গল্প
নতুনপাতা
----------------
তান
----------------
সৌরীশ মিশ্র
১
"তান, কোথায় রে তুই?"
নিজের ঘরেই ছিল তান। গেল রোববার একটা অ্যাকোয়ারিয়াম কিনে দিয়েছেন ওকে ওর বাবা গ্যালিফ স্ট্রীট থেকে। সেটাই দেখছিল তান মুগ্ধ হয়ে। কি সুন্দর রঙিন মাছগুলো সব খেলা করে বেড়াচ্ছে জলে! তখুনি কানে এল ওর, বাবা ডাকছে ওকে।
"বাবা, আমি এখানে। আমার ঘরে।" তান সাড়া দেয় গলা চড়িয়ে।
"একটু আয় তো বাবা।" ফের তানের বাবার গলা ভেসে আসে।
মেঝেতে বাবু হয়ে বসে অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছগুলোর খেলা করা দেখছিল তান। সে চটপট উঠে পড়ল এবার মেঝে থেকে। তারপর দ্রুত পা চালিয়ে গিয়ে ঢুকল ওর বাবার কাজের ঘরে।
তানের বাবা উকিল। হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেন। যথেষ্ট নামডাক তাঁর।
চেয়ারে বসে সামনের টেবিলটায় মোটা একটা বই রেখে একমনে পড়ছিলেন তানের বাবা। ছেলেকে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখে বই থেকে মুখ তুলে তানের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এসেছিস। শোন্। ক'টা জেরক্স করে আন্ তো। একটু বাদে একজন আসবেন, তাঁকে দিতে হবে। আমার যা অবস্থা হয়েছে, ক'টা জেরক্স যে করে আনব, তারও উপায় নেই, তোকে বলতে হচ্ছে!" কণ্ঠস্বরে আক্ষেপ ঝরে পড়ে তানের বাবার।
আসলে হয়েছে কি, আজ সকালে বাথরুমে পা পিছলে পরে পা-টা মচকে গেছে তানের বাবার। ডাক্তার দেখিয়েছেন। ওষুধও খাচ্ছেন। তবু, ব্যাথা এখনও আছে ভালোই। তবে ঘরের মধ্যে হাঁটাচলা করছেন তিনি একটু-আধটু। কিন্তু, এই পায়ের অবস্থায়, তাঁদের এই তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নেমে, দোকানে গিয়ে জেরক্স করে, ফের তিনতলা ওঠা, এই মুহূর্তে একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার তাঁর কাছে। এদিকে আবার তানের বাবা নিজের কাজ নিজে করতেই ভালোবাসেন সবসময়। একপ্রকার বাধ্য হয়েই ছেলের শরণাপন্ন হয়েছেন তিনি এই মুহূর্তে। তাই কিছুটা আক্ষেপের সুরেই ঐ কথাগুলো বললেন তানের বাবা।
"বাবা, ওর'ম ক'রে বলছো কেন! এই তো সামনেই রূপেশ কাকুর দোকান! পাঁচটা তো বেজে গেছে। দোকানও নিশ্চয়ই খুলেও গেছে। দাও, কি জেরক্স করে আনতে হবে, আমি করিয়ে নিয়ে আসছি।"
"লক্ষ্মী ছেলে আমার! বলে ছেলের দিকে দু'হাত বাড়িয়ে দেন তানের বাবা।
তান ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বাবাকে। একটু আদর খায় বাবার। তারপর বলে, "দাও, করিয়ে নিয়ে আসি জেরক্সগুলো।"
২
বাবার কাছ থেকে টাকা আর যে কাগজগুলো জেরক্স করতে হবে, নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল তান।
ওদের ফ্ল্যাট বাড়িটার পর তিনটে বাড়ি ছেড়ে একটা গলিতে রূপেশ কাকুর দোকান। লাবণ্য কমিউনিকেশন। শুধুই জেরক্স নয়, ল্যামিনেশন, স্পাইরাল বাইন্ডিং, রেল-বিমানের টিকিট বুকিং, কম্পিউটার প্রিন্ট-আউট, আরো কতোসব কাজ হয় দোকানটায়!
গলিটায় ঢুকল তান আর গলির মুখ থেকেই দেখতে পেল সে, দোকানের কাউন্টারের সামনে দু'জন দাঁড়িয়ে।
একজন, এক বৃদ্ধা। আরেকজন, এক যুবতী।
তান গিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়াতেই যুবতীটি চলে গেল। হাতে তার একতাড়া কাগজ।
তানকে ভালোই চেনেন এই দোকানের মালিক রূপেশ বিশ্বাস। বয়স তাঁর চল্লিশের কোঠায়। হাসি-খুশি, ভালো মানুষ। তানকে দেখেই রূপেশ বলে উঠলেন, "কি তানবাবু, ভালো আছো তো?"
"হ্যাঁ, আমি ভালো আছি। তবে, বাবার শরীরটা খারাপ।"
"সে কি! কি হয়েছে তরুণদার?"
"আজ বাথরুমে পিছলে পড়ে গেছে সকালে। পা মচকে গেছে।"
"ও। ডাক্তার দেখিয়েছে?"
" হ্যাঁ। ওষুধ খাচ্ছে। তবে ব্যাথা কমে নি। কষ্ট পাচ্ছে খুব।"
"ও ঠিক হয়ে যাবে। তুমি চিন্তা কোরো না। সবে তো ওষুধটা পড়েছে। একটু সময় গেলেই দেখবে ব্যাথা কমে গেছে..."
আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন রূপেশ তানকে, সেটা বলতে পারলেন না তিনি, কারণ ওদের কথার মধ্যেই, দোকানে যে বৃদ্ধা আগে থেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন রূপেশকে বলে উঠলেন, "আমার কতো হোলো বলে দে তো রূপেশ। আমি টাকাটা দিয়ে যাই বাড়ি। বাড়ি একদম ফাঁকা রেখে এসছি।"
"আপনার বারো টাকা হয়েছে মাসিমা।" বলেন রূপেশ।
বৃদ্ধার হাতে একটা ছোট্ট টাকার ব্যাগ ছিল। সেটার চেন খুলে একটা দশ টাকার নোট আর একটা দু'টাকার কয়েন সেটা থেকে বরে করে এগিয়ে দিলেন সেগুলো তিনি রূপেশের দিকে।
রূপেশ টাকা ক'টা নেন হাত বাড়িয়ে। তারপর, বৃদ্ধার দিকে এগিয়ে দেন কয়েকটা জেরক্স করা কাগজ।
বৃদ্ধা কাগজগুলো হাতে নেওয়ার আগে তাঁর হাতের ছোট্ট টাকার ব্যাগটার চেন বন্ধ করলেন। তারপর কাগজগুলো ঐ হাতেই ধরলেন।
বৃদ্ধা কাউন্টারের সামনে থেকে সরে যাচ্ছেন দেখে, তান এগিয়ে যেতে যায় কাউন্টারের একেবারে সামনে। তখনই তান লক্ষ্য করল, ঐ বৃদ্ধা দোকানের কাউন্টারের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্য যে তিনটে সিঁড়ির ধাপ ভেঙ্গে উঠতে হয় সেগুলো দিয়ে নামতে কোনো কারণে ইতস্তত করছেন।
"ঠাম্মি, তোমার অসুবিধা হচ্ছে নামতে?" বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করেই বসে তান।
"হ্যাঁ গো দাদুভাই। চশমাটা দিয়ে দেখতে কিছু অসুবিধা হচ্ছে ক'দিন থেকেই। এই সিঁড়ি দিয়েই তো উঠেছি একটু আগে, তখন অসুবিধা হয় নি। এখন সিঁড়ির ধাপগুলো ঠিকমতো বুঝতে পারছিনা। কেমন যেন উঁচু-নিচু লাগছে!"
"আমি তোমায় ধরে নামিয়ে দিই ঠাম্মি?" বলে তান।
"তাহলে তো খুব ভালোই হয় দাদুভাই।" বলেন বৃদ্ধা।
তান তাড়াতাড়ি তার হাতে ধরা কাগজগুলো রূপেশের হাতে দিয়ে দু'হাতে শক্ত করে ধরে বৃদ্ধাকে। তারপর বলে, "আমি ধরেছি। তুমি এবার আস্তে আস্তে নামো ঠাম্মি।"
বৃদ্ধা তানের দিকে তাকিয়ে একটু হাসেন।
তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়িগুলো একটা একটা করে নেমে একসময় প্লেন সারফেশে চলে আসেন।
তান এতোক্ষণে ছাড়ে বৃদ্ধাকে।
বৃদ্ধাও এবার সোজা তাকান তানের মুখের দিকে। হাতের কাগজগুলো আর ছোট্ট টাকার ব্যাগটা এতোক্ষণ ডানহাতে ছিল তাঁর। সেগুলোকে বাঁহাতে নিলেন তিনি এবার। তারপর, ডানহাত বাড়িয়ে তানের মাথায়, মুখে, হাত বুলিয়ে দিয়ে তানের চিবুক ধরে চুমু খেলেন তিনি।
তানের ঐ বৃদ্ধার আদর খেয়ে কি যে ভাল লাগল!
সে কি করবে বুঝে না পেয়ে, ঢিপ্ করে একটা প্রণামই করে ফেলল বৃদ্ধাকে।
-----------------------------------
Comments :0