বিধানসভা নির্বাচনের ইশ্তেহার প্রকাশ করলো বামফ্রন্ট। শনিবার সিপিআই(এম) সদর দপ্তর মুজফ্ফর আহমেদ ভবনে সাংবাদিক সম্মেলন করে ইশ্তেহার প্রকাশ করেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু সহ নেতৃত্ব। বিমান বসু বলেন, ‘একটি জনহিতকারি সরকারের কী কী কর্মসূচি নেওয়া উচিত তা বলা হয়েছে বামফ্রন্টের ইশ্তেহার।’
বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বলেন, ‘রাজ্যে একটি নৈরাজ্যবাদী সরকার চলছে। দিল্লিতে যেই সরকার চলছে তারা মানুষকে বিভক্ত করছে। ফ্যাসিবাদী কায়দায় মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে।’
বিমান বসু এদিন বলেন, ‘আরএসএস বিজেপি ধর্মের ভিত্তিতে, জাতের ভিত্তিতে, বর্ণের ভিত্তিতে বিভেদ তৈরি করছে। তৃণমূল নৈরাজ্যবাদী শক্তি এরা মানুষের বন্ধু হতে পারে না। মানুষের আসল বন্ধু বামপন্থীরাই।’
বামফ্রন্টের ইশ্তেহারে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটা পরিবারে অন্তত একটি স্থায়ী কাজের কথা বলা হয়েছে ইশ্তেহারে। পাঁচ বছরে ৪০ লক্ষ স্থায়ী কর্মসংস্থান, ২৫ লক্ষ শিল্প ও লজিস্টিক পরিষেবায় কাজ, ২০ লক্ষ গ্রামীণ কর্মসংস্থান, ১৫ লক্ষ প্রযুক্তিভিত্তিক চাকরির কথা বলা হয়েছে ইশ্তেহারে।
এছাড়া বলা হয়েছে, ৫ বছরের মধ্যে সমস্ত সরকারি শূন্যপদ পূরণ করা হবে। প্রত্যেক নিবন্ধিত বেকারকে কমপক্ষে ২টি চাকরির সুযোগ (Call) দেওয়া হবে।
বামফ্রন্টের ইশ্তেহারে 'নেতাজী সুভাষ যুবসেবক প্রকল্প' বলে একটি প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সমাজসেবা, উৎপাদনমুখী এবং উন্নয়নমূলক কাজে যুব অংশকে নিয়োগ করা হবে। তাঁদের মাসিক ভাতা হবে ২০০০ টাকা। এদের 'কর্মভূমি পোর্টাল'-এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ শেষে কাজের সুযোগ তৈরি করা হবে।
গ্রামীণ ও শহুরে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গ্রামে ২০০ দিনের কাজ এবং শহরে ১২০ দিন কাজ ও ৬০০ টাকা মজুরির গ্যারান্টি দেওয়া হবে। শহরের প্রান্তিক অংশের মানুষের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান প্রকল্প তৈরির কথা বলেছে বামফ্রন্ট। স্বনিযুক্তির জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে রাজ্য বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ করার কথা বলা হয়েছে। স্নাতক স্তর পর্যন্ত টিউশন ফি মকুব, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM)-এর মাধ্যমে বিদ্যালয়, মাদ্রাসা এবং কলেজ স্তরে শিক্ষাদানে গুরুত্ব আরোপ করা হবে।
বিদ্যালয়, মাদ্রাসা এবং কলেজ স্তরে পর্যায়ক্রমে স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি। বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দেওয়া হবে এবং বৃত্তি অনুযায়ী তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
শরীর চর্চা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা এবং বিজ্ঞান মনস্কতা গড়ে তোলা প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবশ্যিক করা হবে বলা হয়েছে ইশ্তেহারে।
এসএসসি, পিএসসি, সিএসসি, ও মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সব শূন্যপদে ক্রমান্বয়ে নিয়োগ করা, একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সহ সমস্ত প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে সব শূন্যপদে ক্রমান্বয়ে নিয়োগ হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সব স্তরের পার্শ্বশিক্ষক ও অস্থায়ী শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেছে বামফ্রন্ট।
স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, রাজ্য বাজেটের ১০ শতাংশ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কর্মসূচী রূপায়ণের জন্য বরাদ্দ করা হবে। হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে স্বচ্ছতার সঙ্গে সব শূন্যপদ ক্রমান্বয়ে পূরণ করা, পাহাড়ে নতুন মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে বামফ্রন্টের ইশ্তেহারে।
প্রতিটি জেলাতেই ক্রমান্বয়ে একটি করে মেডিক্যাল কলেজ এবং প্রত্যেক বিধানসভা কেন্দ্রপিছু একটি নার্সিং কলেজ গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিটি সাব-ডিভিশনে প্যারামেডিক্যাল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা হবে যাতে সব মানুষ উন্নত চিকিৎসা পায়। সরকারি ও যৌথ উদ্যোগে নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও স্বল্পমূল্যের বহুমুখী হাসপাতাল নির্মাণ করাও হবে।
প্রতি ব্লকে যৌথ উদ্যোগে কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে তোলা, সরকারি হাসপাতালে স্বল্প মূল্যে চিকিৎসা করা, ওষুধ কেনা এবং সব ধরণের পরীক্ষা করাবার অধিকার সকলের থাকবে।
সৃজনশীল ও ক্ষমতায়নমূলক সেবা চালু করা হবে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের সমস্ত শূন্য পদে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ করা, মানসিক স্বাস্থ্যকে পেশাগত স্বাস্থ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা আইন সম্পূর্ণভাবে ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ভাতাপ্রাপ্ত সব মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নত করে তাঁদের আয় কয়েকগুণ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হবে। ৫ বছরের মধ্যে ২০ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করা হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক, সমবায় ব্যাঙ্ক, গ্রামীণ ব্যাঙ্ক এবং নাবার্ডের মাধ্যমে সহজ শর্তে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে ঋণদানের ব্যবস্থা করা হবে।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে অবৈধ-বেআইনি মাইক্রোফিনান্সের জাল থেকে মুক্ত করা হবে এবং এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা, বকেয়া আদায়ের নামে গ্রামীণ মহিলাদের উপর মাইক্রোফিনান্স কারবারিদের অত্যাচার কঠোর ভাবে দমন করা হবে।
শিল্পাঞ্চলে শিশুসেবা কেন্দ্র স্থাপন এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা ও সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা, প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় জোর দিয়ে ধর্মান্ধতা ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করার প্রচেষ্টা করা হবে। প্রতিটি জেলায় পুলিশের নিজস্ব কিন্তু 'স্বশাসিত অভয়া বাহিনী' তৈরি হবে, যারা বিশেষ ক্ষমতা নিয়ে নারী নির্যাতন দমন করবে।
বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বলেন, ‘তৃণমূল সরকার যেই প্রকল্প চালু করেছে তার কোনটাই বন্ধ হবে না। কিন্তু যেখানে দুর্নীতি আছে সেখানে নতুন করে প্রকল্প রূপায়ন করা হবে।’
উদ্বাস্তু মানুষের ক্ষেত্রে দেশভাগের শিকার উদ্বাস্তু মানুষজনের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। অতীতে বামফ্রন্ট সরকার উদ্বাস্তুদের নিঃশর্ত দলিল দান ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের যে ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করেছিল তা তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালে থমকে গেছে, কেন্দ্রের সরকারেরও কোনও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি; এবিষয়ে পুনরায় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
সুন্দরবন এবং উত্তরবঙ্গের জন্য বিশেষ প্যাকেজের কথা বলা হয়েছে। সুন্দরবনে নদী ভাঙন রোধে পরিবেশবান্ধব স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করে পরিকল্পিত ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র গড়ে তোলা, মধু-মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা, বাঘের আক্রমণে আহত ও নিহত সরকারি অনুমতিপ্রাপ্ত মধু সংগ্রহকারী ও মৎসজীবীদের ক্ষতিপুরণ দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। নোনা জল প্রতিরোধী কৃষিতে জোর দেওয়া কথাও বলা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের জন্য টি থ্রি পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে, চা, পর্যটন এবং প্রযুক্তি -এর মেলবন্ধনে উত্তরবঙ্গের আমূল পরিবর্তন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফল ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকেন্দ্র প্রতিটি জেলায় গড়ে তোলা হবে। নতুন উদ্যোগীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে।
পাহাড়, তরাই, ডুয়ার্স, জঙ্গলমহল এবং সুন্দরবনের পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য সরকার গঠনের ৬ মাসের মধ্যে বিশেষ প্যাকেজ ঘোষনা করা হবে।
ইশ্তেহারে বলা হয়েছে, সম্প্রীতি শান্তি মানুষের ঐক্য এই রাজ্যের ঐতিহ্য। সব মানুষকে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলা এবং নিজ ধর্ম পালন করার অধিকার সংবিধান দিয়েছে। রাজ্যের এবং দিল্লির শাসক দল মানুষকে জাত, ধর্ম, ভাষার ভিত্তিতে ভাগ করতে চাইছে। আমরা রাজ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা, সম্প্রীতি বজায় রাখতে আপোষহীন প্রহরীর কাজ করছি এবং করেও যাব। বিভেদকামী, বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো যে কোনও শক্তিকে কঠোরভাবে দমন করা হবে, মানুষকে সঙ্গে নিয়েই।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় এখনও পর্যন্ত ১৭ লক্ষ ভোটারের নাম বিবেচনাধীন। চালু হয়নি ট্রাইব্যুনাল। সেই প্রসঙ্গে বিমান বসু বলেন, ‘কমিশন অন্যায় কাজ করছে। আমার বার বার বলেছি কোন বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া যাবে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে অনেক বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাচ্ছে। শুধু সংখ্যালঘু নয় অনেক অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের নামও বাদ গিয়েছে।’
কালিয়াচকের প্রসঙ্গে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বলেন, ‘কমিশন কেন আগে কোন ব্যবস্থা নিলো না? এর মধ্যে কোন চক্রান্ত আছে কি না সেটা দেখতে হবে।’
এদিন ইশ্তেহার প্রকাশে উপস্থিত ছিলেন সিপিআই(এম) নেতা শ্রীদীপ ভট্টাচার্য, সিপিআই নেতা স্বপন ব্যানার্জি , ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা সঞ্জীব চ্যাটার্জি, আর এস পি নেতা রাজীব ব্যানার্জি, আর সি পি আই নেতা মিহির বাইন, এম এফ বি আশিষ চক্রবর্তী এবং বলশেভিক পার্টির প্রবীর ঘোষ।
Left front manifesto
কর্মসংস্থান থেকে নারী ক্ষমতায়ন, গুরুত্ব বামফ্রন্টের ইশ্তেহারে
×
Comments :0