মন্দির হোক বা মসজিদ অথবা গির্জা, সেটা সব সময়ই ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে পবিত্র ধর্মস্থান। তাদের ধর্মীয় আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা। সেখানে ধর্মবিশ্বাসী মানুষ যান, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অংশ নেন, পূজা দেন, দর্শন করেন। মন্দির বা ধর্মস্থান তাই একান্তভাবেই ধর্মবিশ্বাসী মানুষদের নিজস্ব জায়গা। এহেন মন্দির বা ধর্মস্থানগুলি পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদিও সেই নিষ্ঠাবান ধার্মিকদের জিম্মায় থাকার কথা।
মন্দিরগুলির মজুতভাণ্ডারে বিপুল ধনসম্পদ থাকে। শত শত কোটি টাকার সোনা থাকে। এই বিপুল সম্পদের উৎস ভক্তদের দান। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগ থেকে বহু মানুষ তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন উপেক্ষা করে বিপুল অর্থ, সোনাদানা মন্দিরে দান করেন। তারা বিশ্বাস করেন সত্যিকারের ধার্মিক, সৎ, দায়বদ্ধ ও নিঃস্বার্থপরায়ন মানুষরাই মন্দির দেখভাল করার এবং ভক্তদের দান সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব পালন করেন। তারা ভাবতেই পারেন না তাদের দানের কানাকড়িও অপব্যবহার হবে।
মন্দিরে ছদ্ম সাধু ভণ্ড ধার্মিকদের যেমন ঠাঁই হবার কথা নয় তেমনি রাজনৈতিক বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদেরও জায়গা হওয়া উচিত নয়। বাস্তবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে দেশের বেশিরভাগ জায়গায় মন্দির পরিচালনায় বা মন্দিরের সম্পদ রক্ষায় সেইসব লোকজনদেরই প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ছে যা সরাসরি বা পরোক্ষে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক মতাদর্শে যুক্ত অথবা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক। ফলে মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে ধর্মাচারের আড়ালে রাজনৈতিক আদর্শের প্রচার ও প্রভাব বিস্তারের সচেতন প্রয়াস চলে। এর ফলে মন্দিরের শুচিতা ও স্বাতন্ত্র্য যেমন মলিন হয় তেমনি ভক্তদের আস্থা ও বিশ্বাস টলে যায়। ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে সেটা একেবারেই কাঙ্ক্ষিত নয়। তারচেয়েও বড় কথা হিন্দুত্ববাদী ঘরানার রাজনৈতিক হিন্দুত্বের অনুসারী লোকজন মন্দিরের হর্তাকর্তা বিধাতা হয়ে উঠলে মন্দিরের কাজকর্ম আর ধর্মীয় পরিসরে আবদ্ধ থাকে না। সেখানে অধর্ম, শঠতা, দুর্নীতি, নয়-ছয়ের মানসিকতার অনুপ্রবেশ ঘটে। তখন মন্দির আর ভক্তদের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা থাকে না। সম্প্রতি অযোধ্যার রাম মন্দিরের যে সব কীর্তিকলাপ দুনিয়ার সামনে প্রকাশ পেয়েছে তার পেছনেও রয়েছে সর্বত্যাগী ধর্মপ্রাণদের বদলে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের রথীমহারথীদের কর্তৃত্বের কারণে।
গত দুই-আড়াই দশকে দেশে সর্বত্রই মন্দিরগুলিতে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়েছে। সঙ্ঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত নানা সংগঠনের কর্তারাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মন্দির পরিচালনার মাথায় থাকছেন। সেই সুবাদে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পথে অনুকূল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। হিন্দু ধর্ম আর হিন্দুত্ববাদ তথা রাজনৈতিক হিন্দুত্ব মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। হিন্দুত্ববাদের অনুসারী তথাকথিত ধার্মিকরা কখনই নিঃস্বার্থ ধর্মপ্রাণ হতে পারেন না। ধর্মের আধারে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থও থাকে। তাই মন্দির পরিচালনায় সততা, নিষ্ঠার অভাব থাকে। রামমন্দিরে ভক্তদের দান দেদার চুরির ঘটনা তারই পরিণতি। মন্দিরের কর্মী, শীর্ষ পরিচালকদের ঘনিষ্ঠরাই চুরির নাটের গুরু। চুরির অভিযোগ আগে একাধিকবার এলেও আড়াল করা হয়েছে।
ভক্তদের দান চুরির ঘটনা শুধু রাম মন্দিরেই নয়, কেদারনাথ, বদ্রীনাথ মন্দিরেও চুরির গুরুতর অভিযোগ। আরও অনেক মন্দিরেও একই চিত্র। চুরির পরিমাণ হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ নয়, একেবারে কোটি কোটি হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক হিন্দুত্বের ইকো সিস্টেমে মন্দিরগুলি যেভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে তাতে কোনও মন্দিরের পক্ষেই ধর্মীয় শুচিতা রক্ষা করা, অসততার ছোঁয়াচ মুক্ত থাকা কার্যত অসম্ভব। বাস্তবিকই রাজনৈতিক হিন্দুত্বের আগ্রাসন থেকে কোনও মন্দিরই আর সুরক্ষিত নয়। সুরক্ষিত নয় ভক্তদের দান করা সম্পদও।
Editorial
হিন্দুত্ববাদীদের হাতে কোনও মন্দিরই সুরক্ষিত নয়
×
Comments :0