Former Enclaves

জমির নথি পেতে জোট বাঁধছেন সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দারা, পাশে থাকার ঘোষণা সেলিমের

রাজ্য জেলা

জয়ন্ত সাহা: কোচবিহার
এখন আর কাগজে-কলমে তাঁরা আর ছিটমহলের মানুষ না। সবাই ভারতীয়। কিন্তু বাস্তব জীবনযাত্রার ধরন বলছে, ছিটমহল বিনিময়ের ১১ বছর পরেও নাগরিকদের জীবনে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দারা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ১১ বছর কেটে গেলেও সেখানকার নাগরিকেরা তাদের জমির মালিকানার নথি আজও হাতে পাননি! জমির কাগজ হাতে পেতে এবার জোট বাঁধছেন সাবেক ছিটমহলের নাগরিকেরা। 
২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় হয়েছিল। ভারত ও বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহল দুই দেশের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে মিশে গিয়েছিল। চুক্তি মতো ভারতের মানচিত্রে ৫১ টি ছিটমহলের জমির পরিমান ৭১১০ একর। এই জমির মালিক সেখানকার নাগরিকেরা। কিন্তু জমির কাগজ এখনও ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তর নথিভুক্ত করেনি। ফলে এই নাগরিকদের জমির কাগজে এখনও বাংলাদেশের তথ্যই রয়ে গেছে। অথচ বাংলাদেশের ভেতর সাবেক ছিটমহলের যে বাসিন্দারা ঢুকেছেন অনেকদিন আগেই তাঁরা সে দেশের কাগজ পেয়ে গিয়েছেন। 
চুক্তি অনুযায়ী নাগরিকদের হাতে জমির নথি তুলে দেবার দায়িত্ব ছিল রাজ্য সরকারের। বিগত তৃণমূল সরকার গত ১১ বছরেও সে কাজ করেনি। ফলে বিপদে পড়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা। 
সাবেক ছিটমহল নলগ্রামের বাসিন্দা সুবল রায় বলেন, ‘‘আমাদের জমি তিনফসলি। সে জমিতে চাষও হয়। অথচ ছেলে-মেয়েদের বিয়ে কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনে জমি বিক্রি করা যাচ্ছে না। কারণ রাজ্যের ভূমি দপ্তরে আমাদের জমির কোনও রেকর্ড নেই। ফলে প্রয়োজনের সময়ে নামমাত্র টাকায় জমির হাতবদল হচ্ছে মাত্র!’’
ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তর সূত্রে জানা গেছে সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দাদের জমির পুরনো নথি দেখে জরিপ করতে হলে সমীক্ষা করতে হবে। গত ১১ বছরে সেই সমীক্ষার কাজ শুরুই করেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর। 
সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দারা বলছেন, তিন বছরের মধ্যে আমাদের হাতে জমির কাগজ তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। প্রথম দিকে কিছু কিছু জায়গায় সমীক্ষা করতে এসেওছিল সরকারি লোকেরা। পরে সেটা অজানা কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।
ভারতীয় অংশে থাকা ছিটমহলগুলোয় উন্নয়ন এখনো শুরু হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের অংশ হওয়া ছিটমহলগুলোর চেহারা পাল্টে দিয়েছে।  সড়ক প্রায় সবই পাকা হচ্ছে। অনেক ব্রিজ, কালভার্ট তৈরি করা হয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্কুল বা মাদ্রাসা তো বটেই, এমনকি কলেজও হয়েছে। 
এদিকে সাবেক ছিটমহলের আরেক বাসিন্দা পোয়াতুরকুঠির বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘গত ১১ বছরে আমরা অনেকবার নিজেদের জমির কাগজ চেয়ে প্রশাসনের কাছে দরবার করেছি। এমএলএ, সাংসদ থেকে মন্ত্রী প্রত্যেককে একই দাবিতে স্মারকলিপিও দিয়েছি। প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাস ছাড়া কিছুই মেলে নি।’’ নলগ্রামের বাসিন্দা সোলেমান মিয়া বলেন, ‘‘প্রশাসন আমাদের কার কতটা জমি তার একটা কাগজ দিয়েছিল বটে। কিন্তু সেটা ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরের নথি নয়। সেটা দিয়ে জমি কেনাবেচার রেজিস্ট্রি হয় না। তেমনি ভিন রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করতে গেলে আমরা যে ভারতীয় নাগরিক, আমাদের জমি বাড়ি আছে ভারতে সেটা প্রমাণ করতে পারি না।’’
কোচবিহারে এক দলীয় কর্মসূচীতে যোগ দিতে এসে সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ  সেলিম সোমবার বলেন, ‘‘সাবেক ছিটমহলের নাগরিকদের নিজেদের জমির পরচা, খতিয়ানের দাবির লড়াইয়ের পাশে লালঝান্ডা থাকবে। সাবেক ছিটমহল ও বেরুবাড়ির বাসিন্দারা কেন এতদিনেও প্রতিশ্রুতি মতো নিজেদের জমির পরচা পাননি তার জবাব তো দিল্লির বিজেপি সরকারকেও দিতে হবে। কারণ ছিটমহল বিনিময় চুক্তি তো ভারত- বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে হয়েছিল।’’
তিনি বলেন, ‘‘চুক্তিতে বলা ছিল ৩ বছরের মধ্যে প্রত্যেক নাগরিককে তাদের নিজেদের জমির পরচা, খতিয়ান দিতে হবে। কেন ১১ বছর পরেও সেখানকার নাগরিকদের হকের জন্য লড়তে হবে?’’
সিপিআই(এম)’র দাবি, ছিটমহল বিনিময়ের সময়ে কেন্দ্র রাজ্য সরকারকে প্রায় হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ দিয়েছিল। সেই টাকায় সাবেক ছিট মহলের সঠিক পরিকাঠামো উন্নয়ন হয়নি। টাকা লুট হয়েছে। প্যাকেজের শ্বেতপত্র প্রকাশ্যে আনুক রাজ্যের বিজেপি সরকার।

Comments :0

Login to leave a comment