ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়াকে আইনি বৈধতা দিল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার শিল সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলার শুনানি। এদিন প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে সুনিশ্চিত করতে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরি।
গত বছর জুন মাসে বিহারে এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল, তাকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছিল। সেই সব আবেদন খারিজ করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত রায়ে উল্লেখ করেন, ‘যখন আইন নিজেই নির্বাচন কমিশনকে যেকোনো সময়, সুনির্দিষ্ট কারণ লিপিবদ্ধ করে এবং নিজস্ব বিবেচনা অনুযায়ী বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষমতা দেয়, তখন সাধারণ রুটিন সংশোধনের নিয়মের সাথে হুবহু মিল নেই বলে এই প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করা যায় না। আমাদের সুচিন্তিত অভিমত হলো, এই এসআইআর প্রক্রিয়া জনপ্রতিনিধিত্ব আইনকে খর্ব করে না। বরং ১৯৫০ সালের আইনের ২১(৩) ধারার আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের মূল চেতনাকে কার্যকর করে।’
পর্যবেক্ষণে শীর্ষ আদালত বলেছে, অবাধ নির্বাচন শুধু ভোটগ্রহণের যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে না; বরং ভোটার তালিকার সততা, নির্ভুলতা এবং নির্ভরযোগ্যতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যা আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ বলেছে, ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করার উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশন নাগরিকত্বের প্রশ্ন খতিয়ে দেখতে পারে। তবে কমিশনের এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বা বাধ্যতামূলক নয়। ভোটারদের কাছ থেকে সহায়ক নথি বা প্রমাণ চাওয়া মানেই তাদের নাগরিকত্বের প্রাথমিক আইনি অনুমানকে খণ্ডন করা নয়। এটি কেবল তালিকা সংশোধনের একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া।
আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা তৈরির স্বার্থে নাগরিকত্বের বিষয়টি পরীক্ষা করতে পারলেও, কমিশনের কোন সিদ্ধান্ত একজন ব্যক্তিকে 'অ-ভারতীয়' প্রমাণ করে না।
নাগরিকত্ব ঠিক করার প্রশ্নের কমিশনের যে কোন ক্ষমতা নেই তা স্পষ্ট করে সুপ্রিম কোর্ট বলছে, কমিশনের এই ক্ষমতা শুধুমাত্র ভোটার তালিকা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
উল্লেখ্য পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নাম করে বহু ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তারা তাদের ভোটাধকিার প্রয়োজ করতে পারেনি। এদিন সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, যদি কমিশন কোন ব্যক্তির জমা দেওয়া নথিতে সন্তুষ্ট না হয়, তবে সেই বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দিষ্ট দপ্তরের কাছে আইনি সিদ্ধান্তের জন্য পাঠাতে হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই সংক্রান্ত নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি ওই কর্তৃপক্ষের অধীন থাকবে।
সন্দেহজনক নাগরিকত্বের কারণে ২০০৩ সালের ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে তাঁদের নামের তালিকা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানোর জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
মামলাকারিদের পক্ষ থেকে যেই দাবি গুলো প্রথম থেকে তুলে আসা হয়েছিল তা হচ্ছে, এই এসআইআর প্রক্রিয়াটি আসলে একটি অঘোষিত এনআরসি (NRC) বা নাগরিকপঞ্জি তৈরির রূপ নিয়েছে। এটি ভোটারদের ওপরই নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।
ভেরিফিকেশন চলাকালীন কারও নাম তালিকা থেকে বাদ পড়লে, কোনো উপযুক্ত আদালতের চূড়ান্ত রায় ছাড়াই তিনি সাময়িকভাবে ভোটদানের মতো মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মামলাকারিদের দাবি ছিল জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১(৩) ধারা অনুযায়ী কোন নির্দিষ্ট কেন্দ্র বা অংশের বিশেষ সংশোধন করা যায়, কিন্তু এভাবে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক আকারে গণ-যাচাইকরণ আইনসম্মত নয়। তাঁরা 'লাল বাবু হুসেন' মামলার নজির টেনে বলেন, তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের পক্ষে আইনি অনুমান থাকা উচিত, যা এই প্রক্রিয়া উল্টে দিচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টে নিজেদের পদক্ষেপের পক্ষে জোরালো সওয়াল করে নির্বাচন কমিশন জানায় যে, এসআইআর ভোটার তালিকার বিশুদ্ধতা বজায় রাখার একটি পদ্ধতি মাত্র। সংবিধান অনুযায়ী শুধুমাত্র বৈধ ভারতীয় নাগরিকরাই ভোট দিতে পারেন, তাই অ-নাগরিকদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কোন নিবিড় সংশোধন না হওয়া, ব্যাপক পরিযায়ী শ্রমিকদের যাতায়াত এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে তালিকায় নাম ডুপ্লিকেট বা ভুল থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, যা দূর করতেই এই পদক্ষেপ।
উল্লেখ্য গোটা বছর ধরেই ভোটার তালিকায় নাম তোলা এবং বাদ দেওয়ার কাজ চলতে থাকে। সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেন তালিকা ত্রুটি মুক্ত করা গেলো না সেই বিষয় এড়িয়ে গিয়েছে কমিশন।
Comments :0