Rajesh Exports Scam

১৫ লক্ষ কোটি টাকা লুট মোদী ঘনিষ্ঠ সোনা কারবারির

জাতীয়

 ১,৫০,০০,০০,০০,০০,০০০! কোনও ফোন নম্বর নয়। মোদীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সোনা কারবারি রাজেশ মেহতার সংস্থা ‘রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেড’-র বিরুদ্ধে এই অঙ্কের টাকা তছরুপের অভিযোগ এনেছে দেশের শেয়ার বাজারের নিয়ামক সংস্থা ‘সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ ব্যুরো’ (সেবি)।  
এই ১৫ লক্ষ কোটি টাকা তছরুপের প্রধান ভুক্তভোগী আবারও রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বিমা সংস্থা এলআইসি। বাজারে বহুদিন ধরেই রাজেশ এক্সপোর্টস’র নাম খারাপ। কেউ যখন এই ‘সন্দেহজনক’ সংস্থায় বিনিয়োগ করতে চাইছে না, ঠিক তখনই ‘অন্ধের যষ্টি’ হয়ে পাশে দাঁড়ায় এলআইসি। এই ‘মডেল’ নেহাত নতুন নয়। মোদী সরকারের শাসনকালের প্রথম থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার নিজস্ব তহবিল, অর্থাৎ জনগণের সঞ্চিত অর্থেই খাদে পড়া সংস্থাগুলির হাল ফেরানোর চেষ্টা করেছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। কখনও স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া, কখনও পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক অথবা এলাইসি—  মোদীর ধনকুবের বন্ধুদের মালিকানাধীন কম্পানি আইসিউ’তে গেলেই অক্সিজেন সিলিন্ডারের কাজ করেছে এই সমস্ত সংস্থা। অনেকক্ষেত্রে অক্সিজেন সিলিন্ডারেও কাজ দেয়নি, জনগণের সঞ্চয়ের টাকায় কোনমতে কয়েকদিন বাঁচানো গেলেও দেউলিয়া হয়েছে বিভিন্ন সংস্থা—  নীরব মোদী, মেহুল চোকসি, অনিল আম্বানি তারই উদাহরণ। অনেকে আবার টিকেও গেছে, যেমন গৌতম আদানি। 
রাজেশ মেহতার কী হবে তা যদিও স্পষ্ট নয়। সেবি তার অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টে অর্থ লোপাটের তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে বেনিয়ম, রাজস্বের ভুয়ো খতিয়ান দেখানো ও সেবি’র তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগে আনা হয়েছে। এই সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর রাজেশ মেহতার জালিয়াতিতে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে রিপোর্টে। 
এদিকে খবর সামনে আসতেই ‘রাজেশ এক্সপোর্টস’-র শেয়ারে ধস নেমেছে।। বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির শেয়ারের দাম প্রায় ৫ শতাংশ পড়ে গিয়ে ১০৩ টাকায় ঠেকেছে। গত এক বছরে এই শেয়ারের দর প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মার খেয়েছে। 
অর্থ তছরুপের এই ঘটনায় কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। দলের মুখপাত্র জয়রাম রমেশ বলেন, মোদী জমানায় লাগাতার জালিয়াতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার টাকা লোপাট হয়ে যাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এলআইসি রাকেশ এক্সপোর্টের শেয়ার কিনতে গেল কেন? কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত কোন ব্যক্তির নির্দেশে এই সংস্থার শেয়ার কেনা হয়েছে? কেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে এই প্রতারক সংস্থার ঋণ মিলেছে। সবকিছুর তদন্ত হওয়া উচিত। 
সেবি’র রিপোর্টে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা এক কথায় অবাক হওয়ার মতো। সেবি’র দাবি, ২০২০-২১ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪-২৫-র মধ্যে ‘রাজেশ এক্সপোর্টস’ তাদের সম্মিলিত রাজস্বে প্রায় ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার গরমিল বা ভুল তথ্য পেশ করেছে। এই অঙ্ক ওই নির্দিষ্ট সময়ে কোম্পানির দেখানো মোট রাজস্বের প্রায় ৯৯.৮০ শতাংশ!
রিপোর্টে বলা হচ্ছে, কোম্পানির মোট আয়ের ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশই আসত তাদের বিদেশি সহযোগী সংস্থা, বিশেষ করে ‘ভালকাম্বি এসএ’ থেকে। কিন্তু ‘ভালকাম্বি’-র নিজস্ব অডিটেড আর্থিক রিপোর্ট খতিয়ে দেখে সেবি জানতে পেরেছে, মূল গ্রুপ লেভেলে যে বিপুল টাকা আয় দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার সামান্য অংশই সেখানে রয়েছে। সেবি’র অভিযোগ, সোনা প্রক্রিয়াকরণের প্রকৃত আয়ের বদলে, সম্পূর্ণ সোনার লেনদেনের মোট মূল্যকে রাজস্ব হিসাবে দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছে সংস্থাটি। এর সপক্ষে কোনও সঠিক ইনভয়েস, গ্রাহকদের বিবরণ বা অ্যাকাউন্টিং নথি দেখাতে পারেনি তারা।
সেবির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘অ্যাফ্লুয়েন্স শেয়ার্স অ্যান্ড স্টকস প্রাইভেট লিমিটেড’ নামক এক সংস্থার সঙ্গে ১১,৪৮৭ কোটি টাকার বিক্রি এবং ১১,৪৮৮ কোটি টাকার ক্রয়ের হিসাব দেখিয়েছে রাজেশ এক্সপোর্টস। অথচ সংশ্লিষ্ট ওই সংস্থাটি এই ধরনের কোনও লেনদেনের কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। শুধু তাই নয়, অডিট কমিটির অনুমতি ছাড়াই সংস্থার ৩৩৯ কোটি টাকা কর্ণধার রাজেশ মেহতার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছিল, যা দিয়ে তিনি ডেরিভেটিভ ট্রেড করেছিলেন বলেও অভিযোগ। এই জালিয়াতির জেরে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী সহ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের প্রায় ১২,৭২৬ কোটি টাকা নষ্ট হয়েছে।
বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য কোম্পানির বিধিবদ্ধ অডিটরদের ভূমিকা পরীক্ষা করতে জাতীয় আর্থিক রিপোর্টিং কর্তৃপক্ষ কাছেও সুপারিশ করেছে সেবি। এদিকে এই জালিয়াতিতে বিপাকে পড়েছে জীবনবিমা নিগম। এই সংস্থায় ‘রাজেশ এক্সপোর্টস’-র প্রায় ১০.৮০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নিগমের শেয়ার কোনও কেনাবেচা করেনি।এদিকে সম্প্রতি রাজেশ এক্সপোর্টের শেয়ারের দাম হু হু করে পড়ে যাওয়ায় নিগমে এই শেয়ারের মূল্য বিপুল হারে কমে গেছে। ২০২৬ সালের শুরুতে যেখানে রাজেশ এক্সপোর্টসের জীবন বিমা নিগমে হোল্ডিংয়ের মূল্য ছিল ৬৩৭ কোটি টাকা, তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৪৭ কোটি টাকায়। এদিকে এতে শুধু জীবন বিমা নিগম নয় ধাক্কা খেয়েছে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরাও। তবে কোম্পানির ডামাডোল আঁচ করতে পেরে গত তিন বছর ধরে ক্রমাগত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ তুলে নেয়।  ২০২৩ সালের মার্চ মাসে যেখানে এফআইআই-দের হোল্ডিং ছিল ১৭.৬০ শতাংশ, ২০২৬ সালের মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.২৬ শতাংশে। বর্তমানে এই কোম্পানিতে মূলত ব্রিজ ইন্ডিয়া ফান্ড (৮.৪৬ শতাংশ) এবং সোয়াব ফান্ডামেন্টাল এমার্জিং মার্কেটস ইকুইটি ইটিএফ (২.৭০ শতাংশ)-এর বড় বিনিয়োগ রয়েছে। তবে বর্তমান পতনের জেরে বিদেশী বিনিয়োগ ৮৩৮ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৫৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। রাজেশ এক্সপোর্টস-এর আর্থিক বেহাল অবস্থা নিয়ে এই প্রথম প্রশ্ন উঠল তা নয়। ২০২৩ সালেও ২০২৩ অর্থবর্ষের ক্যাশ-ফ্লো স্টেটমেন্ট বা নগদ প্রবাহের বিবরণী জমা না দেওয়ায় ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানির কাছে জবাব চেয়েছিল। এমনকি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকেও অডিট রিপোর্ট এবং ক্যাশ-ফ্লোর সঠিক তথ্য গোপন করার অভিযোগ উঠেছিল এই সোনা কারবারির বিরুদ্ধে।
এদিকে এই আর্থিক কেলেঙ্কারি সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সোনার কারবারি সংস্থায়  একদিকে যেমন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কানারা ব্যাঙ্কের কোটি কোটি টাকার ঋণ আটকে রয়েছে, তেমনই সাধারণ মানুষের জমানো অর্থে গড়ে এলআইসি শেয়ার কেনায় বিপুল বিনিয়োগও রয়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment