অবশেষে ‘টুলুর ডায়রি’ পেল পুলিশ। টুলুর ‘মাসকাবারী’র সেই খাতায় একের পর এক নাম সরকারি কর্তাদের। পুলিশ ও সরকারি আধিকারিকদের টাকা দিয়েই চলত টুলুর বেআইনি কার্যকলাপ। পেনের কালিতে জ্বলজ্বল করছে তাঁদের জন্য ‘বরাদ্দে’র অঙ্কও। অবশ্যই পদমর্যাদা অনুযায়ী। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সরকারি নাম কী জুড়বে টুলু মামলায় ? সরকারি কর্তাছাড়াও সমাজের ‘বিশিষ্ঠ’দেরও নামের সম্ভারে ভরা ‘টুলুর প্রসাদে’র খাতাও কী এবার মিলবে?
একদিকে যখন টুলুর বরাদ্দের ডায়রি উদ্ধারের কথা প্রকাশ্যে এসেছে ঠিক তখনই মহম্মদ বাজার থানায় কর্মরত দুই পুলিশ আধিকারিকক ক্লোজ করারও নির্দেশ সামনে এসেছে। সূত্র মারফত জানা গেছে, সিউড়ি পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে মহম্মদ বাজার থানার দুই সাব-ইনস্পেক্টর সানাউর হোসেন এবং আব্দুল আলিমকে। যদিও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটি নিছক রুটিন পদক্ষেপ। টুলু মণ্ডলের ঘটনার সঙ্গে এই ক্লোজ করার সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে পুলিশের এই যুক্তি হজম করা যাচ্ছে না। পুলিশের একটি সূত্র মারফত জানা গেছে, টুলু মন্ডল ওরফে মহম্মদ নিজামুদ্দীনের বিভিন্ন ডেরায় যখন একের পর এক হানা চলছে, ঠিক তখনই আচমকা দুই আধিকারিকের উদ্দেশ্যে এমন নির্দেশ নিশ্চিতভাবেই ইঙ্গিত করছে টুলু মন্ডলের যোগসূত্রের। এক পুলিশ কর্মীই জানিয়েছেন, ‘‘দুজন সহকর্মীকে ক্লোজ করা হয়েছে। ঠিক কী কারন বলতে পারব না। তবে এটা বলতে পারি মহম্মদ বাজার থানায় কর্মরত সিংহভাগ পুলিশকর্মীর কাছেই টুলুর রমরমার সুবিধা পৌছেছে।’’
সরকারী কর্তাদের নামে ভরা ‘টুলুর ডায়রি’ মিলেছে টুলু মন্ডলের এক ম্যানেজারকে জেরা করেই। সেই ম্যানেজারের হাতে লেখা ডায়রিতেই মিলেছে নাম-পদমর্যাদা ধরে কাকে কত দেওয়া হত তার উল্লেখ। শুধু ডায়রি নয়, ম্যানেজার সীতেশ প্রামানিককে নিয়ে পুলিশ টুলু মন্ডলের নানা অফিস, গোডাউনে হানা দিয়ে ইতিমধ্যেই ছাপার মেশিন, কম্পিউটার, পেনড্রাইভ থেকে শুরু করে নানান বৈদ্যুতিন সামগ্রী উদ্ধার করেছে। ওই প্রিন্টার থেকেই নকল ডিসিআর ছাপানো হত বলে মনে করছে পুলিশ। এদিন বীরভূমের পুলিশ সুপার বিদিত রাজ ভূন্দেশ জানিয়েছেন, ‘‘সংগঠিত অপরাধের মামলা রুজু করে তদন্ত চলছে। ধৃত দুজনকে জেরা এবং তল্লাশী অভিযান চালিয়ে জানা গেছে, মহম্মদ নিজামুদ্দীন একটি সংগঠিত অপরাধমূলক চক্র চালাতেন। তদন্তের অগ্রগতিতে উঠে এসেছে, টুলু মন্ডলের বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং ফিক্সড ডিপোজিটে এখনও পর্যন্ত মোট প্রায় ২২০ কোটি টাকার হদিশ মিলেছে। এছাড়াওপ্রায় ৪০০ বিঘা জমির ওপর বেশ কিছু সম্পত্তি, বাড়ি এবং নির্মান রয়েছে, সেগুলোও এই তদন্তের অংশ হয়ে উঠেছে। ধৃত দুজনের তাদের বয়ানের ভিত্তিতে পুলিশ একটি অফসেট প্রিন্টিং প্রেসের সেট-আপ উদ্ধার করে বাজেয়াপ্ত করেছে। মনে করা হচ্ছে, জাল ডিসিআর ছাপানোর কাজেই এটি ব্যবহার হত।’’
টুলুর ব্যবসা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহলের মত, বহু ম্যানেজার ছিল টুলুর। তাঁর অন্যতম এই সীতেশ প্রামানিক দাবি করেছেন, ‘‘আমার বাড়ি মুর্শিদাবাদের সালারে। বারো বছর ধরে টুলু মন্ডলের পাঁচামীর ক্রাশার অফিসে কাজ করছি। পুলিশ দু-তিনদিন আগে ধরে এনেছে। কেন ধরে এনেছে জানি না।’’ জানা গেছে, এই ম্যানেজারের কাছ থেকেই উদ্ধার হয়েছে ‘টুলুর ডায়রি’। জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে, মাসের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই স্তরভীত্তিক মাসোহারার হাজারো থেকে লাখো টাকা পৌছে যেত নির্দিষ্ট ঠিকানায়। পুলিশের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যায়, মহম্মদ বাজার থানা এলাকায় পোস্টিং নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেন সামান্য কনস্টেবল থেকে আধিকারিক পর্যায়ের পুলিশকর্মীরা। ভূমি দপ্তরেরও ক্ষেত্রেও ছিল একই অভ্যাস। এক পুলিশ কর্মীই জানিয়েছেন, ‘‘টুলুর রমরমায় ছায়ায় এই থানা এলাকার এক একজন কনস্টেবল, ভূমি দপ্তরে কর্মীদের চলন বলনের পরিবর্তন দেখলে তাক লেগে যাবে। ’’
টুলু মন্ডলের আত্বীয় মিনার মন্ডলের বাড়ি থেকে সাড়ে আঠাশ কোটি নগদ ও পনেরো কেজি সোনা উদ্ধারের পর থেকেই ম্যানেজার সীতেশ প্রামানিক পুলিশের র্যা ডারে ছিল। গত ৩১ তারিখ সীতেশকে নোটিশ পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠায় পুলিশ। অবশেষে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এদিন সিউড়ি আদালতে তোলা হলে অতিরিক্ত মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট অরিজিৎ মন্ডল সাত দিনের পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।এই মামলায় বিশেষভাবে নিযুক্ত সরকারী আইনজীবী বিভাস চ্যাটার্জী জানিয়েছেন, ‘‘জাল ডিসিআর থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় হত, সেই টাকার একটা অংশ সরকারি আধিকারিকদের কাছে যেত। পুলিশ ধৃত সীতেশের নিজের হাতে লেখা সেই ডায়রি উদ্ধার করেছে।’’ এই আধিকারীকদেরও কী মামলায় যুক্ত করা হবে ? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে সরকারী আইনজীবির মন্তব্য, ‘‘এটা সম্পর্কে কিছু বলব না। এটা তদন্তের অংশ।’’
Tulu Mondal
উদ্ধার ‘টুলুর ডায়রি’, লেখা পুলিশ ও সরকারি আধিকারিকদের নাম!
×
Comments :0