Jaldhaka-Chalsa Rail Line

চালসা–জলঢাকা রেললাইন ঘিরে পরিবেশের শঙ্কা

রাজ্য জেলা

কৌশিক দাম

চালসার খুনিয়া মোড় থেকে জলঢাকা পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার উত্তর পূর্ব রেলের প্রকল্প নতুন রেললাইন নির্মাণের প্রস্তাব ঘিরে ডুয়ার্সে যোগাযোগ ও কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে। রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য প্রায় ২৭২ কোটি টাকা অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারত-চীন-ভুটান ত্রিদেশীয় সীমান্তবর্তী এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করাই প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানা যাচ্ছে।
প্রস্তাবিত রেলপথটি জলপাইগুড়ি ও কালিম্পং বন বিভাগের পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকার পাশ দিয়ে চাপড়ামারি অভয়ারণ্য সংলগ্ন হয়ে জলঢাকা পর্যন্ত যাওয়ার কথা। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জঙ্গল, পাহাড়, নদী ও ঝোড়ার উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে পরিবেশ কর্মীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন।
পরিবেশকর্মী অভিযান সাহার বক্তব্য, নেওড়া ভ্যালি উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং এখনও তুলনামূলকভাবে অক্ষত বনাঞ্চল। দুর্গমতার কারণে জঙ্গলের বহু অংশে এখনও মানুষের নিয়মিত প্রবেশ ঘটেনি। সিকিম ও ভুটান-সংলগ্ন বনভূমি বন্যপ্রাণীর চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসাবেও কাজ করে। রেড পান্ডা, কালো ভল্লুক, মেঘলা চিতা-সহ একাধিক বিরল প্রাণীর পাশাপাশি বাঘের চলাচলেরও প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি। প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখি, নানা প্রজাতির প্রজাপতি, সরীসৃপ, উভচর, অর্কিড, ছত্রাক এবং বিপুল সংখ্যক ঔষধি উদ্ভিদ রয়েছে। নেওড়া ভ্যালি থেকে বেরিয়ে আসা নদী ও অসংখ্য ঝোরাতেও রয়েছে বৈচিত্র্যময় মাছ ও জলজ প্রাণী। পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, রেললাইন বা সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য পাহাড় ও মাটি কাটতে হলে এই ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের উপর চাপ বাড়বে। বিশেষত নেওড়া ভ্যালির নিচের অংশের সঙ্গে চাপড়ামারি ও গরুমারার বনাঞ্চলের যে সংযোগ রয়েছে। তা বন্যপ্রাণীর চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হাতির দল নদী ও বনপথ ধরে নিম্ন নেওড়া পর্যন্ত যাতায়াত করে। রেললাইন, রাস্তা বা অন্যান্য নির্মাণে এই স্বাভাবিক চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাহাড় কাটা ও মাটি খননের ফলে ভূমিক্ষয় ও ভূমিধসের আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, হিমালয় নবীন ও ভঙ্গুর পর্বতমালা। নেওড়া ভ্যালির বহু এলাকায় মাটির স্তরও তুলনামূলক ভাবে আলাগা। ফলে নির্মাণকাজের অভিঘাত নদী ও ঝোরার উপরেও পড়তে পারে। বর্ষাকালে তার পরিণতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু নির্মাণকাজ নয়,পরবর্তী সময়ে রাস্তাঘাট, যানবাহন, পর্যটনকেন্দ্র ও বসতি বাড়ার সম্ভাবনাও পরিবেশকর্মীদের উদ্বেগের কারণ। তাঁদের বক্তব্য, জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা তৈরি হলে ‘রোড কিল’র ঘটনা বাড়বে। বড় প্রাণীর পাশাপাশি সাপ, ব্যাঙ-সহ সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি। রাতের কৃত্রিম আলোও বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও চলাচলের সময়সূচিতে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। বিশেষ করে পোকামাকড় ও নিশাচর প্রাণীর উপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নেওড়া ভ্যালির প্রাকৃতিক বাঁশবন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ঘন বাঁশের ছাউনির কারণে বহু এলাকায় সূর্যের আলো পর্যন্ত মাটিতে সরাসরি পৌঁছয় না। পরিবেশকর্মীদের মতে এই স্বাভাবিক বনভূমির চরিত্র নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদে বাস্তুতন্ত্রের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্বও রয়েছে। জলঢাকা নদীর উৎস সিকিমের জেলেপ লা সংলগ্ন কুপুপ বা বিটাং হ্রদ এলাকায়, যা ডোকলাম ও ভারত-চীন-ভুটান সীমান্তের কাছাকাছি। ২০১৭ সালের ডোকলাম পরিস্থিতির পর সীমান্তবর্তী এলাকায় দ্রুত সেনা ও রসদ পৌঁছনোর পরিকাঠামোর গুরুত্ব বেড়েছে। সেই কারণে প্রস্তাবিত রেলপথকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ হিসাবেও দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ভুটান থেকে ডলোমাইট-সহ বিভিন্ন খনিজ ও শিল্পের কাঁচামাল পরিবহণ এবং ডুয়ার্সের পর্যটন ক্ষেত্রেও রেলপথটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জলঢাকা, ঝালং, বিন্দু এবং টোডে-টাংটা এলাকার পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি ও বনজ পণ্য পরিবহণের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি হোমস্টে ও ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসারের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে পরিবেশকর্মীদের একাংশের বক্তব্য, কৌশলগত যোগাযোগের প্রয়োজন থাকলেও প্রকল্পের নামে অক্ষত বনাঞ্চলের চরিত্র বদলে দেওয়া চলবে না। তাঁদের প্রশ্ন, ভবিষ্যতে রেলপথের সঙ্গে নতুন রাস্তা, পর্যটনকেন্দ্র, বাণিজ্যিক পরিকাঠামো বা খনিজ পরিবহণের চাপ যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্ষা শেষ হলে রেল ও বন দপ্তরের যৌথভাবে প্রস্তাবিত রুটের অ্যালাইনমেন্ট সমীক্ষা শুরু করার কথা। গভীর বন ও বন্যপ্রাণী সংলগ্ন এলাকা দিয়ে রেললাইন যাওয়ায় নির্মাণ শুরুর আগে প্রয়োজনীয় বন ও বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক।
পরিবেশকর্মী অভিযান সাহা দাবি করেন, প্রকল্পের চূড়ান্ত রুট নির্ধারণের আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করতে হবে। হাতি-সহ বন্যপ্রাণীর চলাচলের করিডোর চিহ্নিত করতে হবে। নদী, ঝোরা,পাহাড় ও ভূমির স্থিতিশীলতার উপর সম্ভাব্য প্রভাবও খতিয়ে দেখতে হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় মানুষের মতামত গ্রহণের দাবিও উঠেছে। তাঁদের বক্তব্য, যোগাযোগ ও সীমান্ত নিরাপত্তার প্রয়োজন অস্বীকার করা হচ্ছে না। কিন্তু উন্নয়নের মূল্য যেন উত্তরবঙ্গের অন্যতম অমূল্য বনভূমি ও জীববৈচিত্র্যকে দিয়ে দিতে না হয়। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই প্রকল্পের চূড়ান্ত রুট নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

Comments :0

Login to leave a comment