Amarnath Glacier

গলছে অমরনাথের বরফ, পরিবেশের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ পরিবেশবিদদের

জাতীয়

গত বছরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার ধাক্কা কাটিয়ে এ বছরের অমরনাথ যাত্রায় দর্শনার্থী সংখ্যা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। তবে সেই উৎসাহের মাঝেই নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে অমরনাথ গুহায় প্রাকৃতিকভাবে গঠিত বরফের শিবলিঙ্গ দ্রুত গলে যাওয়া। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দাবি, ৫৭ দিনের যাত্রা শুরুর মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই বরফের শিবলিঙ্গের ৯০ শতাংশেরও বেশি গলে গিয়েছে। কোথাও কোথাও এমনও দাবি করা হয়েছে যে, বরফের শিবলিঙ্গ প্রায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গিয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি)-র নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির কন্যা ইলতিজা মুফতি এক্স-এ শিবলিঙ্গের সাম্প্রতিক ছবি পোস্ট করে অমরনাথ যাত্রার পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার অভিযোগ, পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়টি উপেক্ষা করা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক তীর্থযাত্রী প্রবেশের সীমা থাকলেও বাস্তবে সেই নিয়ম কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
৩,৮৮৮ মিটার (প্রায় ১২,৭৫৬ ফুট) উচ্চতায় জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত অমরনাথ গুহা হিন্দুদের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র। প্রতি বছর গুহার ভিতরে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বরফের স্ট্যালাগমাইট তৈরি হয়, যা শিবলিঙ্গ হিসেবে পূজিত হয়। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, তুষারপাত এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই বরফের গঠন বড় বা ছোট হয়।
চলতি বছরের অমরনাথ যাত্রা শুরু হয়েছে ৩ জুলাই। ২০২৫ সালের এপ্রিলে পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলায় ২৬ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হওয়ার পর নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে এবারের যাত্রা শুরু হলেও তীর্থযাত্রীদের উৎসাহে ভাটা পড়েনি। যাত্রার প্রথম চার দিনেই প্রায় ৯৩ হাজার ভক্ত গুহা মন্দিরে দর্শন করেছেন। শুধু দ্বিতীয় দিনেই ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ দর্শন করেন, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দ্বিতীয় দিনের উপস্থিতি বলে জানানো হয়েছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের উপরাজ্যপাল তথা শ্রী অমরনাথ শ্রাইন বোর্ডের (এসএএসবি) চেয়ারম্যান মনোজ সিনহা বলেন, গত চার বছরের তুলনায় এ বার দর্শনার্থীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে জানান, বহু মানুষ স্বাস্থ্য শংসাপত্র ও আরএফআইডি নিবন্ধন ছাড়াই যাত্রায় অংশ নিতে আসছেন। এতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিকাঠামোর উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। শ্রাইন বোর্ড ইতিমধ্যেই পাহেলগাম ও বালতাল—দুই পথেই প্রতিদিন সর্বাধিক ১০ হাজার দর্শনার্থীদের সীমা নির্ধারণ করেছে। জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাও জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারেই এই সীমা কার্যকর রয়েছে।
এদিকে গুহায় বরফের শিবলিঙ্গ দ্রুত গলে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। শ্রীনগরের সাংবাদিক আশরাফ ওয়ানি ৬ জুলাই সামাজিক মাধ্যমে জানান, অমরনাথ যাত্রার প্রথম সপ্তাহেই স্বাভাবিকভাবে গঠিত শিবলিঙ্গ আবারও গলে গিয়েছে। তিনি এর সঙ্গে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।
শ্রীনগরের উদ্যোক্তা বিনীত কৌল অবশ্য বলেন, এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। ২০০৪, ২০০৬, ২০০৭, ২০১৬ এবং ২০২০ সালেও বরফের শিবলিঙ্গ দ্রুত গলে যাওয়ার নজির রয়েছে। তবে তাঁর মতে, এই যুক্তি দেখিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগকে খাটো করে দেখা উচিত নয়। বরং নিরাপত্তা ও যাত্রীসুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশ এবং তীর্থক্ষেত্রের পবিত্রতা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রাইন বোর্ড এখনও পর্যন্ত বরফের শিবলিঙ্গ কতটা গলেছে, সে বিষয়ে কোনও সরকারি বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রকাশ করেনি। তবে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর থেকে আসা এক দর্শনার্থীর কথায়, যাত্রার চতুর্থ দিনেই শিবলিঙ্গের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়ে গিয়েছিল। তার কথায়, আগে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন ধরে দর্শনার্থীরা পূর্ণ আকারের বরফের শিবলিঙ্গ দর্শন করতে পারতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেই সময়সীমা কমে পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরফের শিবলিঙ্গের আকার প্রতি বছরই আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। তুষারপাতের পরিমাণ, গুহার তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বাইরের আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনও এর উপর প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, হিমালয় বিশ্বের অন্যান্য বহু পার্বত্য অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে হিমবাহ সঙ্কুচিত হচ্ছে এবং তুষারপাতের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলিতে অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়া এবং গুহার আশপাশে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে বরফের শিবলিঙ্গ দ্রুত গলে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি গত দুই দশকে অমরনাথ যাত্রাপথে ব্যাপক পরিকাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে। রাস্তা চওড়া করা, অস্থায়ী আবাসন বৃদ্ধি, গুহার কাছে লঙ্গর স্থাপন, বিদ্যুৎ ও সৌর আলোর ব্যবস্থা, ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার, এমনকি রোপওয়ে প্রকল্পের অনুমোদন এবং শেষনাগ থেকে পঞ্চতরণী পর্যন্ত সম্ভাব্য সুড়ঙ্গ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা চলছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই দশক আগে যেখানে অমরনাথ যাত্রায় বছরে প্রায় এক লক্ষ দর্শনার্থী অংশ নিতেন, সেখানে ২০১১ ও ২০১২ সালে সেই সংখ্যা ছয় লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। কোভিড অতিমারি এবং পহেলগামে হামলার পরে কিছুটা ভাটা পড়লেও চলতি বছরে আবারও সংখ্যা বেড়েছে।
বরফের শিবলিঙ্গের দ্রুত গলে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে এখনও কোনও সরকারি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি। তবে এই ঘটনায় একদিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তেমনই দেশের অন্যতম বৃহৎ তীর্থযাত্রাকে আরও নিরাপদ ও সহজলভ্য করার পাশাপাশি হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে।

Comments :0

Login to leave a comment