রানা মিত্র
প্রাক কথন
বিগত ডিসেম্বর, ২০২৫-এ কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক খসড়া বীজ বিল, ২০২৫ প্রকাশ করার সাথে, সাথে গোটা দেশ জুড়ে এই বিষয় নিয়ে তীব্র বিতর্ক দানা বেঁধেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি) ডিসেম্বরে জানায় যে,সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দপ্তর এই খসড়া বিলটিকে আইনে পরিণত করতে চায় বীজ আইন, ১৯৬৬ ও বীজ নিয়ন্ত্রণ নির্দেশিকা, ১৯৮৩ কে বদলে দিয়ে। এ ব্যাপারে তারা জনমত আহ্বান করে। কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, এই নতুন বিলটির মূল উদ্দেশ্য হলো, আগের আইনগুলোর খামতি দূর করে নতুন আইনটিকে আরও কৃষকমুখী করে তোলা। বাগাড়ম্বর করে বলা হচ্ছে যে, এই বিলটি আইনে পরিণত হলে তা “উদ্ভিদ প্রজাতি বৈচিত্র রক্ষা ও কৃষক অধিকার আইন,২০০১ (Protection of Plant Varieties and Farmers’ Rights Act, 2001) ও “জীব বৈচিত্র আইন, ২০০২” (Biological Diversity Act, 2002)র অনুসারী হয়ে দেশের কৃষকদের উচ্চমানের বীজ তৈরী, বৃদ্ধি, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিনিময়, সরবরাহ ও বিক্রি করার অধিকারকে আরও সুনিশ্চিত করবে।
খোলসা করে না বলা কথা
যেহেতু বিলটিতে কৃষকদের ব্যক্তিগতভাবে উৎপাদিত, বিনিময় করা বীজকে বাদ দিয়ে বাকি সমস্ত বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত, বিক্রিত বীজ,বীজের উৎপাদক (মূলতঃ দেশি, বিদেশি বড়,বড় বহুজাতিক কোম্পানি), বীজ বিক্রি করার ডিলার ইত্যাদিদের বাধ্যতামূলক নিবন্ধীকরণ (Compulsory Registration)’র আওতায় নিয়ে এসে বীজের প্যাকেটে কিউ আর কোড,বাধ্যতামূলক লেবেলিং এবং এগুলোর প্রত্যেকটিকে “সাথীপোর্টাল”র সাথে যুক্ত করে উৎপাদনের জায়গা থেকে মাঠে ব্যবহার পর্যন্ত এর গতিপথকে চিহ্ণিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে,তাই সরকার সোচ্চারে বলতে চাইছে, দেখো, আমরা কত কৃষক দরদি। কৃষকরা যাতে নকল বীজ (spurious seeds) ইত্যাদির শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত না হন, তার জন্য আমরা কত যত্নবান। কিন্তু আসল গপ্পোটা কি?
মুখোশের আড়ালে
তিনটি কালা কৃষি আইনের মতই এই খসড়া বীজ বিলও একইরকমভাবে কৃষকদের সর্বনাশের সনদ নিয়ে হাজির হয়েছে। এর কারণগুলো এই রকমঃ
১) বীজের যে আবশ্যিক নিবন্ধীকরণ (Mandatory Registration)’র কথা বলা হচ্ছে, তা করতে হবে অনেকগুলি জায়গায় (Multiple Location), যাতে বিভিন্ন জলবায়ুতে বীজের কার্যকারীতার ভিন্ন রূপ নিবন্ধীকৃত করা যায়। এর পোশাকি নাম হলো,Value for Cultivation and Use (VCU); অর্থাৎ, যে বীজ বাজারে বিক্রি করা হবে তা প্রকৃতপক্ষে বা আদৌ নির্দিষ্ট মানের কিনা তার পরীক্ষা বিভিন্ন জায়গায় করে নিবন্ধীকৃত করতে হবে। একমাত্র সেই বীজগুলোকেই ছাড়পত্র দেওয়া হবে যারা পূর্বনির্ধারিত মান অতিক্রম করতে সমর্থ হবে। আপাতদৃষ্টিতে এটি প্রগতিশীল মনে হলেও, এর আসল খেলা অন্য জায়গায়। ভারতের বা পৃথিবীর বহু জায়গায়, বা ভিন্ন, ভিন্ন জলবায়ুতে বীজের পরীক্ষা, নিবন্ধীকৃত করা একমাত্র সম্ভব বহুজাতিক, বৃহৎ বীজ কোম্পানিগুলোর। এর ফলে ছোট, ছোট বা আমাদের দেশের সমবায়,রাষ্ট্রায়ত্ত বীজ উৎপাদকেরা দেশে-বিদেশে বীজ উৎপাদন ও বিক্রির বিশাল বাজার হারাবে। আমাদের দেশের চাষিরা প্রায় সম্পূর্ণভাবে বহুজাতিক বীজ কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এমনকি, চাষীরা যে বীজ বিনিময় করেন, তা কখনই কোম্পানির ব্র্যান্ড মার্কা বীজ হতে পারবে না। এব্যাপারে সামান্য ভুল ধরা পড়লেও কড়া শাস্তির মুখে পড়তে হবে চাষিদের।
২) খসড়া বীজ বিল, ২০২৫ দাবি করছে যে বীজ উৎপাদন, বিক্রি, বিনিময়, ব্যবহার, ফলাফল ইত্যাদি্র সমস্ত তথ্য, সংরক্ষণ, প্রতিবেদন বা রিপোর্টিং ডিজিটাল আকারে করতে হবে। আমাদের মতো দেশে, যেখানে, সমগ্র বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী্র সংখ্যা সত্ত্বেও, ইন্টারনেট ব্যবহারের গভীরতা, বিশেষ করে, গ্রামাঞ্চলে ও গরিব, প্রান্তিক মহিলাদের মধ্যে,এখনও অনেক কম, সেখানে, এই ডিজিটাল ব্যবহারের উপর জোর, আসলে, গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র বীজ উৎপাদক, সম্প্রদায়ভিত্তিক বীজ উৎপাদক (Community Seed Manufacturer),যেমন ছোট কৃষি উৎপাদক সংস্থা (Farmers Producers Organisation, FPO), সমবায়ভিত্তিক বীজ উৎপাদকদের প্রতিযোগীতায় হটিয়ে দেবে প্রশ্নাতীতভাবে।
৩) এই বিল বিদেশি সংস্থাগুলোকে যে কোনও বীজের কার্যকারীতার রূপ ও ফলাফলের নির্ধারণের (VCU) ক্ষমতা দিয়ে দিচ্ছে। এমনকি,এই কোম্পানিগুলো বিদেশের মাটিতেও এই পরীক্ষা করে, তার ছাড়পত্র আমাদের দেশে অনুমোদনের জন্য হাজির করতে পারবে। এর ফলে, জিনগতভাবে পরিবর্তিত বীজ (Genetically Modified Seeds) আমাদের দেশের হাজার,হাজার দেশীয় প্রজাতির বীজের উৎপাদনের ক্ষমতা, কার্যকারীতাকে ধ্বংস করে দেবে। ফলতঃ, বৃহৎ চাষির সাথে, মূল ক্ষতির বোঝা বহন করতে হবে ভূমিহীন, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক চাষীদের। এর ফলাফলস্বরূপ, কৃষক আত্মহত্যার যে মিছিল আমরা ভারতে প্রত্যক্ষ করেছি নয়া উদারবাদী জমানায়, তা আরও ভয়ঙ্করভাবে ভারতের কৃষিকে গ্রাস করতে উদ্যত হবে।
৪) বহুজাতিক বা বড় বীজ উৎপাদক কোম্পানিগুলো এক জায়গায় বীজের পরীক্ষা করে ছাড়পত্র নিয়ে যেহেতু ভারতের যেকোনও অঞ্চলে প্রয়োগের অধিকার অর্জন করতে পারবে, তাই এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের এই বীজের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের আর কোনও অধিকার থাকবে না। এই ভয়ঙ্কর পদক্ষেপটির আসল উদ্দেশ্য হলো কৃষির ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলোর স্বাধিকারে গুরুতররূপে হস্তক্ষেপ করা। এই পদক্ষেপ বর্তমান মোদী সরকারের রাজ্যের অধিকারকে খর্ব করার মূল লক্ষ্যের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে।
বীজের ভিতর লুকিয়ে আসলে কে?
নয়া উদারবাদী জমানায় অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রের মতই এই নতুন বীজ বিলের পিছনেও রয়েছে সেই মক্কেলরা,যারা আসলে আন্তর্জাতিক ফিনান্সপুঁজির মূল নিয়ন্ত্রক। এদের চোখের সামনে দেখা যায় না। বিলেতের গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রখ্যাত, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক,জর্জ মনবিয়ট, আজ থেকে ঠিক দশ বছর আগে লিখেছিলেন যে, নয়া উদারবাদী নীতি বর্তমানে তার সর্বব্যাপী প্রসারের মাধ্যমে যে মূল শক্তিটা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে তা হল,”অদৃশ্যতা”(invisibility)। অর্থাৎ,এর মূল নিয়ন্ত্রকেরা সবসময় আমাদের দৃষ্টিগোচর হন না। এক চূড়ান্ত আপাত স্বাভাবিক সামাজিক-অর্থনৈতিক যাপনের প্রক্রিয়ায় এই নীতি তার সর্বনাশা বিষদাঁত ও তার ধারককে আড়ালে লুকিয়ে রাখতে অনেক সময়েই সমর্থ হয়। যেমন, এই বীজ বিল, ২০২৫-র পিছনে আসল নিয়ন্ত্রকেরা হলো,মূলতঃ পাঁচটা বহুজাতিক, দানবীয় লগ্নিপুঁজি কোম্পানি। এরা হলো, ব্ল্যাকরক্, ভ্যানগার্ড, ফাইডেলিটি, স্টেট স্ট্রিট গ্লোবাল অ্যাডভাইসার আর ক্যাপিটাল গ্রুপ। এদের মোট সম্পদের পরিমাণ হলো ৩২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, বা, ২৬৪ লক্ষ কোটি টাকা। এই পরিমাণটি হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মিলিত জাতীয় উৎপাদনের থেকেও বেশি। এই পাঁচটি আর্থিক লগ্নি কোম্পানি, বিশ্বজোড়া ক্ষমতাধর যে মূল বীজ উৎপাদক কোম্পানিগুলো রয়েছে, যেমন, বায়ার,করটেভা,সাইনজেন্টা,বিএএসএফ (এরা গোটা বিশ্বে বীজ বাজারের ৭৫% অধিকার করে আছে), তাদের সিংহ ভাগ বিনিয়োগ হলো এদের। এই দানবের মতো বৃহৎ আর্থিক কোম্পানিগুলো কখনই আমাদের মতো দেশের সরকার, বা অন্য কোনও সরকারের নীতি সম্পর্কে সরাসরি কোনও দৃশ্যমান (visible) চাপ সৃষ্টি করে না। এদের কখনই দেখা যাবে না, এরা ভারতের মতো দেশের বীজ বিল, বা কৃষিক্ষেত্রের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দেওয়া, না দেওয়া নিয়ে কোনও সরাসরি চাপ দিচ্ছে। অথচ, কর্পোরেট কৃষি উৎপাদনের প্রতিটি অনুষঙ্গ যাদের নিয়ন্ত্রণে (সে বীজ হোক, বা কীটনাশক, সার ইত্যাদি সব হতে পারে),এই দানবীয় আর্থিক কোম্পানিগুলো তাদের মূল নিয়ন্ত্রক। যেমন, ব্ল্যাকরক হলো, বায়ার এজি’র (যারা মনসান্টোকে কিনে নিয়ে এখন ভারতের বি টি কার্পাস চাষের ৯৫% ইতিমধ্যেই অধিকার করেছে) মূল প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার হোল্ডার। ভ্যানগার্ড আর স্ট্রেট স্ট্রিট হলো দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার হোল্ডার। এই তিনটে কোম্পানি মিলিতভাবে বায়ারের সর্বোচ্চ মালিকানার অধিকারী। স্বভাবতঃই,এরাই অদৃশ্যমান শক্তি হিসাবে ভারতীয় কৃষকেরা কোনও কার্পাস বীজকে ব্যবহার করবে, কত দামে, কি শর্তে এর সবটা বায়ার কোম্পানির কর্পোরেট বোর্ডরুমে বসে নিয়ন্ত্রণ করে। এই একই পরিস্থিতি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীজ ব্যবসার অধিকারী করটেভা এগ্রিসাইন্সর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। করটেভা এগ্রিসাইন্স ভারতের সবজি,হাইব্রিড ভুট্টা, সূর্যমুখী ফুলের বীজের মূল নিয়ন্ত্রক। তাই ব্ল্যাক রক, ভ্যানগার্ড, স্টেট স্ট্রীট করটেভার বোর্ডরুমে বসে গোটা ভারতের কৃষি, খাদ্য শৃঙ্খলের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ইতিমধ্যেই নিয়ন্ত্রণ করছে। অথচ, খালি চোখে এদের আমরা দেখতেই পাই না। এই হলো নয়া উদারবাদী কাঠামোর “অদৃশ্যমানতা” যার কথা উপরে উল্লেখিত হয়েছে।
প্রতিরোধ ছাড়া বিকল্প নেই
এই বীজ বিল ও সামগ্রিকভাবে ভারতের কৃষক নির্ভর কৃষিকে (Peasant Agriculture) বাঁচাতে গেলে দেশব্যাপী ঐক্যবদ্ধ লড়াই ছাড়া বিকল্প নেই। নয়া উদারবাদ আর তার হাত ধরে নিশ্চিতভাবে অগ্রসরমান নয়া ফ্যাসিবাদী প্রবণতাকে রুখতে দেশের কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের যৌথ কার্যক্রম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্রতা লাভ করেছে। এটা নিশ্চয়ই আশার আলো দেখাচ্ছে। তিনটি কালা কৃষি আইনকে ২০২০-২১ সালে ঐক্যবদ্ধভাবে পরাভূত করার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ দেশের কৃষক আন্দোলন বিগত ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ দেশজুড়ে নয়া বীজ বিলের প্রতিলিপি পোড়ানোর কর্মসূচি সাফল্যের সাথে পালন করেছে। এছাড়া,বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শ্রমিকশ্রেণির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশজুড়ে ৬০০ র বেশি জেলায়, হাজারো গ্রামে, শহরতলিতে প্রবল বিক্রমে নয়া শ্রমকোড বাতিল সহ অন্যান্য বিষয়ের সাথে, কৃষক আন্দোলন বীজ বিল, ২০২৫ প্রত্যাহার ও কৃষি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় তুলে ধরে। ঐদিন ভারতে নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আরেকটি গৌরবোজ্জ্বল ভাষ্য রচিত হলো। চূড়ান্তভাবেই জনবিরোধী নয়া উদারবাদের প্রতিস্পর্ধী এই বিরুদ্ধতার স্বরকে লালন করা ও সমস্তরকমভাবে পুষ্ট করা আজ আমাদের ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক দায়িত্ব হিসাবে সামনে এসেছে। কি মাঠে, কি কারখানার গেটে, বা অফিসে, বৃহত্তর রণাঙ্গনে, এই ন্যায় যুদ্ধে জেতা ছাড়া সভ্যতার সামনে আর কোনও বিকল্প নেই।
Comments :0