CM's Target

মুখ্যমন্ত্রীর টার্গেট

সম্পাদকীয় বিভাগ

বারুইপুরে নাবালিকার ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় আইনের শাসন ও অপরাধীকে সর্বোচ্চ সাজা দেবার ঘোষণা ও প্রচারের আড়ালে আসলে আইনের শাসনকেই খারিজ করে দিয়েছে শুভেন্দুর সরকার। সেই জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে বর্বর যুগের রাজতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারী শাসনের। দেশের সংবিধান ও আইনের নির্দেশিত পথ নয়, শুভেন্দুর সরকার অনুসরণ করছে বিজেপি’র রাজনৈতিক হিন্দুত্বের পথ। কারণ বিজেপি’র ক্ষমতা দখল এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দে‍‌শের সংবিধান ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার থেকে অনেক বেশি জরুরি রাজনৈতিক হিন্দুত্বের লাইন।
তেমনি জনকল্যাণ ও উন্নয়নও তাদের আসল অ্যাজেন্ডা নয়। সেগুলি নিতান্তই লোক দেখানোর জন্য। তাদের আসল লক্ষ্য ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও বিভাজনের মাধ্যমে হিন্দুদের একজোট করা এবং সংখ্যাগুরু হিন্দুদের ভোট পুরোপুরি বিজেপি’র অনুকূলে আনা। সেই লক্ষ্যেই তারা নানাভাবে মুসলিম ভীতি ও আতঙ্কের জিগির তুলে হিন্দুদের ধর্মীয়ভাবে জোটবদ্ধ করতে চায় এবং বিজেপি-কে হিন্দুদের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র কাঠামোয় বিজেপি-কেই এক ও অদ্বিতীয় দল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সেজন্যই এক দেশ, এক দল, এক সরকার, এক ভাষা, এক ধর্ম, এক সংস্কৃতির স্লোগান।
বারুইপুরের ঘটনাকে মুখ্যমন্ত্রী সচেতনভাবে এবং সুকৌশলে সেই ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দিকেই চালিত করতে অতিমাত্রায় তৎপর হয়ে উঠেছে। যতই রাজ্য থেকে ধর্ষণ শব্দ মুছে ফেলার কথা বলুন বা মহিলাদের নিরাপদে রাজ্য গড়ার অঙ্গীকার করুন সেটা যে আদতে অসম্ভব কষ্টকল্পনা তা বারুইপুরের ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছে। একটি ১১ বছরের মেয়েকে বিকেল বেলায় রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে রাতের মধ্যেই দলবদ্ধ ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে। পুলিশের কাছে বাড়ির লোক অভিযোগ করার পরও পুলিশ তৎপর হয়নি। অগত্যা এলাকার মানুষ খোঁজাখুঁজি করে এক অভিযুক্তকে ধরে তার কাছ থেকে নাম সংগ্রহ করে বাকি অভিযুক্তদের ধরে জনতা পুলিশের হাতে তুলে দেবার পর পুলিশ ফাঁড়ি থেকে একজন পালিয়ে যায়। অন্য একজনকে স্থানীয় বিজেপি নেতা সঙ্গে করে নিয়ে যায়। এই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে স্থানীয় মানুষের মধ্যে। তার মধ্যেই মেয়েটির মৃতদেহ উদ্ধার হলে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। রাস্তা, রেল অবরোধ হয়। ফাঁড়িতে বিক্ষোভ চলে। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে অভিযুক্ত একজন জনতার মারে মারা যায়।
এরপরই অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশ। মুখ্যমন্ত্রীও নেমে পড়েন আসরে। ক্রমে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নাবালিকা ধর্ষণ-খুন অপেক্ষা গণপিটুনিতে খুন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ধর্ষণ-খুনে তিনি সাম্প্রদায়িক অনুকূল কিছু পাননি। তাই বিক্ষোভ-প্রতিবাদ এবং তার জেরে একজনের মৃত্যুকে সাম্প্রদায়িক রং দিয়ে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন। ২০০ প্রতিবাদীর বিরুদ্ধে এফআইআর করে ৩৮জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী এটাও বলছেন বিক্ষোভের নামে ষড়যন্ত্র হয়েছে। একটা সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে মেরেছে। অথচ তিনি একবারও বলছেন না পুলিশ কেন নিষ্ক্রিয় ছিল। পুলিশ সক্রিয় হলে এমন কোনও বিক্ষোভই হতো না। আবার মুখ্যমন্ত্রী তদন্তের আগেই ঘোষণা করেছেন জনরোষে নিহত নির্দোষ। অথচ এনকাউন্টারে হত অভিযুক্তই নাম বলেছিল জনরোষে নিহতের। আবার তাকে বিজেপি নেতা ফাঁড়ি থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
যে অভিযুক্তকে এনকাউন্টারে মারা হয়েছে সে আরও অনেক নাম বলেছে যারা নানাভাবে যুক্ত। সেসব নিয়ে সরকার নীরব। তাদের যে সচেতনভাবে আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে সেটা পরিষ্কার। এনকাউন্টারে মারা না গেলে আরও অনেক তথ্য হয়তো মিলতো সেগুলি শাসক দলের পক্ষে হজম করা কঠিন হতো। সেজন্যই কি এনকাউন্টারে সাক্ষী লোপাট। গোটা ঘটনার অভিমুখ ঘোরাতেই কি মুখ্যমন্ত্রী বিক্ষোভকারীদের মধ্যে একটা সম্প্রদায়কে টার্গেট করছেন।

Comments :0

Login to leave a comment