Closed Tea Gardens

সরকার বদলেছে তবুও বদলায়নি বন্ধ চা বাগান শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রা

রাজ্য জেলা

জয়ন্ত সাহা 

আলিপুরদুয়ার জেলার ৫ বিধানসভা আসনে জিতেছে বিজেপি, সাংসদও বিজেপির। আর আছে রাজ্য মন্ত্রীসভায় জেলার দুজন মন্ত্রী! এত কিছুর পরেও তৃণমূল আমলের মতই আলিপুরদুয়ার জেলার তিন বন্ধ চা বাগানের প্রায় ৪ হাজার শ্রমিক "ফাউলাই" ভাতা! 
সরকার বদলালেও জেলার তিন বন্ধ বাগানের শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জীবনযাত্রায় কোন "বদলাও" আসে নি। বলছেন, চা শ্রমিকদের নেতা বিকাশ মাহালি।
অথচ এসব বাগানের শ্রমিকদের কোন আয় নেই। কেউ কেউ চলে গেছে ভিন রাজ্যে। আর যারা রয়ে গেছে তারা জঙ্গল থেকে "লকড়ি" আর লতাপাতা গাছের মূল তুলে এনে সেদ্দ করে খায়। আর রেশনের চাল, আটায় কিছুটা ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়।
বিকাশ মোহালির কথায়, বন্ধ বাগান তো এখন ঝোপজঙ্গলে ঢাকা পড়ছে। সেই ঝোপঝাড়ে বণ্যপ্রাণী থেকে বিষধর সাপেদের সাথে লড়েই এখন বেঁচে আছে বন্ধ বাগানের শ্রমিক লাইনের মজদুরেরা।আলিপুরদুয়ারের বান্দাপানী, লঙ্কাপাড়া, রামঝোরা এই তিন বন্ধ বাগানের এটাই এখন চিত্র।
জেলার ৬৪ বাগানের মধ্যে বন্ধ তিনটে বাগান। অথচ শ্রম দপ্তরের খাতায় খোলা আছে বান্দাপানী চা- বাগান! অথচ ২০২৪ সাল থেকে এই বাগানে একদিনের জন্যও বাজেনি কাজে যোগ দেওয়ার সাইরেন। আর যেহেতু কাগজে- কলমে খোলা আছে বাগান তাই এ বাগানের কোন শ্রমিকই "ফাউলাই" নামের মাসিক দেড় হাজার টাকা ভাতাও পায় না।
লঙ্কাপাড়া আর রামঝোরা বাগান বন্ধের পর ফাউলাই চালু হয়েছিল। তবে গত আর্থিক বছর থেকে এই দুই বাগানের শ্রমিকেরাও আর ফাউলাই ভাতা পাচ্ছে না।অথচ বাগান খোলার কোন ইঙ্গিত নেই। কেন ফাউলাই বন্ধ তার জবাব ও মিলছে না শ্রম দপ্তরের আধিকারিকের থেকে।
লঙ্কাপাড়া বাগান বন্ধ হবার পর বাগানের একাংশের গাছ উপড়ে ফেলে সেখানে পিকনিক স্পট বানিয়েছিল তৃণমূলের গ্রাম পঞ্চায়েত। যা আসলে চালাতো তৃণমূলের নেতারা। সেখানে অবশ্য বাগানের কেউ কাজ পায় নি।সরকার বদলের পর সেই পিকনিট স্পট চলে গেছে বিজেপির মাতব্বরদের কব্জায়। এই বাগানে এক সময়ে ২২০০ স্থায়ী এবং এক হাজারের বেশি অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করতেন। বাগানের পুরনো শ্রমিক ফাগুন সোরেন বলেন,"আমাদের পূর্বপুরুষ ছোট নাগপুরের মালভূমি এলাকা, থেকে এখানে এসে জঙ্গল কেটে বাগান, রাস্তা সব বানিয়েছিল। এখন আমাদের ঘরের ছেলে বিটিয়ারা ভিন রাজ্যে গেছে কাজের জন্য।"
আরেক শ্রমিক সুরেন ওরাওঁ বলেন,"বাগানের ফ্যাক্টারি তো ভেঙে পড়ছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ। আমাদের কুলি লাইনে খাওয়ার জল নেই। ঘরের চালে ত্রিপল টাঙিয়ে রাত কাটাই। আমাদের দেখার কেউ নেই।"
বাগানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে শ্রম দপ্তর বাগান খোলার জন্য বার তিনেক মিটিং ডেকেছিল। মালিক পক্ষের কেউ আসে নি। মালিকের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নেয় নি শ্রম দপ্তর। ডাবল ইঞ্জিনের সরকার ক্ষমতায় এলেও নেই কোন ইতিবাচক পদক্ষেপ।
বন্ধ রামঝোরা বাগানের লছমি রায়, সুখমনি ওরাওঁরা স্পষ্ট বলছেন,"বাগান খোলার আশায় "কমলে" ছাপ দিলাম উরাও কোন কিছু করলোক নাই। ইরাও ঘাসফুলের মত আমাদের বুরবক বানালো।"
বন্ধ তিন বাগানের মেয়েরা অন্নপূর্ণার ভান্ডারের জন্য বিডিও অফিসে লাইন দিলেও বেশির ভাগ ঘরেও সে ভাতা আসে নি। ক্ষোভের পারদ চড়ছে রামঝোরা বাগানের কুলি লাইনে।
রামঝোরা বাগানের গণপত ওরাওঁ আঙুলের কড় গুনে বললেন, ছ মাস ফাউলাই মেলেনি। রেশনের চাল গমে বড় জোর ৭ দিন চলে। একবেলা খাবার পেলেই আমাদের সংসারের বাচ্চারা খুশি।
তিন বন্ধ বাগানে ভোটে জেতার পর বিজেপির বিধায়ক এসেছে এমন কথা বলতে পারছে না বাগানের বিজেপি সমর্থকেরাও। শ্রম দপ্তর সূত্রে বলা হচ্ছে নতুন মন্ত্রীর কাছে বন্ধ বাগানের সব তথ্য পাঠানো হয়েছে। বাগান কবে খুলবে সেটা বলতে পারবো না। ফাউলাই চালুর ব্যবস্থা করতে তদ্বির চলছে।
আলিপুরদুয়ারের বান্দাপানি, লঙ্কাপাড়া, রামঝোরা এই তিন বন্ধ বাগানে এখন বাগান কবে খুলবে, ফাউলাই কবে চালু হবে আর বন্ধ বাগানের ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকা হিংস্র বণ্যপ্রাণীর হাত থেকে কি করে পরিবারকে রক্ষা করা যাবে এই তিন আলোচনাই চলে সকাল- সন্ধ্যা।

Comments :0

Login to leave a comment