষ্টা করুক। অন্য অনেক মুসলিম-প্রধান দেশের মতো এদেশেও বহুবিবাহ যদি আইনত নিষিদ্ধ হয় তাহলে ভারতীয় মুসলিম পুরুষদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে এমনটা নাও হতে পারে। অন্যদিকে সম্প্রদায় নির্বিশেষে আজও পুরুষদের মধ্যে এক স্ত্রীকে পরিত্যাগ করে আরেক সংসার শুরু করার প্রবণতা বিশেষ কমেনি। সেখানে শরিয়তি আইনের কোনও ভূমিকা নেই। তা হলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রভাবে অন্য রাজ্যগুলিতে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান স্বামী-পরিত্যক্ত স্ত্রীর সংখ্যা কমছে কিনা এ প্রশ্ন তোলার অধিকার নিশ্চয়ই আমাদের আছে।
শাসকের সদিচ্ছা থাকলে কিন্তু অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দিকে না গিয়েও সম্প্রদায় নির্বিশেষে প্রযোজ্য কিছু চালু আইনকে আরও জোরদার করে, তার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে এবং মেয়েদের জন্য আইনি সহায়তা সুনিশ্চিত করে তাদের উপরোক্ত বিপদ থেকে অনেকটা বাঁচানো যেত। যেমন, বিশেষ বিবাহ আইন (১৯৫৪), পণপ্রথা নিবারক আইন (১৯৬১) এবং গার্হস্থ্য হিংসা নিবারক আইন (২০০৫)। ড্যানিয়েল লতিফির মতো বিশিষ্ট আইনজীবী জানিয়েছেন, রাজীব গান্ধী মুসলিম মহিলা আইন চালু করার পরেও তৎকালীন দণ্ডবিধির সম্প্রদায় নির্বিশেষ ১২৫ ধারায় তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম মেয়েদেরও খোরপোষ দেওয়া অনেকক্ষেত্রে সম্ভব হয়েছে।
আমরা যদি একটু পিছনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে মোদী-অব্দ শুরু হবার আগেই মুসলিম মহিলাদের কতগুলি সংগঠন, অন্য নারী-সংগঠন এবং কিছু নাগরিক সংগঠনের আন্দোলনের ফলে সুপ্রিম কোর্ট মেয়েদের অনেক দুর্দশার কারণ তাৎক্ষণিক তিন তালাককে রদ করার এক যুগান্তকারী নির্দেশ দিয়েছিলেন। মোদী ক্ষমতায় আসার পরে অন্য অনেককিছুর মতো এই পদক্ষেপের কৃতিত্বও আত্মসাৎ করে ফেলেন। তদুপরি দেশে স্ত্রী-পরিত্যাগের অপরাধ রুখতে ধর্মনির্বিশেষ অন্য আইন থাকা সত্ত্বেও মুসলিম পুরুষদের ক্ষেত্রে একটি বাড়তি ফৌজদারি আইন চালু করার উদ্যোগ তিনি নেন যাতে তিন তালাক উচ্চারণ করলেই জেলের সম্ভাবনা রয়েছে। হিংসা থেকে সুরক্ষা ও পরিত্যক্ত স্ত্রীর খোরপোষের উপযুক্ত ব্যবস্থা করার বদলে এই আইন মুসলিম মেয়েদের পক্ষে নাকের বদলে নরুণের শামিল হয়েছে।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রয়োজন স্বীকার করেও ১৯৪৭-৪৮ সালে সংবিধান রচয়িতাদের সভা থেকে আইন মন্ত্রী আম্বেদকর তা পাশ করাতে পারেননি। তার কারণ তাঁদের এই যৌথ উপলব্ধি যে ভারতে নানা সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহ ও উত্তরাধিকারের বিধি এতই বিচিত্র ও বহুমুখী যে ওপর থেকে অভিন্নতা চাপিয়ে দিতে গেলে জটিলতা আরও বাড়বে। এই সময়ে ঐ সভায় আলোচনার ভিত্তিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বিষয়টি সংবিধানের মৌলিক অধিকারের অংশের ৩৫তম ধারা থেকে নির্দেশক নীতির অংশে সংবিধানের ৪৪তম ধারায় সরানো হয়। এমনকী হিন্দু পারিবারিক আইনের আধুনিকীকরণের প্রস্তাবেও এত বাধা ছিল যে তা তখন পাশ করানো যায়নি। বিজেপি-আরএসএস’র পূর্বপুরুষেরা তাতে জোরালো ইন্ধন জুগিয়েছিল। অবশেষে ১৯৫৪-৫৬র মধ্যে খণ্ডে খণ্ডে সেই সংশোধনীগুলি পাশ হয়। তার মধ্যেও সম্পত্তির অধিকার ও অভিভাবকত্বের বিষয়ে নারীসমতা সম্পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি। কাজেই সেটাও অভিন্ন বিধির মডেল হতে পারে না। 
সংবিধানের ৪৪-এর ধারাটি তবু আমাদের কাছে একটি চেতাবনি যে এই সমস্ত বিবিধ পারিবারিক বিধি যেখানে সাংবিধানিক অধিকারকে লঙ্ঘন করছে, স্বাভাবিক ন্যায় বিচারের বিপরীতে যাচ্ছে, ঐ সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীগুলির মধ্য থেকেই তার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে সেগুলোকে পালটাতে হবে। তাৎক্ষণিক তিন তালাক রদ করে সুপ্রিম কোর্টের রায় সম্প্রদায়ের ভিতর থেকে উত্থিত দাবির ভিত্তিতেই এসেছিল। তারও বহু আগে ১৯৫৪ সালে গৃহীত বিশেষ বিবাহ আইনটি আমাদের দেখায় সমান দেওয়ানি বিধি কীভাবে সর্বসম্মতিতে তৈরি করা সম্ভব। তখন এর প্রয়োগ ছিল ঐচ্ছিক। অনেক বছর পরে অনেক আন্দোলন ও আলোচনার পরে তা সবার পক্ষে বাধ্যতামূলক করা গিয়েছিল। কিন্তু তার জন্য অভিন্ন বিধির প্রয়োজন হয়নি। 
২০১৬ সালে ২১তম আইন কমিশন অভিন্ন বিধির বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে মোদী সরকারকে জানিয়েছিল যে বর্তমানে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার দরকারও নেই, তা অভিপ্রেতও নয়। তাদের মতে সম্পত্তি, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও অভিভাবকত্বের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রথাগুলির মধ্যে বিশেষত মেয়েদের প্রতি যে অবিচার হয় তার কারণ তাদের পারস্পরিক বিভিন্নতা নয়, তাদের মধ্যেকার পুরুষ-পক্ষপাতিত্ব। বিভিন্নতা মানেই অসাম্য নয়, অভিন্ন বিধি চালু হলেই তা দূর হয় না, একটি দেশে চালচলন আচার-আচরণের বৈচিত্র বরং সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই সূচক। তবু সমতার স্বার্থে সংশোধন প্রয়োজন। প্রতিটি পারিবারিক আইনের মধ্যেকার অসাম্য— অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কথা না তুলেও যার প্রতিকার করা যেতে পারে— ২১তম কমিশন তারও বিস্তারিত আলোচনা করেছিল। তাসত্ত্বেও মোদী দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরে সরকারের সময় এবং টাকার অপচয় করে বিষয়টি পাঠানো হয় ২২ তম আইন কমিশনের কাছে, কিন্তু সেখান থেকেও এর স্পষ্ট সম্মতি মেলেনি। 
এই ইতিহাস সত্ত্বেও যে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই বিজেপি সরকার অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার জিগির তুলেছে তার প্রকৃত কারণ তাদের এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসার রাস্তা যারা রচনা করেছে সেই আরএসএস-কে সন্তুষ্ট রাখা এবং আমাদের সংবিধানে সমাজ ও সংস্কৃতির বহুত্বকে যে জায়গা দেওয়া হয়েছে তা মুছে ‘এক দেশ এক আইন’ তৈরির সঙ্ঘী অ্যাজেন্ডা। এর আশু লক্ষ্য বিশেষত মুসলিম নারীর প্রতি অবিচারকে উপলক্ষ করে গোটা মুসলিম সমাজকে বর্বর ও পশ্চাৎপদ বলে চিহ্নিত করা, তার মধ্যেকার সংস্কার-অভিমুখী শক্তিকে আরও কোণঠাসা করে কার্যত ঐ সম্প্রদায়ের কট্টরপন্থীদের বেশি জায়গা করে দেওয়া। কর্নাটকে যখন বিজেপি সরকার ছিল তখন কলেজ-পড়ুয়া মেয়েদের হিজাব নিষিদ্ধ করে ঠিক এই কাজটিই করেছিল। হিজাব পরেও যারা এই প্রথম কলেজে পড়ার সুযোগ পাচ্ছিল তাদের পরিবারগুলোকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আগ্রাসনের জুজু দেখিয়ে তাদের কলেজ যাওয়া বন্ধ করা গিয়েছিল। মোল্লা মৌলবীদের প্রভাব বৃদ্ধিরই সুযোগ হয়েছিল তাতে। হিজাবের পক্ষপাতী না হয়েও একথা আমরা সেদিন বলেছিলাম। বর্তমান কর্নাটক সরকার অবশ্য ঐ নির্দেশটি রদ করেছে। 
আমার ধারণা মুসলিম নারীরাই শুধু নন, মুসলিম সমাজের বহু মানুষও আমাদের মতোই বহুবিবাহ প্রথা রদের পক্ষেই আছেন। কিন্তু বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পুরুষের বহুগমন, বিবাহিত স্ত্রীকে ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত করা ও তাদের ওপর গার্হস্থ্য অত্যাচার এতে বন্ধ হবে না কারণ সরকারের সেই সদিচ্ছা নেই। তাহলে এতে কোনও সম্প্রদায়ের মেয়েরই আহ্লাদিত হবার কারণ নেই। বরং যে লড়াই ঐক্যবদ্ধ নারী-আন্দোলনের করার কথা, বা সমগ্র নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে করার কথা, তার মধ্যে সরকারের ধর্মীয় রাজনীতি আরও বিভাজন ঘটাচ্ছে, ঘটাবে এই আশঙ্কা আমরা ভুলে যেতে পারি না। আর সম্ভবত ঠিক ‘গুন্ডাদমন বিল’র মতোই এই বিধি রাষ্ট্র ও প্রশাসনের হাতে অনেক বেশি ক্ষমতা তুলে দেবে, পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট ঠিক করবে পরিবার কীভাবে চলবে, কে কাকে বিয়ে করবে, কে কার সঙ্গে সহবাস করতে পারবে। অর্থাৎ অভিন্ন বিধি চালু হলেও তার কার্যকরিতা নিয়ন্ত্রিত হবে ক্ষমতাসীনের মরজি অনুযায়ী। বিজেপি সরকার প্রবর্তিত অভিন্ন বিধি ধর্মীয় বিভাজন বাড়াবে এবং একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গকে পুলিশি রাষ্ট্রের অপচ্ছায়ায় টেনে আনবে। বিল তো ওরা পাশ করাবেই, কিন্তু প্রচারপর্ব থেকেই তার যে অশুভ প্রভাব সমাজে পড়ছে তার বিরুদ্ধে এখন থেকে সোচ্চার হওয়া ও তার প্রতিকারে যুক্ত হওয়ার দায় আমাদেরই।

Comments :0

Login to leave a comment