Jackfruit Cultivation

বাণিজ্যিক কাঁঠাল চাষের জোয়ার ধূপগুড়িতে

জেলা

কৌশিক দাম: ধূপগুড়ি

উত্তরবঙ্গের কৃষি মানচিত্রে নিঃশব্দ বিপ্লব। গতানুগতিক আলু কিংবা মরশুমি সবজি চাষের অনিশ্চয়তা আর লোকসানের বোঝা ঝেড়ে ফেলে ধূপগুড়ি ব্লকের মাগুরমারীর কৃষকরা এখন খুঁজছেন স্থায়ী উপার্জনের বিকল্প পথ। ধূপগুড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন বাণিজ্যিকভাবে কাঁঠাল চাষের জোয়ার এসেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন ও শক্তিশালী দিশা দেখাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের কৃষকরা মূলত আলু ও সবজি চাষের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত কয়েক বছরে সারের আকাশছোঁয়া দাম, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি, বাজারের অস্থিরতা এবং সর্বোপরি সরকারি সহায়তার অভাব কৃষকদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। বারবার ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া কৃষকরা এমন এক চাষের সন্ধান করছিলেন, যাতে ঝুঁকি কম কিন্তু আয় সুনিশ্চিত। সেই শূন্যস্থানই এখন পূরণ করছে ‘সর্বগুণ সম্পন্ন’ কাঁঠাল।
ধূপগুড়ির প্রগতিশীল কৃষক মধুসূদন রায় এই পরিবর্তনের অন্যতম কারিগর। তিনি বলেন, “আমরা কৃষক মানুষ, সবসময় একটু নতুনত্বের খোঁজে থাকি। গতানুগতিক আলু বা সবজি চাষে এখন আর আগের মতো লাভ নেই, বরং ঝুঁকি বাড়ছে। সেই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতেই এই দীর্ঘস্থায়ী বিকল্প বেছে নেওয়া। এতে পরিশ্রম কম, কিন্তু আয়ের দিকটি অনেক বেশি ভরসাযোগ্য।”


সাধারণত কাঁঠাল গাছ বড় হতে দীর্ঘ সময় নেয়—এই ধারণা এখন অতীত। কৃষকরা জানাচ্ছেন, আধুনিক কলম ও উন্নত প্রজাতির চারা ব্যবহারের ফলে রোপণের মাত্র ৯ মাসের মধ্যেই ফলন শুরু হচ্ছে। সবথেকে বড় চমক হলো, এই বিশেষ প্রজাতির গাছ থেকে এখন সারাবছরই ফলন পাওয়া সম্ভব। ফলে অসময়েও বাজারে কাঁঠালের জোগান বজায় থাকছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কাঁঠাল চাষের একাধিক বাণিজ্যিক ও পরিবেশগত সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে বাজারে বিশেষ করে অসময়ে সবজি হিসেবে এঁচোড়ের চাহিদা তুঙ্গে। খুচরো বাজারে এখন কাঁঠাল কেজি প্রতি ৭০-৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একবার চারা রোপণ করলে তা কয়েক দশক ধরে ফলন দেয়। বারবার বীজ কেনা বা জমি তৈরির খরচ নেই। আলু বা সবজির  তুলনায় কাঁঠাল গাছে রোগপোকার উপদ্রব নগণ্য। ফলে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের খরচ বেঁচে যাচ্ছে, যা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করছে। 
ভিন রাজ্যের বাজারেও বর্তমানে প্রক্রিয়াজাত কাঁঠালের চাহিদা বাড়ছে। ধূপগুড়ির এই কৃষি বিপ্লব প্রমাণ করছে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক মানসিকতা থাকলে প্রথাগত গণ্ডি পেরিয়েও কৃষিকে লাভজনক করা সম্ভব। তবে স্থানীয় কৃষক মহাবুল আলমের দাবি, এই ধারাকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সরকারি কোল্ড স্টোরেজ এবং সঠিক বাজারজাতকরণের পরিকাঠামো। ধূপগুড়ির এই ‘কাঁঠাল মডেল’ আজ গোটা উত্তরবঙ্গের কৃষকদের কাছেই অনুপ্রেরণা হতে চলেছে।

Comments :0

Login to leave a comment